উত্তরাখণ্ডের রহস্যময় ‘কঙ্কালের হ্রদ’ রূপকুণ্ডে যেভাবে পৌঁছাবেন

ফিচার ডেস্ক
১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৬ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৬

ট্রেকিংয়ের নেশা রয়েছে? পাহাড়ের অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি যদি রহস্যময় কোনও স্থান ঘুরে দেখার ইচ্ছে থাকে, তা হলে ভ্রমণের তালিকায় রাখতে পারেন ভারতের উত্তরাখণ্ডের রূপকুণ্ড হ্রদ। হিমালয়ের দুর্গম উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদ পরিচিত ‘কঙ্কালের হ্রদ’ নামে। কারণ, হ্রদ ও তার আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ মানুষের কঙ্কাল। বরফ গলে গেলে হ্রদের জলে সেই কঙ্কালগুলি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর ইতিহাসের অমীমাংসিত রহস্য এই দুইয়ের টানেই জায়গাটি অভিযাত্রীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

উত্তরাখণ্ডের রূপকুণ্ড হ্রদ্রে পাওয়া কঙ্কাল (ছবি: এনডিটিভি)

কঙ্কালের হ্রদ ঘিরে রহস্যের গল্প

রূপকুণ্ডের কঙ্কালগুলি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৪২ সালে। এক ব্রিটিশ বনরক্ষী টহল দেওয়ার সময় হ্রদে সেগুলির সন্ধান পান। তার পর থেকেই এই কঙ্কালগুলির পরিচয় এবং মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা তত্ত্ব ও লোককাহিনি ছড়িয়ে পড়ে।

একটি পুরনো ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৮৭০ বছর আগে কোনও এক ভারতীয় রাজা, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সঙ্গী-অনুচরদের দেহাবশেষ এগুলি। অন্য একটি তত্ত্বে বলা হয়, ১৮৪১ সালে তিব্বত আক্রমণের চেষ্টা করা ভারতীয় সেনাদের কয়েকজনের কঙ্কাল এখানে রয়েছে। আবার কারও ধারণা, কোনও মহামারিতে মৃত ব্যক্তিদের এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

যাত্রাপথে পাবেন এমন শ্যাওলায় ঢাকা ওক গাছের বন, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি পথ এবং বিস্তীর্ণ তৃণভূমি (ছবি: পেক্সেলস)

তবে ২০১৯ সালে প্রকাশিত পাঁচ বছরব্যাপী এক গবেষণা এই রহস্যের নতুন দিক সামনে আনে। গবেষকেরা জানতে পারেন, কঙ্কালগুলি জিনগতভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের। তাঁদের মৃত্যুর সময়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত। কিছু দেহাবশেষের বয়স আনুমানিক ১২০০ বছর। অর্থাৎ, সব মানুষের মৃত্যু একই সময়ে বা একই বিপর্যয়ের ঘটনায় হয়নি। তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অবশ্য এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি।

কোথায় রয়েছে রূপকুণ্ড হ্রদ?

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে, ত্রিশূল পর্বতের খাড়া ঢালের নিচে অবস্থিত রূপকুণ্ড হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৫ হাজার ২৯ মিটার বা ১৬ হাজার ৫০০ ফুট। দুর্গম পাহাড়ি অবস্থানের কারণে এখানে পৌঁছানো সহজ নয়। তাই এই যাত্রা সাধারণ বেড়ানোর চেয়ে অনেক বেশি অভিযাত্রানির্ভর।

ট্রেকিংয়ের পথে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

রূপকুণ্ডের পথে যাত্রা শুরু করলে চোখে পড়বে পাথরে ভরা হিমবাহ, বরফে ঢাকা পাহাড় এবং কুয়াশায় মোড়া বন। পথের অন্যতম আকর্ষণ আলি ও বেদনি এই দুই বিখ্যাত বুগিয়াল বা উঁচু পাহাড়ি তৃণভূমি। হিমালয়ের ৩ হাজার ৩০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় বিস্তৃত এই তৃণভূমিতে ফুটে থাকে নানা রঙের বুনো ফুল।

ট্রেকিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায় কেদারনাথ, চৌখাম্বা, নীলকণ্ঠ, ত্রিশূল ও নন্দা ঘুন্টির মতো পর্বতশৃঙ্গ। চারদিকে উঁচু পাহাড়, সবুজ তৃণভূমি এবং বরফের আস্তরণের কারণে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এই পথ এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।

রূপকুণ্ড ট্রেক কতটা কঠিন?

রূপকুণ্ড ট্রেক অভিজ্ঞ ট্রেকারদের জন্য বেশি উপযোগী। পথটি মাঝারি থেকে কঠিন পর্যায়ের এবং মোট দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারেরও বেশি। নিকটতম জনবসতি থেকে হ্রদে পৌঁছাতে প্রায় পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। পুরো অভিযান শেষ করতে সাধারণত এক সপ্তাহের মতো সময় ধরে পরিকল্পনা করা হয়।

যাত্রাপথে পেরোতে হয় শ্যাওলায় ঢাকা ওক গাছের বন, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি পথ এবং বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। ক্রমশ উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে খুলে যায় হিমালয়ের বিস্তৃত দৃশ্য। ট্রেকের সর্বোচ্চ অংশ জুনারগলি, যার উচ্চতা প্রায় ৫ হাজার মিটার। এটি একটি সরু ও বিপজ্জনক পাহাড়ি শৈলশিরা। এখান থেকে চারদিকে উঁচু হিমালয়ের দৃশ্য দেখা যায়। শৈলশিরাটি থেকে প্রায় ২০০ মিটার নিচে রয়েছে রূপকুণ্ড হ্রদ।

উচ্চতার কারণে এই ট্রেক শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই আগে থেকে হাঁটা ও পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া, অভিজ্ঞ গাইডের সাহায্য নেওয়া এবং আবহাওয়া ও পথের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ রাখা জরুরি।

কখন যাবেন রূপকুণ্ডে?

রূপকুণ্ড ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হিসেবে মে থেকে জুলাই মাসের কথা উল্লেখ করা হয়। জুলাই মাসে উপত্যকার তৃণভূমি সবুজে ভরে ওঠে। এ সময় হ্রদের বরফের কিছু অংশ গলে গেলে জলের মধ্যে থাকা কঙ্কাল ও হাড়ের অবশেষ দেখা যেতে পারে। তবে পাহাড়ি আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। তাই শুধু ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভর না করে যাত্রার আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও অভিজ্ঞ গাইডের কাছ থেকে বর্তমান পরিস্থিতি জেনে নেওয়া উচিত।

ট্রেকিংয়ে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি

রূপকুণ্ডের মতো দুর্গম পথে যাওয়ার সময় পোশাক ও সরঞ্জাম বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেকিংয়ের জন্য জিনস বা ডেনিমের বদলে আরামদায়ক ও দ্রুত শুকিয়ে যায় এমন পোশাক বেছে নেওয়া ভালো। ব্যাগে অপ্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় না নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস রাখুন। একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হয়, এমন প্লাস্টিকের বোতল এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিকের প্যাকেট এড়িয়ে চলুন। পাহাড়ে আবহাওয়া হঠাৎ বদলে যেতে পারে বলে রেইনকোট সঙ্গে রাখা জরুরি।

এ ছাড়া পর্যাপ্ত গরম পোশাক, উপযুক্ত ট্রেকিং জুতো, পানি বহনের ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম সঙ্গে রাখুন। উচ্চতায় শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা বা অসুস্থতা দেখা দিলে তা অবহেলা করবেন না। স্থানীয় নিয়ম ও অনুমতি মেনে চলুন এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন।

রূপকুণ্ড এমন একটি হ্রদ যা প্রকৃতির বিস্ময়, ইতিহাসের রহস্য এবং রোমাঞ্চকর অভিযানের এক অনন্য স্থান। বরফে ঢাকা হিমালয়, রঙিন পাহাড়ি তৃণভূমি আর কঙ্কাল ঘিরে থাকা অমীমাংসিত প্রশ্ন এই জায়গাকে আকর্ষণের আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তবে দুর্গম পথ ও উচ্চতার ঝুঁকি বিবেচনা করে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই এই অভিযানে বেরোনো উচিত।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
ভারতের যুবসমাজকে কেউ থামাতে পারবে না: চিরাগ পাসওয়ান
এবার দিল্লির বিমানবন্দরে আটক ককরোচ প্রধান অভিজিৎ দিপকে
যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আটক
সর্বশেষ খবর
যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস, রাজধানীতে বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ 
যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস, রাজধানীতে বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ 
স্কুলছাত্রীকে হত্যার পর মসজিদের পুকুরে গোসল করে অটোরিকশাচালক
স্কুলছাত্রীকে হত্যার পর মসজিদের পুকুরে গোসল করে অটোরিকশাচালক
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত
ভারতের যুবসমাজকে কেউ থামাতে পারবে না: চিরাগ পাসওয়ান
ভারতের যুবসমাজকে কেউ থামাতে পারবে না: চিরাগ পাসওয়ান
সর্বাধিক পঠিত
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
এ যেন অন্য এক মিরপুর-১০, প্রশংসায় ভাসছে সরকার
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক