সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক বা ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় ১১তম ও ১২তম গ্রেডের চাকরিতে লিখিত ও ভাইভায় সমান ৫০ করে নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বেতন স্কেলের ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে লিখিত ৬০ এবং ভাইভা ৪০ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত ৭৫ ও ভাইভা ২৫ নম্বর রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে এসব গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর ১০।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার নম্বরের ওজন এতটা বাড়ানো হলে লিখিত পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা প্রার্থীদেরও ভাইভায় কম নম্বর দিয়ে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে চূড়ান্ত মেধাক্রমে ওপরে তুলে আনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক আমলা এবং পিএসসির সাবেক এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বরাবরই ভাইভার নম্বর কম রাখার পক্ষে ছিলাম। পিএসসিতে থাকাকালে আমি ভাইভার জন্য ৫০ নম্বর রাখার কথা বলেছিলাম। কারণ পিএসসির ভাইভায় প্রার্থীকে বোর্ডের সদস্যরা আগে থেকে চেনেন না। পরীক্ষার সময় ছাড়া তারা প্রার্থীকে দেখেনও না।’
তিনি বলেন, ‘কোন প্রার্থী কোন বোর্ডে যাবেন, সেটিও অনলাইনে কোড নম্বরের বিপরীতে র্যান্ডমভাবে নির্ধারণ করা হতো। ১৫টি বোর্ডের মধ্যে কে কোন বোর্ডে যাবেন, তা আগে থেকে বোঝার সুযোগ ছিল না। এরপরও মানুষের মূল্যায়নে কিছুটা পক্ষপাতের সম্ভাবনা থাকে। তাই ভাইভার নম্বর যত কম রাখা যায়, ততই ভালো।’
ভাইভা কেন, আর কেনইবা কম নম্বর
ভাইভা রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাইভা চালুর একটা উদ্দেশ্য ছিল। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেছেন, কিন্তু তার যোগাযোগ দক্ষতা, বিষয়জ্ঞান বা উপস্থাপনের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভর না করে এসব বিষয় মূল্যায়নের জন্য ভাইভার প্রয়োজন আছে।’
ভাইভায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু ভাইভা প্রচণ্ডভাবে মিসইউজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ভাইভার নম্বর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবসময় সতর্ক থাকা দরকার, যাতে কেউ অযথা লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।’
ভাইভার নম্বর বেশি হলে কীভাবে লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রম বদলে যেতে পারে, তার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ধরুন, লিখিত পরীক্ষায় একজন ৫০-এর মধ্যে ৪০ পেয়েছেন এবং আরেকজন পেয়েছেন ১০। ভাইভায় প্রথমজনকে যদি ১০ দেওয়া হয় আর দ্বিতীয়জনকে ৩৫ দেওয়া হয়, তাহলে চূড়ান্ত ফলে দ্বিতীয়জনই এগিয়ে যাবেন। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় যে প্রার্থী অনেক ভালো করেছেন, ভাইভার নম্বর দিয়ে তাকে পেছনে ফেলে অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীকে চাকরি দেওয়া সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার নম্বরের ওজন কমিয়ে ভাইভার ওজন বাড়ালে প্রথমত লিখিত পরীক্ষায় বাড়তি কিছু প্রার্থী মেধাতালিকায় চলে আসবেন। দ্বিতীয়ত, ওই বাড়তি আসা প্রার্থীদের পছন্দের তালিকা অনুযায়ী ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে সহজেই চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ করানো সম্ভব হবে।’
প্রশাসনের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাইভার নম্বর যদি লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে ৫০-৫০ হয়, তাহলে আমি চাইলে লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া একজন প্রার্থীকে ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে চাকরি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারি। এতে লিখিত পরীক্ষা অনেকটাই অকেজো হয়ে যাবে।’
কতটা বাড়ছে ভাইভার নম্বর
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় ১১তম ও ১২তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভায় সমান ৫০ করে নম্বর থাকবে।
বেতন গ্রেড ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় ৬০ এবং ভাইভায় ৪০ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত পরীক্ষায় ৭৫ ও ভাইভায় ২৫ নম্বর রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোরও প্রস্তাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে লিখিত পরীক্ষায় অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া আরও বেশি প্রার্থী ভাইভার জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় ১১তম ও ১২তম গ্রেডের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি সবচেয়ে বড়। এখন ভাইভার নম্বর ১০ থাকলেও প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৫০ হবে। ফলে চূড়ান্ত মেধাক্রমে ভাইভার প্রভাব কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
সমালোচনা কেন
নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, লিখিত পরীক্ষা সাধারণত একই প্রশ্নপত্রে, একই সময়ে এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সেখানে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি কাঠামোবদ্ধ মূল্যায়ন সম্ভব। কিন্তু ভাইভায় বোর্ডের সদস্যদের হাতে নম্বর দেওয়ার সুযোগ বেশি থাকায়, সেখানে ব্যক্তিভেদে নম্বরের বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
সাবেক পিএসসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সঙ্গে যদি মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, নম্বর দেওয়ার কারণ লিপিবদ্ধ করা এবং অস্বাভাবিক নম্বরের ক্ষেত্রে পুনঃপর্যালোচনার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে চূড়ান্ত মেধাক্রম পরিবর্তনের সুযোগ বাড়বে। এমনকি রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত সুপারিশের ভিত্তিতে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন সমালোচকরা। তবে এ ধরনের অনিয়ম ঘটবে—এমন কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
সরকারের যুক্তি
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য বা বৈষম্য তৈরির জন্য ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করলেই একজন প্রার্থী সবদিক থেকে যোগ্য প্রমাণিত হন না। প্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, বিষয়জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি ও অন্যান্য সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মৌখিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য ভাইভা প্রয়োজন হলেও তার নম্বর লিখিত পরীক্ষার সমান করার প্রয়োজন আছে কি না। তাদের মতে, ভাইভা যদি মেধাক্রম নির্ধারণে এত বড় ভূমিকা নেয়, তাহলে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রতিবাদও হচ্ছে
ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন। তাদের আশঙ্কা, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ব্যাহত হতে পারে।
রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টির সমালোচনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, ভাইভার নম্বরের ওজন বাড়ানো হলে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
এখনও চূড়ান্ত নয়
ভাইভার নম্বর বাড়ানোর বিষয়টি এখনও প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালার পর্যায়ে রয়েছে। খসড়া প্রস্তুত করে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। চূড়ান্ত অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারির পরই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ভাইভার নম্বর কত রাখা হবে, লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কত হবে এবং ভাইভায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হবে—এ সবের ওপরই নির্ভর করবে নতুন নিয়োগব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব (অব.) জাবেদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন আমি তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত।’
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একসময় মৌখিক পরীক্ষা ২০ নম্বর নির্ধারিত ছিল। আমরা তখন মাঠে কাজ করি। ওই সব ভাইভা নেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম। ভাইভার সময় প্রচণ্ড তদবির আসতো। বাধ্য হয়ে আমরা অনেককে উল্টাপাল্টা নাম্বার দিয়ে দিতাম। সেখানে দেখা গেছে, যে প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছে তাকে দিয়েছি সর্বনিম্ন নাম্বার, আর সবচেয়ে কম নাম্বার পেয়েছে লিখিত পরীক্ষায়, সে পেয়েছে সবচেয়ে বেশি নাম্বার।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ১০ নাম্বার করা হয়েছিল ভাইভায়।’
ভাইভার নম্বর বাড়োনোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে কয়েক দফায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। মোবাইলে ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে এবং কল করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
জনপ্রশাসনের এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আকনুর রহমানকে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) একাধিকবার কল করে এবং ম্যাসেজ দিলেও তিনি কোনও সাড়া দেননি।









