সবুজ পাহাড়, পাথুরে পথ আর ঝরনার স্বচ্ছ জলের ধারা প্রকৃতির এমন অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝর্ণা হতে পারে দারুণ এক গন্তব্য। পাহাড়ের নির্জন পরিবেশ আর ঝিরিপথের রোমাঞ্চকর যাত্রা মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় জলপ্রপাত।
মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই ঝরনা শুধু একটি জলপ্রপাত নয়, এটি প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার জায়গা। মীরসরাইয়ের অন্যান্য ঝরনার মধ্যে খৈয়াছড়া ঝর্ণা ও এর ঝিরিপথ আকার ও সৌন্দর্যের দিক থেকে বিশেষভাবে পরিচিত।
পাহাড়ের ভেতরে লুকানো সৌন্দর্য
খৈয়াছড়া ঝরনায় রয়েছে মোট ৯টি বড় ধাপ বা ক্যাসকেড। এর পাশাপাশি রয়েছে আরও অনেক ছোট ছোট ধাপ। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা, চারপাশের সবুজ বন আর পাথুরে পথ ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে।
ঝর্ণাটির নামকরণ হয়েছে খৈয়াছড়া ইউনিয়নের নাম অনুসারে। একসময় জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকা ও ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে জায়গাটি তেমন পরিচিত ছিল না। ধারণা করা হয়, প্রায় ৫০ বছর আগে পাহাড়ি ঢলের কারণে এই ঝরনার সৃষ্টি হয়। পরে ধীরে ধীরে এটি ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
যেভাবে যাবেন
চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার পূর্বে খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবস্থান।
ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে মীরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় যেতে হবে। সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে ঝরনার কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছানো যায়। তবে পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত মূল ঝরনায় যেতে হলে বেশ কিছু পথ হেঁটে যেতে হয়। তাই ভ্রমণের আগে মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
রোমাঞ্চকর ঝিরিপথের যাত্রা
খৈয়াছড়া ঝর্ণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ঝিরিপথ। পাহাড়ি পথ, ছোট ছোট পানির ধারা, পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয় মূল ঝরনার দিকে। পথটি যেমন কষ্টের, তেমনি এর প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা।
ঝরনার কাছে পৌঁছানোর পর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা পানির ধারা আর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
ভ্রমণে যা মনে রাখবেন
খৈয়াছড়া ঝর্ণায় ভ্রমণের সময় কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। যেমন- বর্ষাকালে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তাই সাবধানে চলতে হবে। ভালো গ্রিপযুক্ত জুতা ব্যবহার করা উচিত। ঝরনার পাথরে ওঠার সময় সতর্ক থাকতে হবে। প্লাস্টিক বা কোনও ধরনের বর্জ্য ফেলে প্রকৃতির ক্ষতি করা যাবে না। স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ
খৈয়াছড়া ঝরনা বারৈয়াঢালা ব্লক থেকে কুণ্ডের হাট (বড়তাকিয়া) ব্লকের জাতীয় উদ্যান এলাকার অন্তর্ভুক্ত। ২০১০ সালে এই পাহাড়ি এলাকাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের উদ্যোগে খৈয়াছড়া ঝর্ণাকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়, যার অন্যতম লক্ষ্য হলো এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করা।
খৈয়াছড়া ঝরনা শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক দারুণ সুযোগ। পাহাড়ের নীরবতা, ঝিরিপথের রোমাঞ্চ আর ঝরনার নির্মল সৌন্দর্য সব মিলিয়ে একদিনের এই ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যারা অ্যাডভেঞ্চার ও প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে ভালোবাসেন, তাদের ভ্রমণ তালিকায় খৈয়াছড়া ঝরনা অবশ্যই জায়গা পাওয়ার মতো একটি স্থান।
