নরওয়ে-রাশিয়া সীমান্ত এখন আর্কটিক ভ্রমণের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠছে। তুন্দ্রা ও তাইগা অরণ্যের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া মনোরম হাঁটার পথগুলো পর্যটকদের যেমন প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি দিচ্ছে ইউরোপের অন্যতম কড়া নজরদারিতে থাকা একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত দেখার সুযোগ।
উত্তর-পূর্ব নরওয়ের কিরকেনেস শহরটি ফিনল্যান্ড, রাশিয়া ও নরওয়ের মিলনস্থলের কাছে অবস্থিত। আর্কটিক ক্রুজের জনপ্রিয় গন্তব্য এই শহর থেকে এখন স্থানীয় পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো ১৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নরওয়ে-রাশিয়া সীমান্তে হাঁটার ভ্রমণের আয়োজন করছে। বেড়া না থাকলেও সীমান্তটি কঠোর নজরদারির আওতায়।
সীমান্তের হাঁটার পথে গাছের ডালে রয়েছে নজরদারি ক্যামেরা, দিগন্তে দেখা যায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। পাশাপাশি রয়েছে সামরিক টহল। আন্তর্জাতিক সীমান্তের অবস্থান বোঝাতে নরওয়ের জন্য হলুদ এবং রাশিয়ার জন্য লাল রঙের সীমান্তচিহ্ন বসানো হয়েছে।
তিন ঘণ্টার একটি জনপ্রিয় হাঁটার পথে পর্যটকেরা বার্চ অরণ্য পেরিয়ে পাসভিক নদীর সমান্তরালে এগিয়ে যান। প্রায় এক কিলোমিটার পর পৌঁছান আট মিটার প্রশস্ত ‘বর্ডার করিডর’-এ। গাছপালা পরিষ্কার করে রাখা এই অংশটি কার্যত নিষিদ্ধ এলাকা। সেখান থেকে রুশেহগদা পাহাড়ের দিকে উঠে দেখা যায় স্তরস্কগ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র নরওয়ে ও রাশিয়ার মধ্যে একমাত্র বৈধ স্থলসীমান্ত।
এই ভ্রমণের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীলতার বিষয়টিও স্পষ্ট। পর্যটকদের গাইড হেনরিক হফম্যান সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের সময় রুশ মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফোন বন্ধ রাখেন এবং সঙ্গে রাখেন স্যাটেলাইট ফোন।
হফম্যান ২০২৫ সাল থেকে এই সীমান্তভ্রমণে পর্যটকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর নরওয়ে ও রাশিয়া দুই দেশই সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। সীমান্তের দিকে পাথর ছোড়ার মতো ঘটনাতেও জরিমানা হতে পারে, আর চিহ্নিত সীমানা অতিক্রম করলে আটক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবু পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। হুর্টিগ্রুটেন ও হাভিলা ক্রুজের যাত্রীরা জাহাজ ও বাসের গণ্ডি ছেড়ে সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে অঞ্চলটির ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি দেখতে চাইছেন। বিশেষ করে বয়স্ক পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ বেশি, যাদের অনেকেই শীতল যুদ্ধের সময়কার ইউরোপ-রাশিয়া সম্পর্কের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন।
কিরকেনেস ট্যুরস নতুন করে এই ভ্রমণ চালু করলেও, হাভিলা ভয়েজেস ২০০০ সাল থেকেই পর্যটকদের সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। হুর্টিগ্রুটেনের ‘নরওয়েজিয়ান বর্ডার’ ভ্রমণটিও সম্প্রতি কিরকেনেসের আটটি ভ্রমণপথের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই ভ্রমণের পথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি আশ্রয়কেন্দ্রও রয়েছে।
কিরকেনেসের ইতিহাসও এই সীমান্তকে ঘিরে। শহরের সড়কের নামফলক নরওয়েজীয় ও রুশ দুই ভাষায় লেখা। শহরের কেন্দ্রের ‘রাশিয়া যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ’ ১৯৪৪ সালে নাৎসি দখলদারত্ব থেকে রেড আর্মির কিরকেনেস মুক্ত করার স্মৃতি বহন করছে। কাছের বর্ডারল্যান্ড জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছে নরওয়েজীয়, ফিনিশ ও রুশ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পারস্পরিক যোগাযোগ ও বসবাসের ইতিহাস।
পাসভিক নদীর কাছে থাকা দ্বাদশ শতাব্দীর বরিস গ্লেব রুশ অর্থোডক্স গির্জাটিও এই সীমান্তের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় ২০০ বছর আগে এখানকার আধুনিক সীমান্ত নির্ধারণে গির্জাটি ভূমিকা রেখেছিল।
প্রকৃতি, ইতিহাস ও ভূরাজনীতির এই সমন্বয়ই কিরকেনেসের সীমান্তভ্রমণকে অন্য আর্কটিক ভ্রমণ থেকে আলাদা করে তুলছে। ফলে ক্রুজ পর্যটকদের কাছে রাশিয়া-নরওয়ে সীমান্ত এখন শুধু একটি ভূগোলের রেখা নয়, বরং কাছ থেকে দেখার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে।









