কুষ্টিয়া মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। তবে শহরের ভেতরেও ছড়িয়ে আছে কবিগুরুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বেশ কিছু স্মৃতিচিহ্ন। তার মধ্যে অন্যতম কুষ্টিয়ার মিলপাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক টেগর লজ। একসময় ব্যবসায়িক কাজের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত এই ভবন আজ ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে কুষ্টিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। ১৮৯৫ সালে কবি তাঁর দুই ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের সহায়তায় ‘টেগর অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শিলাইদহ থেকে কুষ্টিয়া শহরে আনা হয়। আর সেই ব্যবসার কাজ পরিচালনার জন্যই গড়ে ওঠে টেগর লজ।
দোতলা এই ভবনটি শুধু ব্যবসার কার্যালয় ছিল না, কুষ্টিয়ায় যাতায়াতের সময় রবীন্দ্রনাথ এখানে বিশ্রাম নিতেন। কলকাতা থেকে ট্রেনে কুষ্টিয়ায় এসে শিলাইদহ যাওয়ার পথে কখনও কখনও তিনি এই লজে রাতও কাটিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে ভবনটির সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি ঘনিষ্ঠ স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
টেগর লজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের ব্যবসায়িক জীবনের একটি ভিন্ন অধ্যায়ও। সাহিত্য ও জমিদারির পাশাপাশি তিনি পাট ও অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। কুষ্টিয়ার মিলপাড়া তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল। ফলে এই লজ থেকেই ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন কবি।
সময়ের প্রবাহে অবশ্য টেগর লজের অবস্থা ভালো ছিল না। একপর্যায়ে ভবনটি অন্যের মালিকানায় চলে যায় এবং দীর্ঘদিন অনেকটা অযত্নে পড়ে থাকে। পরে কুষ্টিয়া পৌরসভা ভবনটি পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ২০০০-এর দশকে সংস্কারের পর এখানে জাদুঘর ও লাইব্রেরি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ভবনটি কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান।
টেগর লজের বিশেষত্ব হলো, এখানে দাঁড়ালে অনুভব করা যায় রবীন্দ্রনাথের জীবনের একটি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত অধ্যায়। শিলাইদহে কবির সাহিত্যসৃষ্টির গল্প যতটা পরিচিত, কুষ্টিয়া শহরের এই লজ ততটাই মনে করিয়ে দেয় তাঁর ব্যবসায়িক জীবন ও কর্মব্যস্ততার কথা।
সাহিত্যপ্রেমী পর্যটকদের জন্য কুষ্টিয়া ভ্রমণ তাই শুধু শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে গিয়ে শেষ করার নয়। শহরের ঐতিহাসিক টেগর লজেও ঘুরে দেখা যেতে পারে। পুরোনো ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করা যায়, এক শতাব্দীরও বেশি আগে এই জায়গাতেই হয়তো ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ, জমিদারির নানা কাজ কিংবা সাহিত্য নিয়ে ভাবনায় ব্যস্ত ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কারণেই কুষ্টিয়ার টেগর লজ কবিগুরুর জীবন, কর্ম ও কুষ্টিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির পথে কুষ্টিয়া ভ্রমণ করলে টেগর লজ হতে পারে আপনার ভ্রমণতালিকার একটি বিশেষ গন্তব্য।









