মুম্বাই মানেই ব্যস্ত রাস্তা, আকাশছোঁয়া ভবন আর আধুনিক শহুরে জীবন। কিন্তু এই কোলাহল থেকে মাত্র এক নৌযাত্রা দূরেই রয়েছে এমন জায়গা, যেখানে সময় যেন থমকে গেছে। সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছানো যায় সবুজে ঢাকা এক দ্বীপে, যার পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা রয়েছে শত শত বছরের পুরোনো গুহা, মন্দির ও বিশাল সব ভাস্কর্য।
ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রাচীন শিল্পের অনন্য এই নিদর্শনের নাম এলিফ্যান্টা গুহা। আর জায়গাটির প্রাচীন নাম ঘারাপুরি। পাথর কেটে তৈরি অসাধারণ গুহাগুলোর জন্যই ঘারাপুরি পরিচিত ‘গুহার শহর’ নামে।
‘গুহার শহর’ ঘারাপুরি
মুম্বাইয়ের উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঘারাপুরি দ্বীপ বর্তমানে এলিফ্যান্টা দ্বীপ নামেই বেশি পরিচিত। দ্বীপের পাহাড় কেটে তৈরি গুহাগুলোর বেশ কয়েকটি হিন্দু দেবতা শিবকে উৎসর্গ করা।
গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া থেকে ফেরিতে করে প্রায় এক ঘণ্টায় এই দ্বীপে পৌঁছানো যায়। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সমুদ্র পেরিয়ে দ্বীপে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। সবুজ পাহাড় আর প্রাচীন পাথরের স্থাপত্য মিলিয়ে জায়গাটি হয়ে ওঠে একেবারেই অন্যরকম।
পাহাড় কেটে তৈরি প্রাচীন গুহা
এলিফ্যান্টা গুহাগুলো দ্বীপের পাথুরে পাহাড়ের ঢালে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে এসব গুহার নির্মাণকাজ হয়।
তবে ঘারাপুরি দ্বীপের ইতিহাস আরও পুরোনো। এখানে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকেও মানুষের বসবাসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ফলে এলিফ্যান্টা গুহা শুধু প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, মুম্বাই অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গুহা নম্বর ১-এ চোখে পড়বে বিশাল ভাস্কর্য
এলিফ্যান্টা গুহাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় হলো গুহা নম্বর ১। পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি এই বিশাল মন্দিরে রয়েছে সারি সারি স্তম্ভ এবং দেয়ালজুড়ে খোদাই করা অসংখ্য ভাস্কর্য।
শিবের বিভিন্ন রূপের এসব ভাস্কর্যের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ত্রিমূর্তি বা সদাশিব। প্রায় ৭ মিটার উঁচু এই বিশাল ভাস্কর্যে শিবের তিনটি রূপ তুলে ধরা হয়েছে। গুহায় প্রবেশের পর দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে এই অনন্য শিল্পকর্ম।
এ ছাড়া নটরাজ ও অর্ধনারীশ্বরসহ শিবের বিভিন্ন রূপের ভাস্কর্যও দেখা যায়। বিশেষত্ব হলো, এগুলো আলাদাভাবে তৈরি করে স্থাপন করা হয়নি; বরং পাহাড়ের শক্ত পাথর সরাসরি খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে।
‘এলিফ্যান্টা’ নামটি যেভাবে এলো
দ্বীপটির আসল নাম ছিল ঘারাপুরি। ‘এলিফ্যান্টা’ নামটি এসেছে অনেক পরে। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা দ্বীপটিতে এসে একটি বিশাল পাথরের হাতির ভাস্কর্য দেখতে পান। সেই ভাস্কর্য থেকেই দ্বীপটির নাম হয়ে যায় এলিফ্যান্টা।
পরে হাতির ভাস্কর্যটি দ্বীপ থেকে সরিয়ে মুম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাস্কর্যটি আর দ্বীপে না থাকলেও ‘এলিফ্যান্টা’ নামটি থেকে যায়। বর্তমানে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে জায়গাটি এলিফ্যান্টা দ্বীপ নামেই বেশি পরিচিত।
ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়
এলিফ্যান্টা গুহাগুলো ১৯৮৭ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। পাহাড় কেটে তৈরি স্থাপত্য, প্রাচীন ভাস্কর্য এবং শিবের বিভিন্ন রূপের অসাধারণ শিল্পকর্মের জন্য এই গুহাগুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দ্বীপে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাও ভ্রমণকারীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ। গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া থেকে ফেরিতে সমুদ্র পেরিয়ে প্রথমে পৌঁছাতে হয় দ্বীপের জেটিতে। সেখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই সামনে খুলে যায় প্রাচীন গুহাগুলোর জগৎ।
মুম্বাইয়ের যানজট, কোলাহল আর আধুনিক শহুরে দৃশ্য থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বেই এমন এক ঐতিহাসিক পরিবেশের দেখা মেলে। তাই ভারতের ‘গুহার শহর’ খুঁজতে হলে যেতে হবে ঘারাপুরি বা এলিফ্যান্টা দ্বীপে মুম্বাইয়ের কাছেই ইতিহাস, শিল্প আর প্রকৃতির এক অনন্য মিলনস্থলে।
বাংলাদেশ থেকে জর্জিয়া ভ্রমণ: কম খরচে ৭ দিনের ট্যুর পরিকল্পনা