শহরের ব্যস্ততা থেকে কয়েক দিনের বিরতি চাইছেন? এমন কোনও জায়গায় যেতে মন চাইছে, যেখানে সকালে ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে, জানলার বাইরে থাকবে ঘন সবুজ আর বিকাল নামবে জঙ্গলের নিস্তব্ধতায়? বর্ষায় সেই তালিকায় রাখতে পারেন বাঁকুড়ার ঝিলিমিলিকে।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের এই ছোট্ট জনপদ বর্ষায় যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। চারদিকে ঘন জঙ্গল, লাল মাটির পথ, পাহাড়ি ঢেউ আর জলাধারের নীল জলে শহরের চেনা দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশ। বিশেষ করে বৃষ্টির পর ধুয়ে যাওয়া সবুজ আর ভেজা মাটির গন্ধ ঝিলিমিলির সৌন্দর্যকে করে তোলে আরও গভীর।
পথটাই যখন ভ্রমণের অংশ
ঝিলিমিলির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো কোনও নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থান নয়, বরং সেখানে পৌঁছনোর পথ। রানিবাঁধ থেকে ঝিলিমিলির দিকে এগোতে থাকলে দু’পাশে ঘন জঙ্গল রাস্তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে।
শাল, পিয়াল, মহুয়া, সেগুন ও শিমুলের গাছের সারির মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। বর্ষার মেঘলা আকাশ আর চারপাশের টাটকা সবুজের মধ্যে দিয়ে গাড়িতে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হবে, শহরের জীবন যেন অনেক দূরে কোথাও পড়ে রয়েছে।
লাল মাটির রাস্তার দু’পাশের গাছপালা অনেক জায়গায় এমনভাবে মাথার ওপর ছাউনি তৈরি করে যে পথটি দেখতে লাগে সবুজ সুড়ঙ্গের মতো। তাই ঝিলিমিলিতে পৌঁছনোর আগেই শুরু হয়ে যায় আসল ভ্রমণ।
জঙ্গল, জল আর নির্জনতার মায়া
বাঁকুড়ার খাতড়া মহকুমার অন্তর্গত ঝিলিমিলির চারপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। বর্ষায় জঙ্গলের রং যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। কোথাও শালগাছের সারি, কোথাও মহুয়ার ছায়া, আবার কোথাও ঘন ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক।
যারা প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে এই পরিবেশই হতে পারে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এখানে বেড়ানোর অর্থ শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে দেখা নয়, বরং ধীরে হাঁটা, গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা, বৃষ্টিভেজা জঙ্গলের গন্ধ নেওয়া এবং কিছু সময় মোবাইলের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা।
ঘুরে আসুন সুতান
ঝিলিমিলি থেকে অল্প দূরেই রয়েছে সুতান। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই এলাকাটি প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয়। ভাগ্য ভালো থাকলে জঙ্গলের মধ্যে দেখা মিলতে পারে নানা প্রজাতির পাখির। কখনও চোখে পড়তে পারে ময়ূরও। তবে জঙ্গলে ঘোরার সময় স্থানীয় নির্দেশিকা ও বনাঞ্চলের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
তালবেড়িয়া জলাধারে অন্য রূপ
জঙ্গল ঘোরার পর পানি দেখতে চাইলে যেতে পারেন তালবেড়িয়া জলাধারে। জলাধারের নীল পানি, চারপাশের সবুজ আর ছোট ছোট টিলার দৃশ্য বর্ষায় বিশেষ সুন্দর হয়ে ওঠে।
মেঘলা আকাশের নিচে শান্ত জলরাশি আর চারপাশের সবুজের প্রতিফলন তৈরি করে অন্যরকম দৃশ্য। ছবি তুলতে ভালোবাসেন যারা, তাদের জন্যও জায়গাটি আকর্ষণীয়। তবে শুধু ক্যামেরার লেন্সে নয়, কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করলেও ভালো লাগবে।
এক দিনের বদলে থাকুন এক রাত
কলকাতা থেকে ঝিলিমিলির দূরত্ব আনুমানিক ২২০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। সড়কপথে যেতে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। ফলে ভোরে বেরিয়ে দিনে ঘুরে ফিরে আসা সম্ভব হলেও তাতে ঝিলিমিলির আসল আবহের অনেকটাই মিস হয়ে যেতে পারে।
এই জায়গার সৌন্দর্য দিনের আলোতেই শেষ হয় না। জঙ্গলের কাছাকাছি নিরিবিলি পরিবেশে সন্ধ্যা নামার পর প্রকৃতির অন্য রূপ দেখা যায়। তাই হাতে সময় থাকলে অন্তত এক রাত থাকার পরিকল্পনা করাই ভালো।
কোথায় থাকবেন?
ঝিলিমিলিতে থাকার সুযোগ সীমিত হলেও কয়েকটি গেস্টহাউস ও রিসর্ট রয়েছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইলে গাছবাংলোয় থাকার অভিজ্ঞতাও নেওয়া যায়।
‘রিমিল’-এর গাছবাংলো পর্যটকদের মধ্যে পরিচিত থাকার জায়গাগুলোর একটি। তবে থাকার জায়গা সীমিত হওয়ায় যাওয়ার আগে বুকিং করে নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে বর্ষার ছুটির সময়ে আগে থেকে পরিকল্পনা না করলে পছন্দের জায়গায় থাকার সুযোগ নাও মিলতে পারে।
কীভাবে যাবেন?
ঝিলিমিলি যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে সড়ক ও রেল দুই পথই বেছে নেওয়া যায়। ট্রেনে গেলে হাওড়া বা সাঁতরাগাছি থেকে বাঁকুড়া পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি বা বাসে ঝিলিমিলির দিকে যেতে পারেন। বাঁকুড়া শহর থেকে গন্তব্যের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার।
সড়কপথে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়েও কলকাতা থেকে সরাসরি যাওয়া যায়। রাস্তার অবস্থা ও যানজটের ওপর নির্ভর করে সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
আরেকটি পথ হলো কলকাতা থেকে ট্রেনে ঝাড়গ্রাম গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে ঝিলিমিলি পৌঁছনো। ঝাড়গ্রাম থেকে ঝিলিমিলির দূরত্ব আনুমানিক ৬৫ কিলোমিটার।
বর্ষায় কেন ঝিলিমিলি?
পাহাড়ের খুব উঁচু চূড়া নেই, সমুদ্রও নেই। বড় শহরের মতো বিনোদনের আয়োজনও নেই। ঝিলিমিলির সৌন্দর্য অন্য জায়গায় তার নিস্তব্ধতায়, জঙ্গলের সবুজে, লাল মাটির পথে এবং বৃষ্টির পরে প্রকৃতির বদলে যাওয়া রূপে।
তাই এবার ছুটির তালিকায় যদি এমন কোনও জায়গা রাখতে চান, যেখানে ‘কিছু না করেও’ ভালো সময় কাটানো যায়, সেখানে ঝিলিমিলির নাম থাকতেই পারে। দু’দিনের জন্য শহরের শব্দ পিছনে ফেলে জঙ্গলের পথে বেরিয়ে পড়ুন। বর্ষার ঝিলিমিলি হয়তো আপনাকে ফিরিয়ে দেবে সেই হারিয়ে যাওয়া শান্তির অনুভূতিটাই।









