ব্যস্ত শহুরে জীবন থেকে একটু বিরতি নিতে চান? তা হলে ঘুরে আসতে পারেন ইংল্যান্ডের কেন্ট অঞ্চলের ডারেন্ট উপত্যকা থেকে। লন্ডন থেকে ট্রেনে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই অঞ্চলকে প্রকৃতির এক টুকরো স্বর্গ বললেও অত্যুক্তি হবে না। নদী, সবুজ প্রান্তর, পুরনো গ্রাম, শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস, ল্যাভেন্ডারের খেত আর মনোরম পানশালা সব মিলিয়ে সপ্তাহান্তে বেড়ানোর জন্য আদর্শ জায়গা।
১৮২০-এর দশকে তরুণ চিত্রশিল্পী স্যামুয়েল পামার লন্ডন ছেড়ে কেন্টের শোরহ্যাম গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ব্রিটিশ রোমান্টিক শিল্পধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পী এখানকার চাঁদের আলোয় ভেজা শস্যখেত, ফলভরা আপেলগাছ এবং আলোকোজ্জ্বল পাহাড়ের ছবি এঁকেছিলেন। জায়গাটির নাম দিয়েছিলেন ‘ভ্যালি অব ভিশন’। প্রায় দু'শো বছর পরেও ডারেন্ট উপত্যকার প্রকৃতিতে সেই সৌন্দর্যের ছাপ স্পষ্ট।
শোরহ্যামেই শুরু হোক ঘোরাঘুরি
ডারেন্ট নদীর তীরে অবস্থিত শোরহ্যাম গ্রামকে ঘুরে দেখার মূল কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিতে পারেন। উইলো গাছের ছায়ায় নদীর জল বয়ে চলেছে, দু'পাশে রয়েছে পুরনো পানশালা, রঙিন ছোট ছোট কটেজ এবং টিউডর আমলের স্থাপত্যের ছাপ। গ্রামের সেন্ট পিটার অ্যান্ড সেন্ট পল গির্জাটিও দর্শনীয়। প্রথম শ্রেণির ঐতিহাসিক স্থাপত্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই গির্জা ঘিরে রয়েছে পুরনো সমাধিক্ষেত্র।
শোরহ্যামের কাছেই রয়েছে ওটফোর্ড ও আইনসফোর্ড। ট্রেনে কয়েক মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই দুই গ্রামে। ওটফোর্ড মূলত পুরনো জিনিসপত্রের দোকান ও প্রাচীন স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এখানে রয়েছে ষোড়শ শতকের একটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং পুকুরের পাশে ঐতিহ্যবাহী হাঁসের ঘর। পুরনো সামগ্রী সংগ্রহের শখ থাকলে ঘুরে দেখতে পারেন ওটফোর্ড অ্যান্টিকস অ্যান্ড কালেক্টরস সেন্টার।
অন্য দিকে, ইতিহাসের টানে যেতে পারেন আইনসফোর্ডে। এখানে রয়েছে লুলিংস্টোন রোমান ভিলা, যার দেওয়ালে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন চিত্রকর্ম। রয়েছে লুলিংস্টোন ক্যাসল, যা একসময় অষ্টম হেনরি ও অ্যান বোলিনের পছন্দের জায়গা ছিল। গ্রামের কাঠের কাঠামোয় তৈরি পুরনো বাড়িগুলির মাঝে নদী পারাপারের অগভীর পথটিও বেশ আকর্ষণীয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি ও ক্রিম টি
শোরহ্যামে গেলে ঘুরে দেখতে পারেন শোরহ্যাম এয়ারক্রাফট মিউজিয়াম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এই উপত্যকার আকাশে তীব্র বিমানযুদ্ধ হয়েছিল। সেই ইতিহাস ধরে রাখতেই স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এই সংগ্রহশালা। শিল্পী ও সংগ্রহশালার উদ্যোক্তা জেফ নাটকিনসের বাড়ির বাগানের দরজা দিয়ে ঢুকতে হয় এখানে। পুরনো বেকারির আদলে তৈরি চায়ের ঘরে বসে খেতে পারেন ক্রিম টি, সুস্বাদু পুডিং ও স্যান্ডউইচ। মাত্র ৫ পাউন্ডের প্রবেশমূল্যে সংগ্রহশালার নানা স্মারক ও যুদ্ধের ইতিহাস জানার সুযোগ মেলে।
নদীর ধারে হাঁটা, ল্যাভেন্ডারের সুবাস
প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চাইলে হাঁটতে পারেন ডারেন্ট ভ্যালি পাথ ধরে। প্রায় ২১ মাইল দীর্ঘ এই পথের শোরহ্যাম থেকে আইনসফোর্ড পর্যন্ত চার মাইলের অংশটি বিশেষ সুন্দর। নদীর পাশ দিয়ে, গাছপালায় ঘেরা পথ ও ঢেউখেলানো সবুজ পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যায় এই হাঁটাপথ। হাঁটার জন্য খুব বেশি অভ্যস্ত না হলেও এই পথ উপভোগ করতে পারবেন। শীতের নির্মল দিন হোক কিংবা গ্রীষ্মের রোদঝলমলে বিকেল— সব ঋতুতেই এর সৌন্দর্য আলাদা। হেঁটে আইনসফোর্ড পৌঁছে চাইলে ট্রেনে শোরহ্যামে ফিরে আসতে পারেন।
শোরহ্যাম গির্জা থেকে মিনিট কুড়ির হাঁটা পথেই রয়েছে ক্যাসল ফার্ম। ব্রিটেনের অন্যতম বড় ল্যাভেন্ডার উৎপাদক এই খামার পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। খামারের দোকানে পাওয়া যায় ল্যাভেন্ডার তেল, চা ও আইসক্রিম। রয়েছে নিজস্ব মধুও। খামারের কফি শেডে মিলবে ল্যাভেন্ডার চা ও কফি। গ্রীষ্মকালে বেগুনি ল্যাভেন্ডারের সারির মাঝে বসে পিকনিক করার সুযোগ রয়েছে। চাইলে ফসল তোলার অভিজ্ঞতা নিতে আগাম বুকিংও করতে পারেন।
খাওয়াদাওয়ার জন্য কোথায় যাবেন?
শোরহ্যামে খাওয়াদাওয়ার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি মনোরম পানশালা ও রেস্তরাঁ। দ্য ক্রাউন নামের পানশালায় পাওয়া যায় মাছ-চিপস এবং দিনের বিশেষ পাইয়ের মতো স্থানীয় খাবার। তবে রাতের খাবারের জন্য যেতে পারেন দ্য স্যামুয়েল পামার রেস্তরাঁয়। কাঠের বিম ও আগুনের উষ্ণতায় সাজানো পরিবেশে পাওয়া যায় পরিচিত ব্রিটিশ পদ এবং নানা ধরনের ছোট খাবার। এখানে মরসুমি বিশেষ মেনুর দাম জনপ্রতি ৪৮ পাউন্ড।
এ ছাড়া মাউন্ট ভিনইয়ার্ডে রয়েছে পিৎজ়ার রেস্তরাঁ এবং আঙুরখেতের পাশে ছোট ক্যাফে। ওটফোর্ডে দ্য বুল এবং আইনসফোর্ডে দ্য মাল্ট শোভেলও খাওয়াদাওয়ার জন্য জনপ্রিয় ঠিকানা।
রাত্রিবাসের ব্যবস্থা
শোরহ্যাম স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথেই রয়েছে হোয়াইট হিল উডস। এখানে পরিবারের জন্য কাঠের কেবিন এবং দম্পতি বা একা ভ্রমণকারীদের জন্য শেফার্ডস হাটের ব্যবস্থা রয়েছে। কেবিনে এক রাতের ভাড়া শুরু ১৫০ পাউন্ড থেকে। শেফার্ডস হাটের ভাড়া ১০০ পাউন্ড থেকে। তবে অন্তত দু'রাত থাকতে হবে। চাইলে উত্তপ্ত সুইমিং পুলে সময় কাটাতে পারেন, কিংবা জঙ্গলের নির্জনতায় বিশ্রাম নিতে পারেন। জায়গাটি বেশ জনপ্রিয় হওয়ায় আগে থেকে বুকিং করে রাখা ভাল।
কী ভাবে পৌঁছবেন?
লন্ডনের ব্ল্যাকফ্রায়ার্স স্টেশন থেকে ডারেন্ট উপত্যকার গ্রামগুলির উদ্দেশে প্রতি ঘণ্টায় দু'বার ট্রেন ছাড়ে। সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। ওটফোর্ড, শোরহ্যাম ও আইনসফোর্ডের মধ্যে ট্রেনে যাতায়াত করতেও বেশি সময় লাগে না। বাসেও আশপাশের গ্রামগুলি ঘুরে দেখা যায়। চাইলে গাড়ি নিয়েও যেতে পারেন। সপ্তাহান্তে গাড়ি পার্ক করার জায়গা পেতে সাধারণত সমস্যা হয় না।