নুরজাহান বেগম টাইফয়েড নিয়ে বিস্মিত হয়েছিলেন, হাম নিয়ে নয় কেন

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৯ মে ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ২৩:১৩

যেকোনও অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব পাওয়ার পরে গণমাধ্যমগুলো প্রোফাইল তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর কারণ তিনি কোন কোন বিষয়ে দক্ষ সেটা চিহ্নিত করা। যেহেতু খুব অল্প সময়ের জন্য তারা দায়িত্ব নেন— সেকারণে দক্ষ ও অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন ও সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরই এই দায়িত্বগুলো দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বা দৈর্ঘ মাঝামাঝি ধরনের ছিল। নিয়মিত সরকারের মতো না হয়েও তারা বড় বড় নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলোও নেওয়ার এখতিয়ার দাবি করে ও নেয়।

ইউনূস সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সবার আগে প্রোফাইল করতে গিয়ে আটকে যেতে হয় যার নামের কাছে, তিনি হলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম। ঠিক কোন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন? সেই উত্তর মিলছে ক্ষমতা থেকে যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই। একটির পর একটি শিশু হামে মারা যাওয়ার খবর বের হতে থাকলে বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে— হামে মানুষ মারা যায়? এরপরই জানা যায়, হামের টিকা পায়নি এসব শিশুরা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ইউনিসেফের কিছু টানাপড়েনের কারণেই এটা সম্ভব হয়নি— যার মাশুল গুনছে এ পর্যন্ত ৫৬৫টি শিশু (শুক্রবারের হিসাব অনুযায়ী)।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুকে ৬ মাসের মধ্যে যেসব টিকা দিতে বলা হয়— সেগুলো এমনি এমনি দিতে বলা হয় তাতো না। এই কার্যক্রমের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের কোনও সুযোগ নেই। এটি বালিশ বা তোষক কেনার মতো ইস্যু নয় যে, চাইলেই ভেন্ডর বদলে দিলাম। এটুকু বুঝতে যে পরামর্শ করতে হয়— সেটা কি তিনি করেছিলেন? এই প্রশ্ন সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের উদ্দেশে, যিনি নিজেও রাজধানীর আজিমপুরে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানাকেন্দ্রে (১২ অক্টোবর ২০২৫) টাইফয়েডের টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিস্মিত হয়ে গণমাধ্যমের সামনে জানতে চেয়েছিলেন, ‘‘দেশে টাইফয়েডে এখনও শিশুদের মৃত্যু হয়— এটা আমাদের জন্য লজ্জার। ডায়রিয়া, রাতকানা রোগসহ অনেক কিছু আমরা প্রতিরোধ করেছি, এবার টাইফয়েড প্রতিরোধেও সফল হবো।’’ অথচ এখন ৫ শতাধিক শিশুমৃত্যু নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছেন না কেন?

এই টিকা কার্যক্রম নিয়ে কার কার সঙ্গে আলাপ করতে চেষ্টা করেছিলেন, তা জানতে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

সবাই যেন অপেক্ষা করছে এমনিতেই সমস্যা কেটে যাওয়ার

যে বাবা-মা সন্তান হারিয়েছেন, তারা ভাবতেই পারছেন না— কেবল এই টিকা না পাওয়ার কারণে তার সন্তার মারা যেতে পারে। হামতো অনেকেরই হয়ে থাকে। এতগুলো শিশুর প্রাণ গেলো, এখনও যমে আর মানুষে টানাটানি হচ্ছে... শিশু, তবু কারোর যেন কিছু যায় আসছে না। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু জরুরি উদ্যোগ জানা গেলো ঠিকই, কিন্তু সেটা কতটা কায‍কর হলো? এই শিশুগুলোর জন্য আদৌ কিছু করার আছে কী নেই, সেসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই মানুষের মধ্যে।

সবাই বলছে, সরকার কী করছে, সরকারের উদ্যোগ নেই, এখন কি বড় ধরনের কোনও ক্যাম্পেইনে গিয়ে লাভ আছে কিনা— প্রশ্নে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘‘প্রথমদিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়ার দরকার ছিল ততটা দেওয়া হয়নি। তবে  দ্রুত টিকা দেওয়াটা সরকারের সাফল্য। এখন দেখা দরকার হামের যে প্যাটার্ন, কোন হাম হচ্ছে— সেটা পরীক্ষা করে আমাদের বুঝতে হবে যে, সেটার বিপরীতে হামের টিকা কার্যকর কিনা। এটা বলার কারণ, আগে ৬ মাসের কম বয়সীরা হামে আক্রান্ত হতো না। এবার দেখা গেলো, ৬ মাসের কম বয়সীরা আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি যাদের দেখে মনে হচ্ছে— প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে গবেষণা এবং জেনোটাইপ পরীক্ষা করতে হবে। সেসব ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে বলে এখনও মনে হচ্ছে না।

পরিস্থিতি কি মহামারির দিকে যায়নি?

কোনও রোগ বা সমস্যা যখন খুব দ্রুত অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়, তখন তাকে মহামারি বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এনডেমিক,  এপিডেমিক, প্যান্ডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারি— তিন ধরনের বিষয় উপস্থিত। কোনও এলাকায় কিছু রোগ সব সময়ই কিছুটা থাকে। যেমন- কিছু দেশে ডেঙ্গু। এটা এনডেমিক। হঠাৎ করে একটি অঞ্চল বা দেশে রোগের আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তখন সেটাকে এপিডেমিক বলা হয়। আর কোনও রোগ বহু দেশ ও মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে— তখন সেটা প্যান্ডেমিক। মহামারি ঘোষণার ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয়, তা হলো— রোগ কত দ্রুত ছড়াচ্ছে, কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যুহার বা জটিলতা কত, কতগুলো অঞ্চল বা দেশে ছড়িয়েছে ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ কতটা।

হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে পরিস্থিতি, সেটাকে এপিডেমিক বলা যায় কিনা, প্রশ্নে শিশু বিশেষজ্ঞ রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘‘এটা অবশ্যই সেসব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এত অল্প দিনের মধ্যে এত শিশুর মৃত্যু এবং প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে— ফলে এটাকে মহামারি ঘোষণা করা দরকার ছিল। কারণ এতে করে স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা আসতো। তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো।’’

/এপিএইচ/ইউআই/
সম্পর্কিত
হাম উপসর্গে আরও ৪ মৃত্যু
থামছেই হামের দাপট, একদিনে ঝরলো আরও ৪ প্রাণ
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ জনের মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
ভাঙারি ব্যবসায়ী সেলিম হত্যার নেপথ্যে আর্থিক লেনদেনের বিরোধ: র‌্যাব
ভাঙারি ব্যবসায়ী সেলিম হত্যার নেপথ্যে আর্থিক লেনদেনের বিরোধ: র‌্যাব
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীরা কতটা জায়গা পেলেন?
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীরা কতটা জায়গা পেলেন?
চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রেঞ্জে নতুন ডিআইজি
চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রেঞ্জে নতুন ডিআইজি
নবীনদের র‍্যাগিং ও কান ধরে ওঠবস, জাহাঙ্গীরনগরের ৮ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার
নবীনদের র‍্যাগিং ও কান ধরে ওঠবস, জাহাঙ্গীরনগরের ৮ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি