ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের শিলুয়া গ্রামে রয়েছে প্রাচীন এক শিলাখণ্ড, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ‘জীবিত পাথর’ ও ‘শিল ঘর’ নামে পরিচিত। পাথরটির গায়ে প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির চিহ্ন রয়েছে। ইতিহাস ও লোককথার মিশেলে এই শিলাখণ্ড দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের বিষয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সংরক্ষণের আওতায় রয়েছে।
রত্ননগর থেকে শিলুয়া
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় শিলুয়া গ্রামের নাম ছিল রত্ননগর। কয়েক শতাব্দী আগে সেখানে একটি অস্বাভাবিক পাথর আবিষ্কৃত হয়। কথিত আছে, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার পাথরটিকে ‘জীবিত পাথর’ হিসেবে চিহ্নিত করে জাদুঘরের অধীনে নিয়ে যায়। পরে পাথরটির নামের সঙ্গে মিল রেখে গ্রামের নাম হয় শিলুয়া।
স্থানীয়ভাবে এলাকাটি মধ্যম শিলুয়া, পূর্ব শিলুয়া, পশ্চিম শিলুয়া ও বেদরাবাদ শিলুয়া- এই চার ভাগে পরিচিত। শিলাখণ্ডটি রয়েছে মধ্যম শিলুয়ায়, শিলুয়া চৌধুরী বাড়ির পূর্ব পাশে। একসময় জায়গাটি চৌধুরী পরিবারের মালিকানায় ছিল বলে স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার জায়গাটি অধিগ্রহণ করে বলে প্রচলিত রয়েছে।
শিল ঘর ঘিরে নানা কাহিনি
শিলাখণ্ডটি নিয়ে এলাকায় বহু লোককথা প্রচলিত। একসময় এর সুরক্ষার জন্য একটি ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল এবং চারপাশে দেওয়া হয়েছিল লোহার রেলিং। নিদর্শনটির দেখাশোনার জন্য একজন প্রহরীও নিয়োজিত ছিলেন।
কালের প্রবাহে সেই ছাউনি ও রেলিং আর টিকে নেই, প্রহরীর ব্যবস্থাও বিলুপ্ত হয়েছে। পরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল হায়দার চৌধুরীর উদ্যোগে ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে শিল ঘরের চারপাশে ইটের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়।
একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই শিলাখণ্ডকে ঘিরে পূজা-অর্চনা করতেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। পাথরটিকে ঘিরে প্রচলিত এসব বিশ্বাস ও কাহিনি শিলুয়া গ্রামের স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শন
শিলাখণ্ডটির গায়ে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ব্যবহৃত ব্রাহ্মী লিপির চিহ্ন থাকার দাবি রয়েছে। এ কারণে নিদর্শনটিকে ঘিরে প্রাচীন জনবসতি ও সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে লিপিটির পাঠোদ্ধার, শিলাখণ্ডের প্রকৃত বয়স এবং এর ঐতিহাসিক পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য নথি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, শিলাখণ্ডটি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ শিলুয়ায় আসেন। যথাযথ পরিচর্যা, ঐতিহাসিক তথ্যের নির্ভরযোগ্য নথিভুক্তি এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে ফেনীর এই প্রাচীন নিদর্শন সম্পর্কে আরও বেশি মানুষ জানতে পারবেন।
যেভাবে যাবেন
ফেনী শহর থেকে ছাগলনাইয়াগামী সড়ক ধরে কন্ট্রাক্টর মসজিদ বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে মধ্যম শিলুয়া চৌধুরী বাজারের কাছে শিলাখণ্ডটির অবস্থান। এটি চৌধুরী বাজারের প্রায় ৫০ গজ পশ্চিমে এবং শিলুয়া চৌধুরী বাড়ির পূর্ব পাশে রয়েছে।