কেটে গেছে দুই বছর, কবে সংস্কার হবে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’-এর ভাস্কর্য

আতিক হাসান শুভ
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৬আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৬

কিছু ভাস্কর্যের হাত-পা নেই, কিছু ভাস্কর্যের নেই মাথা, আবার অনেক ভাস্কর্যের বিচ্ছিন্ন দেহাবশেষ পড়ে আছে আশেপাশে। প্রায় সবগুলোতেই ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। একটা সময় যেখানে একসঙ্গে ফুটে উঠেছিল বাঙালির মুক্তির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, সেখান এখন কেবল ভাস্কর্যের ধ্বংসাবশেষ।

বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য চত্বর ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ এর কথা। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় খ্যাতিমান প্রয়াত ভাস্কর শামীম সিকদারের নির্মিত এই ভাস্কর্য কমপ্লেক্স। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই বছর। কিন্তু এখনও শুরু হয়নি দৃশ্যমান কোনও সংস্কার, পুনঃস্থাপন বা সংরক্ষণ কাজ। কবে হবে তা-ও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না কেউ।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অবস্থিত ১১৬টি ভাস্কর্যের অধিকাংশের বেহাল দশা। কিছু ভাস্কর্যের হাত-পা ভাঙা, কিছু ভাস্কর্যের মাথা ভাঙা, আবার অনেক ভাস্কর্যের ভাঙচুর করা দেহাবশেষ বিচ্ছিন্ন হয়ে আশেপাশে পড়ে আছে। সবগুলো ভাস্কর্যের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট।

ক্ষতবিক্ষত ভাস্কর্য

জানা গেছে, গত দুই বছরে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’-এর এসব ভাস্কর্য মেরামত না করার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন ভাস্কর্যের চোখ ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশন।

‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল

খ্যাতিমান ভাস্কর শামীম সিকদারের পরিকল্পনা ও নির্মাণে গড়ে ওঠা ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ কমপ্লেক্সে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা ভাস্কর্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতে, ১১৬টি ভাস্কর্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পকর্ম বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ও স্বাধীনতার দৃশ্যমান দলিল। দুই বছরেও এসব ভাস্কর্যের সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়া দুঃখজনক।

‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্য চত্বরের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণাসহ ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন এমন ১৮ জন শহীদের মুখাবয়ব দিয়ে পুরো ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়েছিল।’

ক্ষতবিক্ষত ভাস্কর্য

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, জগদীশ চন্দ্র বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শিল্পী এসএম সুলতান, সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, কামাল আতাতুর্ক, রাজা রামমোহন রায়, মাও সেতুং, ইয়াসির আরাফাত, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, কর্নেল এমএজি ওসমানী, তাজউদ্দীন আহমদ, সিরাজ সিকদারসহ অসংখ্য গুণীজনদের ভাস্কর্য ছিল।

এতদিনেও এসব ভাস্কর্য সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা উল্লেখ করে এই শিক্ষার্থী তানজির বলেন, অনেকদিন ধরে শুনে আসছিলাম এসব ভাস্কর্য সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু দুই বছর কেটে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনও নড়চড় দেখছি না। তাদের ব্যর্থতা স্পষ্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব ভাস্কর্য সংস্কার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী ও জাতির মাঝে উপস্থাপন করার জোর দাবি জানাই।

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এসব ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন বা সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছিলেন। সেখানে দ্রুত ভাস্কর্য কমপ্লেক্স পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানানো হয়। তবে এখনও কোনও দৃশ্যমান পুনঃস্থাপন কাজ শুরু হয়নি।

সংস্কারে একাধিকবার জানানো হয়েছে প্রশাসনকে  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাসিমুল খবির। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পরপরই আমরা ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় অফিসিয়ালি নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সংস্কার ও সংরক্ষণের বিষয়টি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা ভাস্কর্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বোচ্চটুকু সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনও সভা আহ্বান করা হয়নি বা আমাদের ডাকা হয়নি। যেহেতু ভাস্কর্য তদারকি কমিটির প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে আছেন, সেহেতু তারা যদি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেয় আমাদের কিছু করার নেই।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য যেসব জায়গায় বিশেষ করে অপরাজেয় বাংলায় যে ভাস্কর্য আছে তা সংরক্ষণ কাজ বর্তমানে চলমান। পাশাপাশি ‘রাজু ভাস্কর্য’ সংরক্ষণের পরিকল্পনাও এগিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ভাস্কর্য আছে সেসব রক্ষায় আরও বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।

‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ চত্বর পুনঃস্থাপনে জটিলতা

ভাস্কর্য চত্বরটি পুনঃস্থাপন করা সহজ কোনও প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে আইনি, কারিগরি ও আর্থিক-বিভিন্ন ধরনের জটিলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক শেখ আজহারুল ইসলাম।‌ তিনি বলেন, ভাস্কর শামীম সিকদার বর্তমানে জীবিত না থাকায় এবং তার পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে খুঁজে না পাওয়ায় শিল্পকর্ম পুনঃস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতি পাওয়ার বিষয়টি জটিল হয়ে পড়েছে।

তার মতে, কোনও শিল্পীর শিল্পকর্ম তার বা তার পরিবারের সম্মতি ছাড়া পুনঃস্থাপন করলে নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই কীভাবে মূল শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পভাবনা অক্ষুণ্ন রেখে কাজটি করা যায়, সে বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যগুলো সংরক্ষণে প্রশাসন যথেষ্ট আন্তরিক। আমরা অলরেডি সব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। এর কারণ অতীতে অনেক সময় দেখা গিয়েছে, ভাস্কর্য সংস্কার বা পুনঃস্থাপনের সময় বিকৃতি হয়েছে। তো এখন এটাই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যের শিল্পী শামীম সিকদার যেহেতু বেঁচে নেই, সেহেতু এটা পুনঃস্থাপনে কিছুটা জটিলতা আছে। তার শিল্পভাবনা ও সৃষ্টিশীলতা অক্ষুণ্ন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদনহীন কোনও হস্তক্ষেপের ফলে শিল্পীর মূল ভাবনা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমরা তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। ভাস্করের পরিবার বা অনুমোদিত কোনও প্রতিনিধি এগিয়ে এলে কালক্ষেপণ না করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

/আইএএম/
সম্পর্কিত
বাহিনীর নজরে ঢাবির সাবেক উপাচার্য মাকসুদ কামাল, পালানোর সুযোগ নেই
ঢাবিতে ককটেল বিস্ফোরণে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশিদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বাংলাদেশিদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
একদিন পর আবার ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ
একদিন পর আবার ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ
সারা দেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি
সারা দেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি
অনুষ্ঠানের স্ক্রিনে শেখ হাসিনার ছবি ভেসে উঠায় দুই শিক্ষককে শোকজ
অনুষ্ঠানের স্ক্রিনে শেখ হাসিনার ছবি ভেসে উঠায় দুই শিক্ষককে শোকজ
সর্বাধিক পঠিত
কষ্টের গল্প শুনে সাত দিনেই চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী, শাকিল বললেন কল্পনাও করিনি
কষ্টের গল্প শুনে সাত দিনেই চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী, শাকিল বললেন কল্পনাও করিনি
ভারত থেকে ফিরে অসুস্থ শি জিনপিং ও রামাফোসা?
ভারত থেকে ফিরে অসুস্থ শি জিনপিং ও রামাফোসা?
ভারতীয় ইলিশ দেশীয় বলে বিক্রি, আড়তদারকে জরিমানা
ভারতীয় ইলিশ দেশীয় বলে বিক্রি, আড়তদারকে জরিমানা
আবাহনী মাঠের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে, বদলাবে নামও
আবাহনী মাঠের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে, বদলাবে নামও
ডিলার নিয়োগও হবে অনলাইনে, আবেদনকারী বেশি হলে লটারি
ডিলার নিয়োগও হবে অনলাইনে, আবেদনকারী বেশি হলে লটারি