দেড় বছর বয়সী জাওজির হাসান। বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনায়। গত সপ্তাহে এই শিশুর জ্বর ও শরীরে লালচে দাগ দেখে পরিবারের সদস্যরা। আতঙ্কে দ্রুত তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকের পরামর্শে পরিবারের সদস্যরা চলে আসেন মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি করা হয় তাকে। প্রথম ২-৩ দিন পরিবারের সদস্যরা কিছুটা আতঙ্কের মধ্যে থাকেলেও বর্তমানে শিশুটির অবস্থা ভালো। তবে, চিকিৎসক এখনও ছুটির কথা বলেনি।
জাওজির সঙ্গে ডিএনসিসি হাসপাতালে এসেছেন তার মা ও দাদা আব্দুল জলিল মিয়া। নাতি কান্না করে দেখে তাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের বেলকুনিতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই দাদা। বেলুকনিতে কথা হয় জলিল মিয়ার সঙ্গে।
তিনি জানান, তার ছেলে সৌদি আরবে থাকেন। তাই তিনি আর ছেলের বউসহ এসেছেন হাসপাতালে। গত ১৯ এপ্রিল থেকে হাসপাতালে রয়েছেন। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত শিশু জাওজিরের পরিস্থিতি একটু খারাপ ছিল। তবে, ২১ এপ্রিল থেকে শিশুটির অবস্থা ভালোর দিকে।
আব্দুল জলিল বলেন, “খুব সুন্দর হাসপাতাল। সেবার মান অনেক ভালো। সরকারি হাসপাতাল হলে অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানকার সেবা পেয়ে আমরা অনেক খুশি। আমার নাতিও সুস্থ হয়ে উঠছে।”
তিনি বলেন, “গত কয়েকদিন থেকে দেখছি, শুধু আমার নাতি নয়, হামে আসা প্রতিটি শিশুই অনেক কষ্ট করছে। তাদের সঙ্গে বাবা-মাসহ স্বজনদেরও অনেক কষ্ট হচ্ছে।”
রাজধানীর এই হাসপাতালটি কোভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত ছিল। মহাখালী বাস টার্মিনালের হাতের বাম দিকে তাকালেই এর সাইনবোর্ড চোখে পড়বে। বেশ বড় আয়তনের এই হাসপাতালটির ওয়ার্ডগুলো অন্য হাসপাতালের মতো নয়। মার্কেটের দোকানঘরের মতো। আর সেখানে একেকটি রুমে দু’টি করে বেড। আবার বড় রুমে দু’পাশে তিনটি করে ছয়টি বেড রয়েছে। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে হাসপাতালটির তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলা হামের জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল লতিফা রহমান জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ৪৭৪ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৩৮ জন। ১৬ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মারা গেছে ৩১ জন। এছাড়াও গত ১৬ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৮১১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতালটির তৃতীয় তলায় কথা হয় শিশু ওমায়েরর বাবা সাইদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও এসেছেন কুমিল্লা থেকে। সাইদুল জানান, ছেলের জ্বর ও গায়ে লাল চিহ্ন দেখে তিনি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে তিন দিন ভর্তি থাকার পর ছেলের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। সেখানকার চিকিৎসকের পরামর্শে চলে আসেন ডিএনসিসি হাসপাতালে। এখানে আসার পর তার ছেলেকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন দিন থাকার পর গতকাল শুক্রবার আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডে দেন।
তিনি বলেন, “বর্তমানে ছেলের শারীরিক অবস্থা ভালো। আমরা খুবই হতাশ ছিলাম। তবে ডাক্তার, নার্সদের আন্তরিক সহায়তায় ছেলের অবস্থা এখন ভালো। আমরা এখানকার সেবা পেয়ে অনেক খুশি।”
কথা হয় সাইফা নামের আরেক শিশুর মা মাহমুদার সঙ্গে। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে বাচ্চার হাম নিয়ে গত ২০ এপ্রিল তিনি এসেছেন এই হাসপাতালে। বর্তমানে এই শিশুর শারীরিক অবস্থা ভালোর দিকে। চিকিৎসকরা বলেছেন আর দু’একদিন দেখবেন। এরপর ছুটি দেবেন।
মাহমুদা বলেন, “আমরা আতঙ্কিত। ছোট ছোট বাচ্চাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমরা বাবা-মায়েরা এগুলো দেখতেও পারছি না। বাচ্চাদের যেমন কষ্ট হচ্ছে আমরা সেগুলো অনুভব করতে পারছি। সেই কষ্ট আমাদেরও হচ্ছে।”
ভর্তি হওয়া শিশু শায়ানের মা জান্নাতের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি বলেন, “বাচ্চাকে আল্লাহ ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা গত এক সপ্তাহ থেকে বাচ্চাকে নিয়ে লড়াই সংগ্রাম করছি। এখন বাচ্চা সুস্থের পথে।”









