রাশিয়ায় ভিন্নমতালম্বীদের মানসিক হাসপাতালে বন্দি রাখা হচ্ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৮:৫২আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১৮:৫২

রাশিয়ার কয়েক ডজন মানুষকে বাধ্যতামূলক মানসিক চিকিৎসার আওতায় রাখা হয়েছে। আইনজীবী ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, শুধু তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই তাদেরকে মানসিক রোগী বানানো হচ্ছে। তারা আরও বলছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পদ্ধতির সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘শাস্তিমূলক মনোচিকিৎসা’ ব্যবস্থার মিল রয়েছে। এই ব্যবস্থা ১৯৬০-এর শেষ থেকে ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে কম ব্যাপক হলেও এর প্রভাব গভীর।

এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও দুটি রুশ মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তিনজন আইনজীবীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং সাইবেরিয়ার একটি হাসপাতালে মানসিক মূল্যায়নের জন্য পাঠানো দুই নারী কর্মীর মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে।

৩৭ বছর বয়সী ইয়েকাতেরিনা ফাতিয়ানোভাকে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল ক্রাসনোয়ার্স্ক শহরের একটি  মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একটি ছোট বিরোধী সংবাদপত্র পরিচালনা করতেন এবং সেখানে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অপমান’ করেছেন। তবে তিনি নিজে ওই নিবন্ধের লেখক ছিলেন না। নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

হাসপাতালে তাকে কষ্টদায়ক, অবমাননাকর এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হয়, যার মধ্যে একটি গাইনোকোলজিক্যাল পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি কর্তৃপক্ষকে পাঠানো অভিযোগপত্রে এসব উল্লেখ করেছেন, যা রয়টার্স পর্যালোচনা করেছে।

২৭ মে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ছেড়ে দেয় এবং একটি মেডিক্যাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার কোন‌ও মানসিক রোগ নেই।

ফাতিয়ানোভা বলেন, ‘আসল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নৈতিকভাবে দমন করা এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সম্ভবত আমার সক্রিয় নাগরিক অবস্থানের জন্য এটি করা হয়েছিল।’

ডাচ অধ্যাপক ও মানবাধিকার কর্মী রবার্ট ভ্যান ভোরেন, কয়েক দশক ধরে রাশিয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানসিক চিকিৎসার অপব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন. ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৫টি এমন ঘটনা ঘটত। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর গড়ে ২৩টি এমন ঘটনা ঘটছে।

রাশিয়ার বিচার মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার কমিশনার ও ক্রেমলিন এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ফাতিয়ানোভা বলেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম, তখন রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা-এফএসবি আমাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করেছিল যাতে আমি চিকিৎসা গ্রহণে সম্মতি দিই।'

২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে দুই বছরের কঠোর শ্রমের শাস্তি দেওয়া হয়।  তাকে কাজের হোস্টেলে থাকতে হয় এবং রাস্তা পরিষ্কারসহ বিভিন্ন শ্রমসাধ্য কাজ করতে হয়।

ফাতিয়ানোভার সঙ্গে হাসপাতালের ভেতর পরিচয় হয় ৫৬ বছর বয়সী ওলগা সুবোরোভার সঙ্গে। তিনি সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয় নিয়ে আন্দোলন করতেন।

সুবোরোভা জানান, চিকিৎসার সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করার পরও, হাসপাতালে তাকে অনধিকার ও অপ্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়।

তিনি বলেন, এটি একটি শাস্তিমূলক মনোচিকিৎসা। উদ্দেশ্য হলো আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং মানুষ যাতে আমাকে আর বিশ্বাস না করে সেটি নিশ্চিত করা।

তাকে মিথ্যা অভিযোগ আনার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ করেছিলেন।

সুবোরোভা জানান, ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন, যার ফলে তিনি আঘাত পান। তার অভিযোগের সমর্থনে একটি মেডিক্যাল রিপোর্টও ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, তার শরীরে কালশিটে পড়েছে এবং দুই সপ্তাহের জন্য তার হাতে ব্যান্ডেজ পরানো দরকার ছিল।

ডিসেম্বর ২০২৩-এ, মস্কো থেকে ফেরার সময় ক্রাসনোইয়ার্সক বিমানবন্দরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তিনি ইয়েকাতেরিনা ডুনৎসোভার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, যিনি প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন।

কোর্টের নির্দেশে তাকে দুইবার মানসিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়। এক চিকিৎসকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তিনি ‘মিশ্র ব্যক্তিত্বের সমস্যা’ এবং ‘অন্যদের সাহায্য করার অস্বাভাবিক প্রবণতা’ প্রদর্শন করেছেন। এরপর মে মাসে আদালত তাকে হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

তবে তিনি বলেন,আমি অভিযোগ করার পর আমাকে তিন সপ্তাহ পর মুক্তি দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, আমার কোনও মানসিক রোগ নেই।

তিনি বলেন, যদি সত্যিই আমার মানসিক রোগ থাকত, তাহলে আমাকে কখনও হাসপাতাল থেকে ছাড়া হতো না।

সূত্র: রয়টার্স

/এস/
সম্পর্কিত
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
সর্বশেষ খবর
নতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
শিশু রামিসা হত্যা মামলানতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী