জুনে ২৯০৭, আগস্টে ২০৫৩৬: ডেঙ্গু বাড়ছে যে গতিতে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৫৭ আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৪

বছরের শুরুতে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। জুনে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আর আগস্টে এক মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কমে ৪০৯ জনে এবং মার্চে আরও কমে ৩৫৩ জনে দাঁড়ায়। এরপর এপ্রিল ও মে মাসে আবারও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে। এপ্রিল মাসে ৬৪০ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

জুন থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে এ সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে ৯ হাজার ২০৬ জনে পৌঁছায়। আগস্টে আরও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ হাজার ৫৩৬ জনে দাঁড়ায়।

চলতি মাসের প্রথম আট দিনেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৬২৯ জন। চলতি মাসের আক্রান্তের হার বিবেচনায় নিলে সেপ্টেম্বরে রোগীর সংখ্যা আগের মাসগুলোর তুলনায় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন। গত বছরের একই সময় পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ৯৮৩ জন। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।

কোন বিভাগে আক্রান্ত বেশি

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভাগ ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে মোট ৭ হাজার ২৯৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে ৬ হাজার ৯৬৬ জন, বরিশালে ৬ হাজার ৮১১ জন এবং চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৭২২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার ৪২৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার ৮২৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ময়মনসিংহে এ সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৯ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৫৫৭ জন, রংপুরে ১ হাজার ১৬৮ জন এবং সিলেটে ২০৬ জন।

এই হিসাব অনুযায়ী, উল্লেখিত এলাকাগুলোর মধ্যে সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে কম।

মৃত্যুও বাড়ছে জুন থেকে

আক্রান্তের পাশাপাশি জুন থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যান। মে মাসে মৃত্যু হয় একজনের। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই।

জুনে ডেঙ্গুতে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে। জুলাইয়ে মৃত্যু একলাফে বেড়ে ৩৬ জনে এবং আগস্টে তা সর্বোচ্চ ৪৩ জনে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরের প্রথম আট দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। সেখানে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর খুলনা বিভাগে ২৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩ জন মারা গেছেন।

এ ছাড়া বরিশালে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৮ জন, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে ৭ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৪ জন মারা গেছেন। রংপুর ও সিলেট বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।

তবে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কম। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ১৩৭ জন।

সামনে দুই মাস নিয়ে শঙ্কা

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আগামী দুই মাস নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি বাড়ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যটি হলো ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে এমনভাবে আলাদা রাখা, যাতে মশা তাকে কামড় দিয়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে। এর কোনোটিই সফলভাবে করা সম্ভব হয়নি।

ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিধনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে মশার উৎপাদন বা প্রজনন বন্ধের দিকে যেতে হবে। পূর্ণবয়স্ক মশা মেরে ফেললে সাময়িকভাবে মশার ঘনত্ব কমে। কিন্তু প্রজননস্থল থেকে গেলে সেখান থেকে নতুন মশা জন্ম নেবে।

তার আশঙ্কা, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।

তিনি খণ্ড খণ্ডভাবে অভিযান না চালিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন। প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব ও রোগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সমন্বিতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও ঢাকা থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন। টানা দুই থেকে তিন দিন এই কার্যক্রম চালিয়ে বছরে অন্তত দুবার করার কথা বলেন তিনি।

/এএজে/ইউএস/
সম্পর্কিত
ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৮২
এক বিভাগেই ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু-হামে ৮ জনের মৃত্যু
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঠেকলো চারশোতে, অক্টোবরেই ঝরলো ১৫৫ প্রাণ
সর্বশেষ খবর
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
রাত পোহালেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন, প্রস্তুত ১৮৫ কেন্দ্র
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
উচ্চ বেতনে চীনে নেওয়ার কথা বলে বাসায় আটকে নির্যাতন, উদ্ধার ১২ নারী
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
আইইডিসিআর পরিচালকের ওপর হামলা: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উদ্বেগ
বিদেশ সফরে দেশ নির্বাচনে কী প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী 
বিদেশ সফরে দেশ নির্বাচনে কী প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী 
সর্বাধিক পঠিত
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
নভেম্বর থেকে কর্মী যাবে মালয়েশিয়ায়, খরচ জানালেন প্রতিমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
কে হচ্ছেন ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
ইউরোপের ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের তুলনা করে যা জানালেন পোল্যান্ডের পর্যটক
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
এখন কী করবেন নেতানিয়াহু
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
আমজনতার তারেককে সফরসঙ্গী করায় সমালোচনা নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী