হ্রদের মাঝখানে হঠাৎ দেখা মিললো গাছপালায় ঢাকা এক টুকরো জমির। পানির ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে সেটি। দেখে মনে হচ্ছে, যেন আস্ত একটি ছোট দ্বীপ ভেসে বেড়াচ্ছে! বিষয়টি নিয়ে ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় কৌতূহল। কিন্তু রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন কিছুদিন পর স্যাটেলাইট ছবিতে সেই দ্বীপটির আর কোনও অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য আবারও সন্ধান মিলেছে সেই ‘হারিয়ে যাওয়া’ দ্বীপের।
ঘটনাটি কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের উইলিস্টন রিজার্ভয়ারের। প্রদেশটির সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হ্রদটির মাঝখানে আগস্টের শুরুতে নৌকায় থাকা কয়েকজন প্রথম ভাসমান দ্বীপটি দেখতে পান। গাছপালায় ঢাকা সেই অদ্ভুত দৃশ্য তারা ক্যামেরাবন্দী করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে বিসি হাইড্রোর কর্মকর্তাদের।
বিসি হাইড্রোর মুখপাত্র বব গ্যামারও প্রথমে ভিডিওটি দেখে বিশ্বাস করতে পারেননি। তার মনে হয়েছিল, এটি হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি কোনো ভিডিও।
বিবিসিকে গ্যামার বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, এটা তো যেকোনো জায়গার হতে পারে। হয়তো এটা সত্যিই নয়।”
তবে তার দলের হাতে থাকা ২১ জুলাইয়ের একটি স্যাটেলাইট ছবি দ্রুতই সেই সন্দেহ দূর করে দেয়। ছবিতে দেখা যায়, সত্যিই হ্রদের মাঝখানে ভাসছে একটি গাছপালায় ঢাকা ভূখণ্ড।
হঠাৎ কোথায় গেলো দ্বীপটি?
দ্বীপটির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় নতুন রহস্য। ৫ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, প্রথম যেখানে দ্বীপটি ছিল, সেখানে সেটি আর নেই! তাহলে গেলো কোথায়?
কেউ ভাবলেন, হয়তো দ্বীপটি পানিতে ডুবে গেছে। আবার কারও ধারণা, স্রোতের টানে হ্রদের অন্য কোনও প্রান্তে চলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়।
শেষ পর্যন্ত রহস্যের জট খুলেছে। গ্যামারের মতে, দ্বীপটি ডুবে যায়নি। বরং ধীরে ধীরে ভেসে তীরের দিকে চলে গিয়েছে। প্রথম যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সেটি তীরের কাছে আটকে পড়েছে।
নতুন স্যাটেলাইট ছবি এবং আকাশপথে উড়ে যাওয়া কয়েকজন পাইলটের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আসলে কত বড় এই ভাসমান দ্বীপ?
বিসি হাইড্রোর হিসাব অনুযায়ী, দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৯,৮০০ বর্গমিটার বা এক হেক্টর। অর্থাৎ এটি মোটামুটি একটি কানাডিয়ান ফুটবল মাঠের সমান। আমেরিকান ফুটবল মাঠের হিসাবে আকারটি প্রায় দেড়টি মাঠের সমান।
তবে আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, দ্বীপটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন কর্মকর্তারা।
গ্যামারের ধারণা, বহু বছর ধরে হ্রদে ভাসতে থাকা কাঠ এক জায়গায় জমে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। পরে তার ওপর গাছপালা জন্মায় এবং শিকড় ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে থাকতে পারে আস্ত একটি ভাসমান দ্বীপ।
চলতি গ্রীষ্মে জলাধারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় দ্বীপটি সম্ভবত তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই সময় পানির স্তর ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
এমন দ্বীপ আর কোথাও আছে?
ভাসমান দ্বীপ অবশ্য একেবারে বিরল কোনো ঘটনা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের লেক চিপেওয়াতেও রয়েছে এমন একটি ভাসমান জলাভূমি, যার নাম ‘ফর্টি একর বগ’।
ধারণা করা হয়, হ্রদের তলদেশ থেকে পিটে ভরা জলাভূমির একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পানির ওপরে ভেসে ওঠে। কোনও কোনও বছর স্থানীয় নৌযানচালকেরা সেটিকে ঠেলে সরিয়ে দেন, যাতে সেটি ভেসে গিয়ে কাছের একটি সেতুর দিকে না চলে যায়।
এই ভাসমান জলাভূমিতে রয়েছে নানা ধরনের প্রাণীর আবাস। ব্যাঙ ও স্যালামান্ডারের মতো প্রাণীও সেখানে দেখা যায়। এমনকি হ্রদ ও তার তীরের মতো এই ভাসমান জলাভূমিটিও অঙ্গরাজ্যের আইনে সুরক্ষিত।
স্থানীয় বাসিন্দা শেরিল ট্রেল্যান্ড ২০২৪ সালে উইসকনসিন পাবলিক রেডিওকে বলেছিলেন, ভাসমান জলাভূমিটি অনেকটা ‘হিমশৈলের মতো’। তার কথায়, “এটা পানির ওপর ভাসতে থাকা কোনও পাতার মতো নয়।”
দ্বীপে পা রাখা নিষেধ
রহস্যময় এই দ্বীপটি দেখতে আগ্রহী মানুষের জন্য অবশ্য সতর্কবার্তাও রয়েছে। বব গ্যামারের মতে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার এই ভাসমান দ্বীপ কোনও স্থিতিশীল কাঠামো নয়। তাই সেখানে পা রাখার চেষ্টা করা উচিত নয়।
গ্যামার বলেন, “এটি প্রত্যন্ত এলাকায় রয়েছে এবং বেশির ভাগ মানুষই কখনও এর কাছাকাছি যেতে পারবেন না।”
আর যারা কোনোভাবে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন, তাদের জন্য তার সোজাসাপ্টা পরামর্শ, “দ্বীপটি থেকে দূরে থাকুন। এটি ভেঙে আলাদা হয়ে যেতে পারে।”
একসময় হ্রদের মাঝখানে দেখা গেল, তারপর স্যাটেলাইটের চোখে উধাও, শেষে আবার তীরের কাছে ফিরে এলো কানাডার এই ভাসমান দ্বীপের গল্প তাই প্রকৃতির এক অদ্ভুত কাণ্ডের চেয়ে কোনও অংশে কম রহস্যময় নয়।
সূত্র: বিবিসি









