X
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

চিকিৎসা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন জরুরি: হেলাল উদ্দিন আহমেদ

উদিসা ইসলাম
১০ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:০০আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩, ১৬:০০

মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিকে রীতিমতো অ্যাক্টিভিজমের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যিনি, তিনি হলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি মনে করেন, মন ভালো নাকি খারাপ আছে— সেটা যে ব্যক্তি বুঝতে পারেন,  তার পরিস্থিতি জটিল না। কিন্তু আমি ভালো আছি, না খারাপ আছি, সেই বিবেচনাটা করতে না পারলেই বিপত্তি। মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার অগ্রগতি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য করণীয়, কতদূর এগিয়েছি আমরা এবং সামাজিক ভীতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

বাংলা ট্রিবিউন: মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বাধা হিসেবে কাজ করে?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: আমি সবসময়ই বলি, আমাদের তিনটি জায়গায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে, আর তা হলো— পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের প্রচলিত যে ধারণা, সেটা ভাঙতে হবে। আর  সেটা এই তিন জায়গায় কাজ করার মাধ্যমেই সম্ভব। একটা বার্তা বারবার বলতে হবে— মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা অন্য শারীরিক সমস্যার মতোই একটা রোগ। এটাকে নিয়ে কোনও রকম বিদ্রূপ করা যাবে না। আমরা আমাদের আশেপাশের নানা বিষয়ে যত্নবান, কিন্তু আমাদের মনের যত্ন হয় না।

বাংলা ট্রিবিউন: সেটাতো গেলো আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর অপ্রস্তুতিজনিত সমস্যা। কিন্তু সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ বা সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: প্রথমত, আমাদের ‘মাইন্ডসেট’। বেশিরভাগ মানুষ এটাই নিশ্চিত নন যে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া উচিত। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, সেটা প্রথম বাধা বলে আমি মনে করি। আর  কারও স্পষ্ট ধারণা নেই যে, কোথায় চিকিৎসা নেবেন? আমাদের সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্ট— উভয়ের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বর্তমানে মাত্র ৩৫০ জন সাইকিয়াট্রিস্ট আর ৫০০– এর মতো সাইকোলজিস্ট ১৭ কোটি মানুষের মানসিক সেবা দিচ্ছেন। সরকারি পর্যায়ে উপজেলা কিংবা জেলাগুলোতে নেই কোনও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো। ফলে প্রান্তিক মানুষের কাছে এই সেবা পৌঁছায় না।  পারিবারিকভাবে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী ধরনের পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি, সে নিয়ে আলাপের জায়গা খুব সীমিত।

বাংলা ট্রিবিউন: এই কাঠামোর মধ্যেই কীভাবে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: আমরা জানি, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। কিছু হলেই রাজধানীর দিকে ছুটতে হয়। সেটা পরিবারের জন্য বিশাল হয়রানির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌছাঁনোর ব্যবস্থা করা যায়। আমরা কোভিডের সময় ইন্টারনেট-সেবা বিষয়টির সঙ্গে বেশ পরিচিত হয়েছি। এখন সেটাকে কাজে লাগানোর সময়। ই-মেন্টাল হেলথ বা টেলিমেন্টাল হেলথ, কিছু অ্যাপস ইত্যাদি ব্যবহার করে যেকোনও জায়গা থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে যেহেতু এই সেবার বিষয়টি অনেক সংবেদনশীল, তাই এর গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য টেকনিক্যাল রেগুলেটরি বডি অবশ্যই থাকতে হবে। আমরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নানাবিধ সেবা দেওয়ার প্রচারণা দেখি। তার কয়টা মানসম্মত— সেই প্রশ্ন করতে হবে এবং ডিজিটাল জগতের মধ্য দিয়ে সেবাটা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সরকার একটি নীতিমালা করে দিয়েছে। সেটা আসলে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে কি?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: কেবল ‘মানসিক স্বাস্থ্যনীতি’ নয়, আমাদের আছে পৃথক ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মকৌশল’ এবং ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জন্য ‘স্পেশাল ইনিশিয়েটিভ ফর মেন্টাল হেলথ’ নামে আলাদা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা পৃথিবীতে মাত্র ১৩টি দেশে রয়েছে। যেসব দেশ মানসিক স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

এছাড়াও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের জাতীয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস' পাঁচটি গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে, যা কেবল বিশেষজ্ঞদের নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ সহায়ক হবে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মকৌশলে আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। আমরা বলেছি, আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ মানসিক রোগ ও সঠিক সময়ে এর বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা গ্রহণ না করা। এই কাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে। এই যে একটার পর একটা কৌশল নির্ধারণ হচ্ছে, তাতে করে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথে একটা করে ধাপ এগিয়েছি। এখন আমাদের দরকার সামাজিক ক্যাম্পেইন, যেখানে সমাজ বুঝতে চেষ্টা করবে— কেন বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে বিবেচনা করা দরকার।

বাংলা ট্রিবিউন: মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। বিষয়টা হতে হবে হোল সোসাইটি অ্যাপ্রোচ। একটা বাদ দিয়ে আরেকটা করা সম্ভব হবে না। শুরু করবেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে, নাকি পরিবার থেকে, সেসব তর্ক করে লাভ নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর সংবাদমাধ্যম যদি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে, তাহলে মনের যত্ন আর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ উদ্বুদ্ধ হবেন। সমাজকে পরিবর্তন করতে, বিষয়টি নিয়ে পরিবারকে শিক্ষিত করতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কথা বলার জায়গা তৈরি করতে যা যা উদ্যোগ নেওয়া দরকার, সেগুলো নিতে হবে। এখন আমরা আরেকটি জরুরি বিষয়ে আলোকপাত করছি। যার যার জায়গা থেকে ইস্যুটাকে তোলার চেষ্টা করছি। সেটা হলো, সাইকিয়াট্রিস্ট ছাড়া অন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যেনো এই বিষয়ে মনোযোগী হন। এমবিবিএসের  পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হোক, যাতে করে এই বিষয়টি কতদূর এগিয়ে গেছে, কত আধুনিক হয়েছে, সেটা সবার জানা থাকে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রাতিষ্ঠানিক কী কী উদ্যোগ সামনে দেখতে পাবো?

হেলাল উদ্দিন আহমেদ: মাঠপর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চলছে। এটার পরিসর বাড়বে। ২০২৪ সালে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পৃথক ‘অপারেশনাল প্ল্যানে’র মাধ্যমে কর্মকৌশল বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা আশা করছি, প্রথম পর্যায়ে অন্তত ৩২টি জেলার হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। এরইমধ্যে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। আমাদের এখানে ২৪ ঘণ্টা ইমার্জেন্সি সার্ভিস রয়েছে। আমাদের এখনও পর্যন্ত খুব বেশি গবেষণা হয় বলা যাবে না। আগামীতে যেনো উচ্চশিক্ষা, গবেষণা কাজগুলো হয় সেই চেষ্টা হচ্ছে। কারণ, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা যত করবেন, তত আপনার সামনে বিষয়টি উন্মোচিত হবে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
স্টামফোর্ডে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ‘তরুণ মনটারও জয় হোক’ কর্মশালা
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ: সামন্ত লাল সেন
জাতীয় পার্টি নিয়ে অনেকে অনেক ডিস্টার্ব করছে: জিএম কাদের
সর্বশেষ খবর
শবে বরাত উপলক্ষে হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বন্ধ
শবে বরাত উপলক্ষে হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বন্ধ
রাষ্ট্রপতির কাছে যে পরিকল্পনা তুলে ধরতে চায় দুদক
রাষ্ট্রপতির কাছে যে পরিকল্পনা তুলে ধরতে চায় দুদক
গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে নিজের শরীরে আগুন দিলেন এক মার্কিনী
গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে নিজের শরীরে আগুন দিলেন এক মার্কিনী
১৫ মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাচনের মাঠে কায়সার, কখনও আসামি হননি সূচনা
কুমিল্লা সিটির উপনির্বাচন১৫ মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাচনের মাঠে কায়সার, কখনও আসামি হননি সূচনা
সর্বাধিক পঠিত
১০ রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
১০ রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘না’
অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘না’
আইন অনুযায়ী ট্রান্সকমের মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় পুলিশ
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধআইন অনুযায়ী ট্রান্সকমের মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় পুলিশ
এজলাসে বসে বাংলাদেশের বিচারকাজ পর্যবেক্ষণ করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি
এজলাসে বসে বাংলাদেশের বিচারকাজ পর্যবেক্ষণ করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি
গণিত পরীক্ষায় নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করায় শিক্ষক গ্রেফতার
গণিত পরীক্ষায় নিজ স্কুলের শিক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ করায় শিক্ষক গ্রেফতার