২৮ দিন ধরে সাত মাস বয়সী নাতিকে জুনাইদ নিয়ে শিশু হাসপাতালে আছেন শিরিনা খাতুন এবং তার ছেলে ও ছেলের বউ। এসেছেন সিরাজগঞ্জ থেকে। এখন থাকার জায়গা বলতে হাসপাতালের বারান্দা। শিরিনা খাতুন বলছেন, “আজ ২৮ দিন হলো আছি। ঈদেরও আগেই আসছিলাম। আমার নাতি অসুস্থ হয়, হাম-জ্বরসহ অনেক সমস্যা। তারপর প্রথমে থানার হাসপাতালে নিলাম। সেখানে ডাক্তার বলে অন্য হাসপাতালে যেতে। পরে রাতে একটার সময় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে পাবনা সদর হাসপাতালে নিয়েছিলাম। পাবনা সদর হাসপাতালে একদিন ছিলাম। পাবনার ডাক্তারও পরে রেফার করে দেয়।”
শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটে সরেজমিনে অবস্থান করে এমন চিত্র দেখা যায়। এখানেই কথা হয় শিরিনা খাতুনের সঙ্গে। তিনি আরও বলেন, “পরে তারা আবার আমাদের এখানে (শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল) পাঠালো। এখানে এখন ২৮ দিন হইছে আছি। বাচ্চার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ২৮ দিন ধরেই চিকিৎসা চলতেছে। খানিকটা সুস্থ হয়েছিলো। ঈদের আগে যদি আমারে ছুটি দিতো, আমরা বাড়ি যেতে পারতাম। কিন্তু বড় স্যার চলে গেলো, ছুটি দিল না। আমরা অপেক্ষা করছিলাম। ঈদের পরে একদিন রাতে হঠাৎ আবার সমস্যা দেখা দিলো। বাচ্চা উঠতে গিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তার এসে দেখলো। পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন ৫-৬ দিন হলো আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”
এতদিন ধরে আছেন তাহলে থাকছেন কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখন আমরা এই হাসপাতালের বারান্দায়ই থাকি।”
এই গল্প কেবল শিরিনা খাতুনের নয়, এরকম অসংখ্য গল্প আছে হামে আক্রান্ত শিশুদের স্বজনদের। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীর হাসপাতালে ছুটে আসছেন অভিভাবকরা। তবে ঢাকায় এসেও কারও কারও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত শয্যা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেও অনেক পরিবারকে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। হাসপাতালের বারান্দায় দিন-রাত কাটাচ্ছেন স্বজনরা। আবার কেউ অসুস্থ শিশুকে নিয়ে চিকিৎসার আশায় ছুটছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে। রোগীর বাড়তি চাপের মধ্যে শয্যা সংকট ও অনিশ্চয়তায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হামে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো।
প্রবাসী হাবিবুর রহমান থাকেন সিঙ্গাপুরে। দেশে এসেছিলেন বাচ্চার অসুস্থতার খবরে। তারপর আর যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, “বাচ্চার অসুস্থতার কারণে গত মাসের ১৬ তারিখের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। ভিসার মেয়াদ আগামী জুলাই মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত রয়েছে। কাজে যোগদানের জন্য তাকে অন্তত ১০ দিন আগে সেখানে উপস্থিত হতে হবে।” তবে বাচ্চা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলে পুনরায় টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারবেন আশা করছেন তিনি।
হাবিবুর রহমান জানান, ২১ মে রাতে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২২ তারিখ বিকালে বাচ্চাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ২ তারিখে আইসিইউ থেকে বের করে সাধারণ বেডে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে বাচ্চা বেডে আছে এবং তার শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় ভালো।
তিনি বলেন, “চিকিৎসকরা বাচ্চার অবস্থা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। বর্তমানে অক্সিজেনের মাত্রা স্থিতিশীল রয়েছে এবং অল্প পরিমাণ অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী মাঝে মাঝে এক থেকে দেড় ঘণ্টার জন্য অক্সিজেন খুলে রেখে দেখা হচ্ছে। যদি অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে, তাহলে অক্সিজেনের প্রয়োজন হবে না; তবে মাত্রা কমে গেলে আবার অল্প পরিমাণ অক্সিজেন দিতে হবে।”
হাবিবুর বলেন, “হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে এখনঅ চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি। তবে ডাক্তাররা আশ্বাস দিয়েছেন যে, যদি বাচ্চার অক্সিজেনের মাত্রা ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকে এবং নতুন কোনও জটিলতা দেখা না দেয়, তাহলে শনিবারের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।”
ছোট ভাইকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিলেন মো. রায়হান। আরেক ছোট ভাই হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, “আমরা তিন ভাই। ছোট ভাই সাত দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। ওর বয়স আট মাস। শুরুতে সিট না থাকলেও পরে একজন রোগী চলে যাওয়ার পর সিট খালি হলে আমরা সেটি পাই।”
তিনি বলেন, “আব্বু-আম্মু ভেতরে বেডে থাকেন। আমার ছোট ভাইয়ের হামের মতো কোনও সমস্যা ছিল না। জন্ডিস আর জ্বর ছিল। কিন্তু এখন হাম হয়েছে। আমাদের ভেতরে যেতে মানা করেছে। কারণ ছোট বাচ্চাদের ভেতরে যেতে দেওয়া হয় না।”
ভোলা সদর হাসপাতালে সন্তানকে নিয়ে ছয় দিন ভর্তি থাকেন মো. আরিফ। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হলে তাদের পাঠিয়ে দেন ঢাকায়। এরপর ঢাকায় এসে শুরু হয় তাদের দৌড়ঝাঁপ। হাসপাতালে সিট খালি নেই।
নিউমোনিয়া, জ্বর, ঠান্ডা, হাম নিয়ে ভোলার হাসপাতালে ভর্তি ছিল আরিফের দশ মাস বয়সী সন্তান। আরিফ বলেন, “সেখানে অবস্থার উন্নতি না হলে তারা ঢাকায় আসতে বলেন। আমরা আজ ভোরে আসলাম শিশু হাসপাতালে। এখানে ইমার্জেন্সিতে ডাক্তার দেখলো আমাদের। কিন্তু তারপর বললো অন্য হাসপাতালে চলে যেতে, এখানে কোন সিট নাই। কিন্তু আমরাতো অনেক দূরে থেকে এসেছি কোথায় যাবো! ডাক্তারকে বললাম ওর অবস্থা অনেকটা সিরিয়াস। আমরা না হয় বারান্দায় থাকি যাতে জরুরি অবস্থায় চিকিৎসাটা পাই। তারা বললেন— এভাবে থাকার নিয়ম নাই।”
তিনি বলেন, “আমাদের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, মহাখালী হাসপাতালে যাওয়ার কথা বললো। এখন আমাদের কই কই যে গিয়ে ফিরে যেতে হয় কেন জানে। কোথায় সিট পাবো তাও জানিও না।”
মো. নোমান এসেছেন পিরোজপুর থেকে। তার বাচ্চার বয়স তিন মাস ১০ দিন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ তিনটি হাসলপাতালে ঘুরে সিট না পেয়ে পরে শিশু হাসপাতালে এসে একটা সিট পান। পরে এখানে ভর্তি হয়ে চার দিন ধরে আছেন।
নোমান বলেন, “জ্বর, টাইফয়েড, হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। পিরোজপুরে থেকে ঢাকা এসেছি ভালো চিকিৎসার জন্য। যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল এলাকার দুইটা প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে সিট পাইনি। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে যাই সেখানেও সিট পাইনি। তারা আমাদের শিশু হাসপাতালে রেফার করে দেয়। এখানে এসে একজনের রিলিজ হলে আমরা সিট পাই। বাচ্চাটা অনেক অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। খেতেই পারে না। হামের র্যাশ কম ছিল এখানে ভর্তির আগে। এখন বেড়ে গিয়েছে। আবার টাইফয়েডও আছে। ওর সুস্থ হতে সময় লাগবে। কতদিন থাকতে হয় জানি না।”
প্রথমে শ্যামলীর এই শিশু হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ড হামে আক্রান্ত রোগীর জন্য থাকলেও পরে আরেকটি ওয়ার্ড যুক্ত করা হয়। সেই হিসেবে এই হাসপাতালে আইসিইউসহ চারটি ওয়ার্ড রয়েছে রোগীদের জন্য। তবে এরপরেও সিট না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে রোগীদের।
এসময় হামের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত এক নার্স বলেন, “এখন রোগীর ফ্লো অনেক বেশি। আমাদের অনেক রোগী আসে এখন। এই ওয়ার্ডে ২৬ সিট, সবই রোগী দিয়ে পরিপূর্ণ আছে। কখনও খালি থাকে না। খালি হলে আবার রোগী চলে আসে।”









