ধ্বংসের পথে সাতানি গ্রামের ২৪ প্রাচীন স্থাপনা

ফিচার ডেস্ক
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০

সবুজে ঘেরা একটি গ্রাম। নীরব পরিবেশের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের বহু পুরোনো কিছু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারি এলাকার সাতানি গ্রামের দত্তবাড়ি মৌজায় একসময় ছিল প্রায় ৪০টি প্রাচীন স্থাপনা। এর মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র ২৪টি। প্রায় সাড়ে চারশ’ বছরের ইতিহাস বহনকারী এসব স্থাপনা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

একই আঙিনায় এতগুলো প্রাচীন স্থাপনার উপস্থিতি সাতানি গ্রামকে করে তুলেছে বরিশালের অন্যতম সম্ভাবনাময় ঐতিহাসিক ও হেরিটেজ পর্যটনস্থল। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে একের পর এক স্থাপনা হারিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৬টি স্থাপনা বিলুপ্ত হয়েছে।

যে স্থাপনাগুলো এখনো ইতিহাসের সাক্ষী

সাতানি গ্রামের প্রাচীন স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে জমিদারবাড়ি, সতীদাহ ভিটে, বালাখানা ও সরাইখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। সময়ের ক্ষত বুকে নিয়েও এসব স্থাপনার দেয়াল ও নির্মাণশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। অনেক ভবনের ছাদ নেই, দেয়ালের ইট খসে পড়ছে; কোথাও আবার গাছগাছালিতে ঢেকে গেছে পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্য।

বিশেষ করে সতীদাহ ভিটে এই এলাকার ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়ের স্মারক হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো জমিদারবাড়ির ভগ্ন দেয়াল ও স্থাপত্যের অবশিষ্ট অংশ অতীতের জমিদারি জীবনের চিত্র তুলে ধরে।

সতীদাহ ভিটে। ছবি: সংগৃহীত

বারো ভূঁইয়ার ইতিহাসের সঙ্গে যোগ

স্থানীয় ইতিহাস ও গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাতানি গ্রামের এসব স্থাপনার ইতিহাস বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্য-এর বংশধরদের সঙ্গে যুক্ত। সীতারাম ও বিজরাম নামে দুই ভাই ১৫৬০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই এলাকায় জমিদারি শুরু করেছিলেন বলে গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে সাতানি গ্রামের স্থাপনাগুলো শুধু স্থানীয় কোনো পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ নয়; এগুলো বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষকরা মনে করেন।

একসময় ছিল জমজমাট, এখন নীরব

স্থানীয় বংশধরদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় এই জমিদারবাড়ির আঙিনায় ছিল মানুষের ব্যস্ততা। শত শত মানুষের বসবাস ছিল এখানে। নিয়মিত পূজা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নানা আয়োজন ঘিরে মুখর থাকত পুরো এলাকা।

সময় বদলেছে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, বংশের অনেক মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন। এখন মাত্র কয়েকটি পরিবার এখানে বসবাস করে। পুরোনো ভবনগুলোর অনেকগুলো ছাদহীন অবস্থায় পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ ও জনবল না থাকায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

সাতানি গ্রামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—একটি নির্দিষ্ট এলাকায় একই সঙ্গে এতগুলো প্রাচীন স্থাপনার উপস্থিতি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের একজন সহকারী কাস্টোডিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, বরিশাল অঞ্চলে একই স্থানে এতগুলো প্রাচীন স্থাপনা আর কোথাও নেই এবং স্থানটি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইতোমধ্যে ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও পর্যটকরা জায়গাটি দেখতে আসছেন। সংরক্ষণ করা গেলে সাতানি গ্রামকে একটি হেরিটেজ ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এখানে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম সরাসরি দেখতে পারবে বাংলার পুরোনো স্থাপত্য ও জমিদারি ইতিহাসের নিদর্শন।

সংরক্ষণই এখন সবচেয়ে বড় দাবি

ইতিহাসের এমন মূল্যবান নিদর্শন একবার হারিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। সাতানি গ্রামের ২৪টি স্থাপনা তাই শুধু স্থানীয় মানুষের সম্পদ নয়—এগুলো দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্থানটি পরিদর্শন করেছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই প্রয়োজন দ্রুত জরিপ, প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, সংরক্ষণ এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো তৈরি। সঠিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে ধ্বংসের পথে থাকা সাতানি গ্রামের প্রাচীন স্থাপনাগুলোই হয়ে উঠতে পারে বরিশালের নতুন ঐতিহাসিক পর্যটন গন্তব্য।

সাতানি গ্রাম যেন ভগ্ন দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে থাকা বাংলার কয়েক শত বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাস বাঁচাতে এখনই প্রয়োজন সংরক্ষণের উদ্যোগ।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
টেটনের স্বচ্ছ জলে ডুব, সঙ্গে পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য
বিমান ও পর্যটন খাতে গতি আনতে চান নতুন মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত
আইরিশ সাগরে প্রাচীন ইতিহাসের খোঁজে, যেখানে পাথরে লেখা হাজার বছরের গল্প
সর্বশেষ খবর
শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ টিকটক, ৪০ কোটি ডলারে সমঝোতা
শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ টিকটক, ৪০ কোটি ডলারে সমঝোতা
বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে ব্রুনাই
বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে ব্রুনাই
গ্যাস আমদানির নামে ১৭ বছর লুটপাট করা হয়েছে: প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব
গ্যাস আমদানির নামে ১৭ বছর লুটপাট করা হয়েছে: প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব
ত্বকের যত্নে চকোলেট ফেস মাস্ক: ঘরেই যত্ন, তবে সতর্কতায়
ত্বকের যত্নে চকোলেট ফেস মাস্ক: ঘরেই যত্ন, তবে সতর্কতায়
সর্বাধিক পঠিত
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল
৩ দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কূটনীতিককে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ
৩ দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কূটনীতিককে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ
অসময়ে তরমুজ চাষে সাফল্যে মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে হাসি
অসময়ে তরমুজ চাষে সাফল্যে মৃত্যুঞ্জয়ের মুখে হাসি