জনতা চায় মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
২৪ মার্চ ২০২১, ১৬:১১আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২১, ১৬:১১

সাহিত্যিক লীনা দিলরুবা বাধ্য হয়ে জিডি করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া পি কে হালদারের কথিত বান্ধবী অবন্তিকা বড়ালের ছবি ছাপতে গিয়ে অনেক পত্রিকা ও চ্যানেল তার ছবি ব্যবহার করে চলেছে। একবার নয়, দু’বার নয়,, বারবার এবং খুব যা তা অনলাইন নয়, একেবারের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা বা চ্যানেলেও। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান মারা গেছেন সম্প্রতি। তবে টেলিভিশন চ্যানেলের স্ক্রলে এর আগে বেশ কয়েকবার তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমরা কতটা অপেশাদার, কতটা দায়িত্বহীন হতে পারি, তার দৃষ্টান্ত এগুলো।

নানা সময় এই আলোচনাগুলো উঠছে। কারণ, এখন সংখ্যায় গণমাধ্যম অনেক, মানে যতটা নয়। দেশের গণমাধ্যম জগতে বিচ্ছুরণ ঘটেছে। একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোনটা পুরোটাই নিউজ চ্যানেল, কোনটা মিশ্র, কোনটা গান বা খেলার। অজস্র অনলাইন আর শত শত পত্রিকা। এবং পত্রিকা ও টিভি- সবারই আছে আবার অনলাইন সংস্করণ।

মানুষ দেশের সংবাদমাধ্যম থেকে কতটা তথ্য পাচ্ছে, আর কতটা সামাজিক মাধ্যমনির্ভর হয়েছে সে আলোচনা নিয়মিত করতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন করে সমাজে বহুস্বর, অভিমত ও প্রশ্ন জাগানোর যে আশা ছিল, তা আর এখন পূরণ হচ্ছে না। চ্যানেলের পর্দায় ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর অবিরাম স্রোত আছে, কিন্তু সত্যিকারের নিউজ আসলে ব্রেক হচ্ছে না।  

এসব অভিযোগ মেনে নিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে যেমন দেখতে হবে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সমাজের জটিল পরিপ্রেক্ষিতে। দেখতে হবে সমাজের বিরাজমান বাস্তবতা থেকেও। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হলো গণমাধ্যম। তথ্য ও যুক্তির বিন্যাসে সমাজের পক্ষে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনই গণমাধ্যমের প্রাথমিক কাজ। কীভাবে সংবাদমাধ্যম তথ্য তুলে ধরছে, তার ওপর নির্ভর করছে জনমানসে রাষ্ট্র সম্পর্কে সৃজিত ধারণা। আবার রাষ্ট্র কীভাবে চলছে, তার ওপর নির্ভর করছে গণমাধ্যমের চেহারা।

স্বাধীনতার পূর্ব এবং পরের সময়টার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখি, এই ভূখণ্ডে প্রথম পর্যায়ে সাংবাদিকতা প্রবর্তিত হয়েছে রাজনীতিবিদদের হাতে। রাজনীতির আদর্শ আর উদ্দেশ্যকে জনগণমাধ্যমের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে রাজনীতিকরা কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠরা পত্রিকা বের করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের ভেতর থেকেই সাংবাদিকতার মৌলিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিকরা, মালিকদের অনেকে সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সচেতন হয়েছেন।

পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত দুই একটি পত্রিকা এখনও টিকে আছে। কিন্তু গত তিন দশকে সংবাদমাধ্যমে বড় পুঁজির প্রবেশ ঘটেছে অনেক বেশি করে। করপোরেট নামধারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ‘মিডিয়া হাউজ’ করতে সক্রিয় হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকার তার পছন্দের লোকদের টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়েছে। নব্বইর দশকে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও পুঁজিতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে গণমাধ্যমে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের প্রচেষ্টাও আমরা দেখতে থাকি গত দুই দশক ধরে।

একটি বিভাজিত সমাজে তথ্য সরবরাহের কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ আজ নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত, যেমন বিভাজিত অন্য পেশাজীবীরা। এর বাইরের বড় বাস্তবতা হলো, যে শ্রেণির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা বা পুঁজির মালিকানা, তাদের অনেকের হাতেই গণমাধ্যমের মালিকানা ও কর্তৃত্ব। ফলে আলগা এক আদর্শগত কাঠামো এখানে খুঁজতে হলে এই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করেই করতে হবে।

অনেকেই বলেন, সাংবাদিককুলের ঐতিহাসিক অবস্থান ছিল ঈর্ষণীয়। সমীহ জাগানো বুদ্ধিবৃত্তি ছিল এই জগতে। ন্যায়পরায়ণতা আর ঋজুতা অবলম্বন করে তাঁরা রাজনৈতিক শ্রেণি ও আমজনতার কাছ থেকে শ্রদ্ধা আদায় করতেন। জনহিতকর বিষয়কে সামনে রেখে গণমাধ্যমের পথ চলেছে, যা এখন পারছে না। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় রাজনৈতিক শ্রেণিও বাধ্য হয় সেই বলিষ্ঠ স্বরকে কদর করতে। এখন সেটা নেই। বলা হচ্ছে, কোনও এক অদৃশ্য শক্তি গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

যারা এমন আফসোসে দিন-রাত পার করছেন, তাদের কথা হয়তো ঠিক। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে ঠিকমতো কাজ করে না, বুদ্ধিবৃত্তিক স্থানগুলো চৌর্যবৃত্তিতে ভরে যায়, রাজনীতি যখন কেবলই হিংসা উৎপাদন করে, প্রশাসনিক স্তরে যখন অনিয়ম আর দুর্নীতি প্রধান কর্ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন গণমাধ্যম একা কোন পথে চলবে? সে কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করে না নিশ্চয়ই।

তবু তাদের প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলতে হয়, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের যেসব অনিয়ম আর দুর্নীতির খবর সমাজে আলোচিত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার যেটুকু চিত্র উন্মোচিত, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের যেটুকু আজ প্রকাশিত, প্রশাসন ও আইনের শাসনের যেটুকু নিয়ে সংশয়, সবই গণমাধ্যম থেকেই পেয়েছে মানুষ।

কিন্তু আত্মতুষ্টির জায়গা নিশ্চয়ই নেই। যে তথ্য মানুষ চায়, যে ভাবে চায় সেটুকু যে সংবাদকর্মীরা দিতে পারছেন না সেটা স্বীকার করতেই হবে। একথা বললে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলা হবে না যে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পুরোটাই ভোগ করছেন সংবাদমাধ্যমের মালিকরা, ভোগ করছেন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। পেশাদার সাংবাদিকের জন্য আছে কেবল লড়াই। তাকে কৌশলী হয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে হয় এবং একটা পর্যায়ে তাকে অনেক বেশি সেলফ সেন্সরশিপের অনুশীলন করতে হয়, কিন্তু দিনশেষে মানুষ যা চায়, সাংবাদিকতার নীতির ভেতরে থেকে তা দিতে না পারলে যে সাংবাদিকতা আর বাঁচবে না।  

যে দেশে সমাজের সর্বক্ষেত্রে প্রশ্নহীন আনুগত্যকে দেখা হয় সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে, সেই সমাজ প্রত্যাশা করে সাংবাদিকের অমিত সাহস। যে সমাজের মানুষ একজনকে কতল করতে যায় ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে, তার উপাসনালয়ে পর্যন্ত হামলা করে, তারাই আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে চিৎকার করে।

জনজীবনে সংকট বা অনিশ্চয়তা থেকেই মানুষ তার পরিপূরক খোঁজে। তাই মানুষও এখন সামাজিক মাধ্যমকে তাদের তথ্য মাধ্যম হিসেবে দেখছে। কিন্তু সেখানে তথ্য কতটুকু, গুজব কতটুকু তার কোনও পরিমাপক নেই আপাতত। জনতা চায় অদম্য, সফল বা মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি। রাষ্ট্র ও সমাজের যে নয়া সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তার নিরিখে এই আগ্রাসী তথ্য প্রতিনিধির উত্থান হলে সংবাদ মাধ্যমের ধারণা কতটা বদলে যাবে সেটা দেখতে হবে সময় এলে।

লেখক: সাংবাদিক  

 

/এসএএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মিথ্যার বাজারে গণমাধ্যম-ডিপফেক যুগে বাংলাদেশের সংকট
বাণিজ্য ঘাটতির বাড়তি চাপ: অর্থনীতির সামনে নতুন সতর্ক সংকেত 
প্রশাসনের আয়নায় নৈতিক ভাঙন: একটি ঘটনার বহুমাত্রিক পাঠ 
সর্বশেষ খবর
আগ্রাসনের মূল্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম এশিয়া ছাড়তে বললো ইরানি সেনাবাহিনী
আগ্রাসনের মূল্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পশ্চিম এশিয়া ছাড়তে বললো ইরানি সেনাবাহিনী
৪৪৫ জন খেলোয়াড়, ৪৭ জন বিদেশি: খেলা কবে?
৪৪৫ জন খেলোয়াড়, ৪৭ জন বিদেশি: খেলা কবে?
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক
সরকার যাত্রা শুরুর ছয় মিনিটের আগেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: মামুনুল হক
সর্বাধিক পঠিত
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
দেড় ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন ‘ঢাকাস্থ নোয়াখালীবাসীরা’
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
নতুন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
পেডিকিউর থেকে কেনাকাটা, পাতায়ায় মার্কিন নাবিকদের ছুটির আমেজ
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচ খেলবেন মেসি?
জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমীন: জীবনের বিশেষ কোনও সংজ্ঞা নেই
জন্মদিনে সাবিনা ইয়াসমীন: জীবনের বিশেষ কোনও সংজ্ঞা নেই