আইরিশ সাগরে প্রাচীন ইতিহাসের খোঁজে, যেখানে পাথরে লেখা হাজার বছরের গল্প

ফিচার ডেস্ক
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:১০ আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:১০

পিরামিড নির্মাণেরও বহু আগে আইরিশ সাগর ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিস্ময়কর সব প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা। সেই প্রাচীন নিদর্শনের খোঁজে আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস ও আইল অব ম্যান ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা যেন ইতিহাসের অন্ধকার সুড়ঙ্গে আলো জ্বালার মতো।

আইরিশ সাগরকে ঘিরে রয়েছে ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিদর্শন। প্রায় ৫ হাজার ১০০ বছর আগে এই অঞ্চলে বসতি গড়া নিওলিথিক জনগোষ্ঠী সমুদ্রপথকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পথ হিসেবেও ব্যবহার করেছিল। তাদের নির্মিত পাথরের সমাধিসৌধ, দাঁড়ানো পাথর ও ধর্মীয় স্থাপনার অনেকগুলো আজও টিকে আছে।

এই প্রাচীন নিদর্শন ঘুরে দেখার জন্য আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের উত্তরে অবস্থিত নিউগ্রেঞ্জ হতে পারে যাত্রার অন্যতম আকর্ষণীয় শুরু।

নিউগ্রেঞ্জে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস

ডাবলিন থেকে প্রায় ৩০ মাইল উত্তরে অবস্থিত নিউগ্রেঞ্জ নিওলিথিক সাইট ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্যাসেজ টম্ব। নওথের কাছের দর্শনার্থী কেন্দ্র থেকে বাসে করে এখানে পৌঁছানো যায়।

প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৫০ সালের দিকে নির্মিত এই বিশাল সমাধিসৌধটি গ্রেট পিরামিডেরও কয়েক শতাব্দী আগে তৈরি। বাইরে থেকে ঘাসে ঢাকা বিশাল টিলার মতো দেখালেও এর ভেতরে রয়েছে সরু করিডর ও কেন্দ্রীয় কক্ষ।

স্থাপনাটির প্রবেশপথে রয়েছে প্রায় পাঁচ টন ওজনের একটি বিশাল পাথর। এতে খোদাই করা সর্পিল নকশা নিওলিথিক শিল্পকলার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন। সমাধিসৌধটির ওপর পাথর ও মাটির বিশাল স্তর থাকলেও এর ছাদ হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় অক্ষত রয়েছে।

নিউগ্রেঞ্জের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য শীত অয়নান্তের সূর্যালোক। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ভোরের সূর্যের আলো সরু প্রবেশপথ ও করিডর পেরিয়ে কেন্দ্রীয় কক্ষে পৌঁছায়। ১৯৬৭ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক মাইকেল ও’কেলি এই আলোকপ্রবেশের ঘটনাটি নথিবদ্ধ করেন।

এই স্থাপনা থেকে বোঝা যায়, কয়েক হাজার বছর আগের মানুষেরা সূর্যের গতিপথ ও ঋতুচক্র সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য জ্ঞান রাখত।

হিল অব তারা ও মাউন্ড অব দ্য হোস্টেজেস

নিউগ্রেঞ্জের পাশাপাশি মিথ কাউন্টির হিল অব তারা আয়ারল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। প্রাচীন আইরিশ রাজাদের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্কের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও লোককথায় পাওয়া যায়।

এখানে রয়েছে লিয়া ফেইল নামে পরিচিত দাঁড়ানো পাথর। এর সঙ্গে প্রাচীন রাজাদের অভিষেকের কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে।

হিল অব তারার কাছেই রয়েছে মাউন্ড অব দ্য হোস্টেজেস। এটি একটি প্রাচীন সমাধিসৌধ, যার বয়স এতটাই বেশি যে গ্রেট পিরামিড নির্মাণের সময়ও এটি বহু পুরোনো ছিল।

এই স্থাপনাগুলো ভ্রমণকারীদের জন্য আয়ারল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সমাধি-প্রথা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

মধ্যযুগীয় আয়ারল্যান্ডের ছোঁয়াও

প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের এই ভ্রমণপথে রয়েছে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও।

উইকলোর গ্লেনডালফ ষষ্ঠ শতকে গড়ে ওঠা একটি প্রাচীন ধর্মীয় কেন্দ্র। বর্তমানে এটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ও পর্যটনকেন্দ্র।

মিথ কাউন্টির ট্রিম ক্যাসল দ্বাদশ শতকের দুর্গ। মধ্যযুগীয় স্থাপত্য ও আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে এটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

ফলে একই ভ্রমণপথে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের নানা অধ্যায় দেখা যায়।

ওয়েলসে পেনত্রে ইফান

আইরিশ সাগর পেরিয়ে ওয়েলসের পেমব্রোকশায়ারে রয়েছে পেনত্রে ইফান। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩৫০০ সালের এই সমাধিসৌধ ওয়েলসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিওলিথিক স্থাপনাগুলোর একটি।

পাথরের বিশাল স্ল্যাব দিয়ে তৈরি এই সমাধিসৌধ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করেছে। একই অঞ্চলের নীলচে পাথর স্টোনহেঞ্জে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ধারণা করা হয়।

প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাকৃতিক দৃশ্য—দুইয়ের সমন্বয়ের কারণে পেনত্রে ইফান ওয়েলসের ভ্রমণপথে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

আইল অব ম্যানের প্রাচীন নিদর্শন

আইরিশ সাগরের মাঝামাঝি অবস্থিত আইল অব ম্যান প্রাগৈতিহাসিক ও কেল্টিক ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। এখানকার প্রত্নস্থলগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য হলো পর্যটনকেন্দ্রিক অতিরিক্ত আয়োজনের অনুপস্থিতি।

অনেক প্রাচীন স্থাপনার পাশে রয়েছে শুধু ছোট লোহার ফলক। সেখানে স্থাপনাটিকে ‘Ancient Monument’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা অনেকটা নিজস্ব অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই এসব স্থান আবিষ্কার করতে পারেন।

দ্বীপটির সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ স্নেফেল, বিভিন্ন কেল্টিক ক্রস এবং ম্যানক্স মিউজিয়াম ভ্রমণের পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্যের ইতিহাস জানার সুযোগ রয়েছে।

ক্যাশটাল ইন আর্ডে প্রস্তরযুগের স্মৃতি

আইল অব ম্যানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিওলিথিক স্থাপনা ক্যাশটাল ইন আর্ড। মাঠের মধ্যে অবস্থিত এই প্রাচীন সমাধিসৌধে যেতে হয় একটি ছোট প্রবেশপথ পেরিয়ে।

ধসে পড়া প্যাসেজ টম্বটির মূল কাঠামো পুরোপুরি অক্ষত নেই। তবে ফ্যাকাশে পাথরের সারিতে এখনও বোঝা যায় এর একসময়কার প্রবেশপথ, করিডর ও কেন্দ্রীয় কক্ষের বিন্যাস।

চারপাশে অন্ধকার পাহাড় আর খোলা মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলো স্থাপনাটিকে অন্যরকম আবহ দেয়। নিউগ্রেঞ্জের মতো এখানে বড় দর্শনার্থী কেন্দ্র বা আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই। ফলে প্রত্নস্থলটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নীরবতা সরাসরি উপভোগ করা যায়।

ইতিহাসের সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন

আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস ও আইল অব ম্যানের এই ভ্রমণপথ শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেখার সুযোগ নয়। পথে রয়েছে পাহাড়, সমুদ্র, সবুজ মাঠ, মধ্যযুগীয় দুর্গ, প্রাচীন ধর্মীয় কেন্দ্র ও কেল্টিক ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন।

বিশেষ করে নিউগ্রেঞ্জ, পেনত্রে ইফান ও ক্যাশটাল ইন আর্ড দেখায়, আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই হাজার হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে বিশাল পাথরের স্থাপনা নির্মাণ করেছিল এবং সেগুলোকে সূর্য, ঋতু, মৃত্যু ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

আইরিশ সাগর ঘিরে তাই এই ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে একই সঙ্গে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও প্রকৃতির এক অনন্য অভিজ্ঞতা—যেখানে প্রতিটি পাথরই যেন কয়েক হাজার বছরের পুরোনো কোনো গল্পের নীরব সাক্ষী।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
শেরপুরের পাহাড়ঘেরা এই তীর্থস্থানে মিলবে প্রকৃতি ও প্রশান্তির ছোঁয়া
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় ৯ নেতাকর্মীর মোবাইল ফোন চুরি, থানায় জিডি
প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় ৯ নেতাকর্মীর মোবাইল ফোন চুরি, থানায় জিডি
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যু: রিসোর্টের মালিক দুজন, আসামি কেন একজন?
কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যু: রিসোর্টের মালিক দুজন, আসামি কেন একজন?
মোটরসাইকেল চোর চক্রের সদস্য কনস্টেবল, যেভাবে ধরা পড়লেন
মোটরসাইকেল চোর চক্রের সদস্য কনস্টেবল, যেভাবে ধরা পড়লেন
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মির প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন