X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

আবিষ্কারের নেশায় বাংলাদেশ

সাদ্দিফ অভি
৩১ মার্চ ২০২১, ০১:৫৫আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২১, ১৬:৫২

দেশ স্বাধীন হওয়ার পেরিয়ে গেছে ৫০টি বছর। গুটি গুটি পায়ে অর্থনৈতিক শক্তি হাসিল করার সঙ্গে যুক্ত ছিল দেশের বিজ্ঞানিদের আবিষ্কারের নেশা। এই তালিকায় আছে পাটের জিন, আলুর পলি, পাট থেকে পলিথিন, ঢাকাই মসলিনের পুনুরুদ্ধারসহ আরও অনেক অর্জন। এই অর্জনে যুক্ত হয়েছে দেশেই করোনার জিন–নকশা উন্মোচন। এই আবিষ্কার শুধু দেশেরই অর্জন নয় বরং এই প্রশংসায় বাংলাদেশ পঞ্চমুখ হয়েছে বিশ্বের দরবারে। বাংলাদেশের গবেষকরা মনে করেন এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে আরও ক্ষেত্র প্রয়োজন আছে দেশের ভেতরে। কারণ বাঙালি একটি মেধাসম্পন্ন জাতি।

পাটের জিন

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে গবেষণা দল পাটের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করে ২০১৩ সালে। সেবছর ১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই খবর প্রকাশ করেন। পাটের জীবনরহস্য বা জিন নকশা (জিনোম সিকোয়েন্সিং) বের করায় পাটের গবেষণায় পূর্ণতা পায় বাংলাদেশ। মাকসুদুলের নেতৃত্বে তোষা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন হয়েছিল ২০১০ সালে। সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া পাটের দুটি প্রধান জাতের মধ্যে এটি একটি। তাঁরই নেতৃত্বে আরেকটি জাত দেশি বা সাদা পাটের জীবনরহস্য উন্মোচিত হয়। আর তাঁর দল ২০১২ সালে পাটের জন্য ক্ষতিকর একধরনের ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করায় উন্নত পাটের জাত উদ্ভাবনের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এই আবিষ্কারের ফলে সোনালি আঁশ দেশে সোনালি দিন ও কৃষকের মুখে রূপালি হাসি ফিরিয়ে আনবে।

মাকসুদুল আলম ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে কুইনস মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাংলাদেশ সরকার তাকে তার অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদান করে।

পাট থেকে পলিথিন ও ঢেউটিন

বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের সাবেক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড: মোবারক আহমদ খান পাট থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন। যাকে বলা হয় সোনালী ব্যাগ বা পাটের পলিমার ব্যাগ। সহজলভ্য পচনশীল পলিমার ব্যাগ তৈরির জন্য তিনি ২০ বছর গবেষণা করেছেন। মোবারক আহমদ খান ২০০৯ সালে পাটের তেরি ঢেউটিন উদ্ভাবন করে যা জুটিন নামে পরিচিত। জুটিন তৈরিতে তিনি পাটের সঙ্গে ব্যবহার করেনে পলিমারের মিশ্রণ। ২০১৬ সালে তিনি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে অক্ষতিকারক চিতোজান তৈরি করে করেন।

মোবারক আহমেদ খান পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ তৈরি করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছেন।। তাঁর তৈরি সোনালি ব্যাগ বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে। এক দশক ধরে পরিশ্রমের চেষ্টায় বিজ্ঞানী মোবারক আহমেদ খান বাংলাদেশের আরও কয়েকজন গবেষকের সহায়তায় বেশকিছু এনএফসি বা ন্যাচারাল ফাইবার কমপোজিট প্রস্তুত করতে সক্ষম হন। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) মোবারক আহমেদ খানের তৈরি একটি পাটভিত্তিক এনএফসি ব্যবহার করে একটি ব্যাগের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। পাটজাত এ পলিথিন ব্যাগটি উৎপাদনে প্রথমে পাট থেকে সেলুলোজ সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। পরে সেলুলোজ থেকে সংগৃহীত সিটের মাধ্যমে পলিথিন ব্যাগ তৈরি করা হয়। পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ড মোবারক হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সব দেশেই সবসময় আবিষ্কারের প্রয়োজন থাকে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানিরা অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারেন এবং করেছেন। অনেকে দেশের মাটিতে করতে না পারলেও বিদেশের মাটিতে গিয়ে করেছেন। দেশের মাটিতে কাজ করলে একটা ক্ষেত্র দরকার পড়ে। করোনা নিয়েও অনেকে এদেশের অনেক কিছু করলো কিন্তু সমাদৃত হল কয়জন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বিজ্ঞানিদের জন্য আরও অধিকতর রিসোর্স এবং গবেষণার জন্য অর্থের প্রচুর প্রয়োজন হয়। ‘এ দেশ গানের দেশ, বাউলের দেশ আমরা বলি, এদেশ বিজ্ঞানীর দেশ এটিও সংযুক্ত করতে হবে। এদেশে যথেষ্ট মেধা আছে, যদি সঠিক মুল্যায়ন করতে পারি তাহলে অন্যদেশের মতো এদেশের মানুষ বিজ্ঞানে সফলতা অর্জন করতে পারবে।

ঢাকাই মসলিন পুনুরুদ্ধার

প্রায় ১৭০ বছর পর আবার বাংলাদেশে বোনা হলো ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাংলাদেশের একদল গবেষক দীর্ঘ ছয় বছর গবেষণা করে সক্ষম হয়েছেন ঢাকাই মসলিন তৈরিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে গবেষকরা ছয়টি মসলিন শাড়ি তৈরি করেছেন। যার একটি ইতোমধ্যে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিয়েছেন তারা। এই মসলিনের তৈরি শাড়ি অনায়েসে একটি আংটির ভেতর দিয়ে পার করে দেওয়া যায়।

বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিন সুতা তৈরির প্রযুক্তি ও মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার (প্রথম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ঢাকাই মসলিন তৈরিতে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ১৮জন গবেষক কাজ করেছেন। এ গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনজুর হোসেন।

আলু থেকে পলিথিন

আলু চাষি ও কোল্ডস্টরেজ মালিকদের আর্থিক দুরাবস্থার কথা চিন্তা করে আলু থেকে অন্য কিছু প্রয়োজনীয় পণ্যের উদ্ভাবনের কথা ভাবেন তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বিকল্প জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা গবেষক দলের সদস্য মাহবুব সুমন। তিনি একপর্যায়ে তার বন্ধু এবং একই সঙ্গে যিনি এনার্জি স্পেশালিস্ট তার কাছে থেকে ‘পলকা’ বানানোর প্রক্রিয়া শেখেন।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রে প্লাস্টিককে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তাতে হাইড্রো কার্বনের খুব ছোট ছোট কণা বা মনোমার পরপর সজ্জিত হয়ে দীর্ঘ শেকলের পলিমার তৈরি করে আছে। এ রকম অনেক পলিমার একত্র হয়ে প্লাস্টিক তৈরি করে। প্লাস্টিকের পাতলা ব্যাগ পলিমারের তৈরি বলে তাকে বলা হয় পলিথিন। এই হাইড্রোকার্বন পলিমার মাটিতে পচে না ও অনেক দূষণ তৈরি করে। পলকা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পচনশীল পলিমার যা আলু থেকে তৈরি হচ্ছে। পলকা বানাতে প্রয়োজন হয় আলুর স্টার্চ, পানি, হোয়াইট ভিনেগার, গ্লিসারিন। পরীক্ষা করার জন্য একটা পাত্রে ১০ গ্রাম স্টার্চ, ৫ মিলি ভিনেগার, ৫ মিলি গ্লিসারিন, ৬০ মিলি পানি ভালো করে মিশিয়ে গরম করতে হবে। কিছুক্ষণ গরম করলে এটি ঘন থিকথিকে হয়ে উঠবে। গরম অবস্থাতেই একে কোন ফ্ল্যাট সারফেসে লেপে দিয়ে ওভেন বা ড্রায়ারে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ ঘণ্টা শুকাতে হবে। শুকানোর পর যে পলিমার শিট পাওয়া যাবে সেটাই ‘পলকা’। এবার ওই পলকা শিট যেকোনো আকৃতিতে কেটে নিয়ে ব্যাগ, র‍্যাপিং পেপার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

মাহবুব সুমন জানান, প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা তাদের খাবার মশলা প্যাকেজিংয়ের জন্য এই পলিথিন নিছে আমাদের কাছ থেকে। প্যাকেজিংয়ের বেশ কিছু প্রোডাক্ট আমরা ছেরেছি, তবে এগুলা বেশিরাভগই লেমিনেশন নির্ভর। পলকা দিয়ে লেমিনেশন করে দেই আমরা বিভিন্ন মাধ্যমের উপরে। পল্কা থেকে আমরা পিভিসি ব্যানারের বিকল্প একটি প্রোডাক্ট তৈরি করেছি, এটি ব্যানারকে প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম। এপ্রিলের প্রথমভাগে ফ্রিজে মাছ মাংস রাখার যে ব্যাগ এরকম কিছু ব্যাগ আমরা ছাড়বো।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে উদ্ভাবকদের কাজে খুব বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। একজন আবিশকারকের জীবনে অনেক সংগ্রাম থাকে উদ্ভাবনের পেছনে। ের মধ্যে এতো আর্থিক বিষয় থাকে দিন শেষে উদ্ভাকের কাছে লাভজনক কিছু থাকে না। যারা সৃজনশীল কাজ করতে চায় তাদের জন্য উন্মুক্ত জমি তৈরি করে রাখা প্রয়োজন, যাতে তারা আরামে কাজ করতে পারে। মোটামুটি আর্থিক নিরাপত্তা পেলে নিশ্চিন্তে তারা কাজটি করতে পারবে।

করোনার জিন রহস্য উন্মোচন

বাংলাদেশি চিকিৎসক এবং গবেষক বাবা-মেয়ে যুগল সফলভাবে দেশে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স উদঘাটন করেছেন। যার ফলে ভাইরাসটির গতি প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব হয় দেশেই। চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. সমীর কুমার সাহা ও তার মেয়ে ডা. সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) আট সদস্যের একটি গবেষক দল জিনোম সিকোয়েন্সের ম্যাপিংয়ের কাজ করে। গত বছরের ১২ মে চাইল্ড হেলথ ফাউন্ডেশন এই তথ্য গণমাধ্যমেকে জানায়।

বাবা মেয়ের এই উদ্ভাবনির প্রশংসা করেন স্বয়ং মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাদের প্রশংসায় বিল গেটস লিখেছিলেন, ‘বাবা-মেয়ে দুজনে মিলে এখন বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতের প্রভাবশালী দুই ব্যক্তি। শিশুমৃত্যু বেশি বিশ্বের এমন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পদশালী দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার ফারাক কমাতে কাজ করছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে তাঁরা উপাত্ত, রোগ নির্ণয়ের সর্বাধুনিক পদ্ধতি এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে টিকাদানকে কাজে লাগাচ্ছেন। তাঁদের গবেষণা শুধু বাংলাদেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং একই রকম স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও কাজে লাগানো হচ্ছে।'

 

/এসও/
বৃষ্টির আগে সূর্য-গিলের বারুদ ঠাসা ব্যাটিং
বৃষ্টির আগে সূর্য-গিলের বারুদ ঠাসা ব্যাটিং
বিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না, ঢাকায় নেমে রওশন
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশবিএনপির সঙ্গে জোটের প্রশ্নই আসে না, ঢাকায় নেমে রওশন
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
বিএসআরএফ-ওয়ালটন স্পোর্টস ফেস্টিভ্যাল শুরু সোমবার  
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
চীনে টানা চতুর্থ দিনের মতো কোভিড শনাক্তের রেকর্ড
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী