ঈদের ছুটিতে কিছু একটা করার ইচ্ছা অনেক দিন ধরেই ছিল। বছরের পর বছর রূপপুরের নাম পড়েছি, শুনেছি, খবরে দেখেছি। তবু নিজের চোখে দেখা হয়ে ওঠেনি। এবার মনে মনে ঠিক করলাম— এই ছুটিতে আর দেরি নয়, যেতেই হবে। পরিবারও সায় দিলো। গাড়ি বেরিয়ে পড়লো।
স্টিয়ারিংয়ে বসলো আমার ছোট ভাই সাজ্জাদ। সে আমার খুব কাছের একজন মানুষ। সঙ্গে ছিল স্ত্রী শারমিন, ছেলে শারাফ সিদ্দিক, আর শ্যালিকা বৃষ্টি, যে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজশাহী থেকে রূপপুরের দূরত্ব মোটামুটি ৬৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার। দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ। রাস্তাটা যেন নিজেই টেনে নিয়ে যাচ্ছিল পদ্মার দিকে। পথে পড়লো হার্ডিংজ ব্রিজ। ছাত্রজীবন থেকে এই ব্রিজ পেরিয়েই খুলনায় দেশের বাড়ি যাওয়া আসা। তবে আজকের যাত্রা একেবারেই আলাদা। পদ্মার ওপারে কোথাও এক বিশাল পরমাণু চুল্লি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে ভাবলাম, এবার সেটাই নিজের চোখে দেখবো।
রূপপুরে ঢুকতেই টের পেলাম, এটা একেবারেই সাধারণ কোনও জায়গা নয়— আকাশ ছোঁয়া ক্রেন, বিশাল কংক্রিটের কাঠামো, দিগন্তজোড়া কর্মব্যস্ততা। ছোট্ট এই এলাকায় এত মানুষের কাজকর্ম দেখে সত্যিই মাথা ঘুরে যায়। রাশিয়ান পল্লিতে পা রাখতেই মনে হলো— যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছি। চশমার দোকান, সবজির দোকান, মুরগির দোকান, সবখানেই বাংলাদেশি বিক্রেতারা সাবলীল রাশিয়ান ভাষায় কথা বলছেন, যেন এ ভাষাতেই তাদের বড় হওয়া। সাড়ে ছয় ফুট বা তারও বেশি লম্বা সুঠামদেহী মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন রাস্তায়। রাশিয়ান, বেলারুশ ও দাগেস্তানের ইঞ্জিনিয়ার আর প্রকল্পকর্মীরা— নারী পুরুষ নির্বিশেষে বুকে, গলায় কিংবা পায়ের কাফে উল্কি আঁকা শরীর নিয়ে চলছেন আপন ছন্দে। পদ্মার পাড়ে যেন এক টুকরো রাশিয়া উঠে এসেছে।
একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, একটা দৃশ্য যা মনে রাখার মতো। পথের ধারে কয়েকজন ভিক্ষুক, পাশে এতিমখানার মাদ্রাসার কিছু সাহায্যপ্রার্থী শিশু, তারাও রাশিয়ান প্রকৌশলীদের সঙ্গে দেদারসে রুশ ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। কোনও জড়তা নেই, কোনও ইতস্তত নেই, যেন অনেক দিনের পরিচিত। এই দৃশ্য দেখে বুঝলাম, রূপপুর শুধু প্রকল্প না, সবাই মিলে একসঙ্গে এগোচ্ছে।
দুপুরে গেলাম এলাকার সবচেয়ে বড় রেস্টুরেন্টে। ঝকঝকে পরিষ্কার, বড় হলঘর। টেবিলে টেবিলে রাশিয়ানরা খাচ্ছেন গোগ্রাসে। দেখলাম নিমিষেই পুরো প্লেট ভর্তি লাঞ্চ সাবাড় করে আবার অর্ডার দিচ্ছেন অন্য কোনও ডিশ। ওয়েটার জানালো, এই মানুষগুলো ঝাল একদমই খেতে পারেন না। ওঁদের পছন্দ বয়েল্ড ভেজিটেবল, শূকরের মাংসের স্টেক, বিফ স্টেক। দেশি ওয়েটারগুলো মহানন্দে সেটা সার্ভ করছেন, কেউ কেউ গুনগুন করে গাইছেনও। ক্যাশ কাউন্টারে থরেথরে সাজানো নানান ডিজাইনের রঙিন বোতল, ভেতরে কী আছে সেটা না বললেও চেহারা দেখেই বোঝা যায় এগুলো শুধু শরবতের জন্য রাখা হয়নি! একই টেবিলে আমাদের সামনে এলো চিকন চালের ভাত, লোভনীয় কোরাল মাছের দো পিয়াজী, মিক্সড ভেজিটেবল আর পাতলা ডাল। দুটো ভিন্ন সভ্যতার খাবার পাশাপাশি, দেখতেই মজা লাগলো।
সেই টেবিলেই পরিচয় হলো সাইট ইঞ্জিনিয়ার আলেক্সান্দার ভালকভের সঙ্গে। দেখতে যেন পাহাড়ের মতো মানুষ। উচ্চতা, গড়ন, ওজন সব মিলিয়ে বিশাল উপস্থিতি। কিন্তু কথা বলতে বসতেই বোঝা গেলো, বিনয়ী মানুষ বলতে যা বোঝায়, তারই এক দারুণ উদাহরণ তিনি। প্রজেক্টের শুরু থেকেই এখানে আছেন। ইংরেজিটাও চমৎকার বলেন।
কথায় কথায় বললাম, তোমাদের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ভালকভের হাসিতে যেন পুরো রেস্টুরেন্টটা দুলে উঠলো।
আনন্দে চোখ দুটো ঝলমল করছিল। খাবার টেবিলেই ভালকভ অনেক কথা শোনালেন রূপপুর নিয়ে। মাস শেষে তাঁর বেতন কত, তা সংখ্যায় না বললেও সহজেই বোঝা যায়, অঙ্কটা কম নয়। এরা দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন কারণ কাজটা বড়, চ্যালেঞ্জটা বড়। পৃথিবীর যেখানে পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রয়োজন, সেখানেই এই পেশাদার দল ছুটে যায়। রূপপুর তাঁদের কাছে আরেকটি দেশ, আরেকটি প্রকল্প। কিন্তু আমার কাছে এটি নিজের দেশের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নাম।
ভালকভের কাছ থেকে যা জানলাম, তার সঙ্গে নিজের পড়া হিসাব মিলিয়ে নিতে লাগলাম মনে মনে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনও পর্যন্ত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে ধরা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার কোটি। ডলারের দাম বাড়ায় খরচও বেড়েছে। রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংক মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ ঋণ দিচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশ দিচ্ছে মাত্র ১০ শতাংশ। এটা কি খুব বেশি বিনিয়োগ? কেউ কেউ এমন প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে তার আগে ফেরত পাওয়ার হিসাবটা দেখা জরুরি। দুটো ইউনিট মিলিয়ে উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ধরলেও বার্ষিক রাজস্ব আসবে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে কমপক্ষে ৬০ বছর, সরকারি প্রক্ষেপণে ১০০ বছর পর্যন্ত। ৬০ বছরের উৎপাদনকাল ধরলে মোট বিনিয়োগ উঠে আসার পরেও দীর্ঘ একটা লাভজনক পর্ব বাকি থাকে। সরাসরি বিদ্যুৎ পাবে প্রায় ১৮ লাখ পরিবার। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১০ ভাগ পূরণ করবে কেবল এই একটি কেন্দ্র।
প্রশ্ন আসে, দাম কি বেশি পড়ছে না? আন্তর্জাতিক তুলনায় রূপপুরের প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণব্যয় অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এই প্রশ্ন তোলা জরুরি, এই হিসাব চাওয়া দরকার। কিন্তু একটু পেছনে তাকালেও বোঝা যায়, যে দেশ প্রথমবার পারমাণবিক প্রযুক্তিতে পা দেয়, তাকে সক্ষমতা তৈরির জন্য বাড়তি খরচ গুনতে হয়। ভারত, পাকিস্তান, চীন, সবাই একদিন এই পথ দিয়েই হেঁটেছে। আর বিকল্পটা কী?
গ্যাসের মজুদ শেষ হচ্ছে। তেল আমদানির খরচ বাড়ছে। সৌরবিদ্যুৎ রাতে চলে না। একটা বড় সুবিধা হলো— এই বিদ্যুৎ দিন-রাত থামে না, অন্য অনেক উৎসের মতো না। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে যে বিদ্যুৎ চাই, তার একটা অপরিহার্য স্তম্ভের নাম রূপপুর। তবে ছবিটা পুরো উজ্জ্বল না। স্প্রিনগার এর গবেষণা বলছে, রূপপুরে বিদ্যুৎ
উৎপাদনের প্রকৃত খরচ পড়বে ৯.৩৬ সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা, যেখানে ভারতের একই ধরনের কুদানকুলাম প্ল্যান্টে এই খরচ মাত্র ৫.৩৬ সেন্ট। পার্থক্যটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। আর ঋণের বোঝাটাও ছোট না — সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার শোধ করতে
হবে সুদসহ, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এই টাকা আসবে বিদ্যুৎ বিক্রির রাজস্ব থেকেই। হিসাবটা আঁটোসাটো হলেও কঠিন নয়।
বৃষ্টি একটু চুপ ছিল সব শুনে। তারপর বললো, ভাইয়া, আমি যখন ভার্সিটি পাস করবো, তখন কি এই বিদ্যুৎ চলে আসবে? বললাম, তুই যখন মাস্টার্স করবি, তখন এই কেন্দ্র পুরোদমে চলবে। ভার্সিটিতে ভর্তিচ্ছু একটা মেয়ে যখন পারমাণবিক বিদ্যুতের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ মেলায়, তখন বুঝি প্রজেক্টটা শুধু কাগজে-কলমের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।
সাইটে ঢোকার পাস ছিল আমার কাছে। কিন্তু শারমিনের সিদ্ধান্ত, কেনাকাটা বাকি। স্ত্রীর সিদ্ধান্তে যুক্তি খাটে না। বাইরে থেকেই দেখলাম মহাযজ্ঞ। আকাশছোঁয়া প্রচুর আবাসিক ভবন, পাশেই বাঙালির হাটবাজার। ইঞ্জিনিয়ারদের আবাস আর স্থানীয় চায়ের দোকান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, দুটো জগৎ একসঙ্গে বাঁচছে। দোকানদার থেকে পুলিশ, সবাই বাঙালি। এই প্রকল্পকে ঘিরে পুরো একটা অর্থনীতি গড়ে উঠেছে অত্র এলাকায়।
বিকালে চলে গেলাম পদ্মার পাড়ে। বাঁশের বেঞ্চে পা ছড়িয়ে বসা। হাতে গরুর দুধের ঘন চা। সামনে বিস্তীর্ণ পদ্মা। বিকালের নরম আলোয় নদীর রঙ ধীরে ধীরে তামাটে হয়ে ওঠে। শারমিন আর বৃষ্টি, দুই বোন, ক্যামেরা হাতে একের পর এক ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেলা। শারাফ মাটিতে বসে কী যেন খুঁজছে, সাজ্জাদ নীরবে তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। পরিবারের এই মুহূর্তগুলো কোনও ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, এগুলো জমা রাখতে হয় মনের ভেতরেই। ছবি তোলা হলো অনেক, ফোনও ভরে গেলো। তবু সবচেয়ে দামী ছবিটা তোলা হলো না। ঘন চায়ের ধোঁয়ার আড়াল দিয়ে দেখা পদ্মার সূর্যাস্ত।
ফেরার পথে গাড়িতে সবাই চুপ। শারাফ কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝিনি। শারমিন কাচের গায়ে মাথা হেলান দিয়েছে। সাজ্জাদ নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। ঈশ্বরদী ছেড়ে আসছি, আর একটু একটু করে রূপপুর পেছনে পড়ছে। রাস্তার দুপাশে গাছের ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্না। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় রূপপুর মায়াকাড়া টানে আমাদের সবাইকে ফেলে দিয়েছে, বুঝলাম।
পদ্মা পেছনে ফেলে আসতে আসতে মাথায় ঘুরছিল ভালকভের কথা, বৃষ্টির প্রশ্ন, আর সেই হিসাবটা। এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। বিপরীতে প্রতি বছর ১০ হাজার কোটির রাজস্ব। ১৮ লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ। ষাট থেকে একশো বছরের আয়ু। এটা শুধু একটা প্রজেক্ট না, আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা। হয়তো কিছুদিন পরে রাতের পাবনা, ঈশ্বরদীর আলো আরেকটু উজ্জ্বল হবে।
কারখানার চাকা নিরবচ্ছিন্ন ঘুরবে। গ্রামে গ্রামে লোডশেডিং থাকবে না। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ দিলে যে বাংলাদেশটা দেখা যাবে, সেটার একটা ঝলক দেখলাম পদ্মার ওপাড়ে ওই বিশাল কাঠামোর মধ্যে।
সমালোচনা থাকবে। প্রশ্ন উঠবে। হিসাব চাওয়া উচিত। কিন্তু সব বিতর্কের শেষে যেদিন এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে ছুটবে, সেদিন অনেক কথাই চুপ হয়ে যাবে।
রাত হয়ে গেছে। গাড়ির জানালায় রাজশাহীর আলো ফুটে উঠছে। ছেলেটা ঘুমের মধ্যে আমার কাঁধে মাথা রেখেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় তার মুখের দিকে তাকালাম। এই ছেলে যখন বড় হবে, যখন পড়াশোনা শেষ করে কাজে নামবে, তখন রূপপুরের বিদ্যুৎ তার ল্যাপটপে আলো দেবে, তার ফ্যাক্টরির চাকা ঘোরাবে, তার শহরের রাত উজ্জ্বল রাখবে। শারাফ হয়তো জানবেও না, তার বাবা একদিন পদ্মার পাড়ে বসে ঘন চায়ের কাপ হাতে এই স্বপ্নের কাছে গিয়েছিল।
এটাই তো আমার দেশ। এটাই আমাদের প্রজন্মের দেখা বড় স্বপ্নগুলোর একটি। রূপপুর একদিন তার হিসাব ঠিকই মেলাবে, নিজের সময়ে, নিজের নিয়মে। আমরা শুধু সেই স্বপ্নটাকে বুকে ধরে রাখি।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক









