বিমানবন্দরে প্রতিদিনই কত শত বিমান ওঠানামা করে, কত মানুষ ছুটে যান গন্তব্যের দিকে। পাইলটদের কাছেও এটি নিত্যদিনের কর্মব্যস্ততার অংশ। তবে সেই ব্যস্ততার মাঝেই যদি হঠাৎ হেডসেটে ভেসে আসে নিজের সন্তানের কণ্ঠ, মুহূর্তটি যে অন্য রকম হয়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক।
ঠিক এমনই এক মধুর ও মজার মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীরা ও বিমানকর্মীরা। একই বিমানবন্দরে একই সময়ে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বাবা ও মেয়ে দুজনই বাণিজ্যিক বিমানের পাইলট। কাকতালীয়ভাবে তাদের বিমান একই রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে আসার পর রেডিওতেই হলো বাবা-মেয়ের ‘সাক্ষাৎ’।
ঘটনাটি ঘটে ১ সেপ্টেম্বর। বাবা কেন্ট কাটনিক তখন ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ১০৮ নম্বর ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অন্যদিকে কাছেই উড্ডয়নের অপেক্ষায় ছিলেন তার মেয়ে কেনি কাটনিক। তিনি ইউনাইটেড এক্সপ্রেসের হয়ে কমিউটএয়ারের ৪৯৭৭ নম্বর ফ্লাইট পরিচালনা করছিলেন।
কেন্ট তখন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছিলেন। হঠাৎই হেডসেটে ভেসে আসে পরিচিত একটি কণ্ঠ।
মেয়ে কেনি স্নেহভরা স্বরে ডাক দেন, ‘বাবা?’
কেন্ট প্রথমে কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চান, ‘কে বলছেন?’
কেনি তখন নিশ্চিত হতে চান, ‘আপনি কি ইউনাইটেড ১০৮?’
কেন্টের উত্তর, ‘হ্যাঁ! তুমি কোথায়?’
কেনি জানান, তিনি রানওয়ে ১-আর-এর সামনে অপেক্ষা করছেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই উড্ডয়ন করবেন। অর্থাৎ বাবা ও মেয়ের বিমান তখন একই বিমানবন্দরে, খুব কাছাকাছি অবস্থানে।
বাবা-মেয়ের এই আকস্মিক যোগাযোগে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে থাকা অন্য পাইলটও মজা করার সুযোগ ছাড়েননি। তিনি কেন্টকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ও কি আপনার মেয়ে? তাহলে তো আপনার গর্বিত বাবা হওয়ার কথা!’
কেন্টের উত্তরও ছিল বেশ মজার, ‘একটু-আধটু!’
এরপর কথোপকথন পেশাগত বিষয় থেকে সোজা চলে যায় একেবারে ঘরের গল্পে। অন্য পাইলট জানতে চান, কেনি কি এখনও বাবার সঙ্গে থাকেন? কেন্ট জানান, মেয়ে অনেক আগেই নিজের বাসায় চলে গেছেন। তবে একটি জায়গায় এখনও বাবার ওপর নির্ভরশীল, তার মোবাইল ফোনের পারিবারিক সংযোগের তালিকায়!
এবার আরেক পাইলটও নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। মজা করে বলেন, বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত মেয়েকে সেই পারিবারিক সংযোগ থেকে বাদ না দেওয়াই ভালো। কারণ তিনিও বিয়ের আগ পর্যন্ত মায়ের পারিবারিক সংযোগ ব্যবহার করেছেন।
বাবার এমন মন্তব্যের পর কেনিও রেডিওতে মজা করে বলে বসেন, ‘আমি কিন্তু অবিবাহিত!’
ব্যস, এতেই যেন পুরো কথোপকথন আরও জমে ওঠে। বাবা-মেয়ের পেশা পাইলট, অর্থাৎ আকাশে উড়াই তাদের কাজ। কিন্তু সেই আকাশপথের রেডিওতেই যে এমন একেবারে ঘরোয়া খুনসুটি শোনা যাবে, তা বোধহয় অন্য পাইলটরাও ভাবেননি।
বাবা-মেয়ের এই মজার কথোপকথনের ভিডিও পরে ইউনাইটেড এয়ারলাইনস তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে। ভিডিওটি প্রকাশের পর দ্রুতই মানুষের নজর কাড়ে। এর সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে এয়ারলাইনসটি মজা করে লেখে, ‘এই মুহূর্তে এই পরিবারের গ্রুপ চ্যাটে থাকতে পারলে কতই না ভালো হতো!’
ভিডিওটি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরাও নানা মজার মন্তব্য করেন। একজন লিখেছেন, ক্যারিয়ারে যতই বড় হওয়া যাক না কেন, পরিবারের মোবাইল ফোনের পারিবারিক সংযোগ নিয়ে বাবা-মায়ের বক্তৃতা থেকে কেউই রেহাই পায় না।
আরেকজন অবশ্য মজার বিষয়টির আড়ালে থাকা আবেগের দিকটিই তুলে ধরেছেন। তার মতে, সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো— বাবা ও মেয়ে দুজনই পাইলট এবং একই বিমান সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। রানওয়েতে তারা যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই একে অপরকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। পেশাগত জীবনের এমন মুহূর্ত নিঃসন্দেহে বিশেষ।
আর কেনির ‘আমি কিন্তু অবিবাহিত!’ মন্তব্যটি নিয়েও মজা করেছেন অনেকে। একজনের ভাষায়, মেয়েটি যেন রেডিওতেই সবাইকে জানিয়ে দিলেন, ‘সবাই জেনে রাখুন, আমি কিন্তু অবিবাহিত!’
ওয়াশিংটন ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের একটি বড় উড়ানকেন্দ্র। প্রতিদিনের অসংখ্য ব্যস্ততার মাঝেও তাই বাবা-মেয়ের এই ছোট্ট রেডিও আলাপ তৈরি করেছে এক অন্য রকম মুহূর্ত।
একজন পাইলটের কাছে রেডিও হয়তো প্রতিদিনের কাজেরই অংশ। কিন্তু সেই রেডিওতে যখন হঠাৎ সন্তানের কণ্ঠ ভেসে আসে, তখন সেটি আর শুধু পেশাগত যোগাযোগ থাকে না, হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক পারিবারিক মুহূর্ত। আর কেনি যখন শেষে জানিয়ে দেন, ‘আমি কিন্তু অবিবাহিত!’, তখন সেই আকাশপথের সাক্ষাৎ যে শুধু মধুর নয়, বেশ মজারও তা নিয়ে বোধহয় কারও সন্দেহ নেই।









