ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল ঘুরতে গেলে দর্শনীয় স্থানের তালিকায় রাখতে পারেন মণিপুর রাজ্য জাদুঘর। শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের নানা নিদর্শনে সাজানো এই সংগ্রহশালায় এক ছাদের নিচে পরিচয় মিলবে প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক মণিপুরের। রাজ্যের মানুষের জীবনযাপন, পোশাক, কৃষিকাজ, শিল্পকলা ও সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে আগ্রহীদের জন্য জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণীয়।
১৯৬৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। পরে এটি বহুমুখী সংগ্রহশালা হিসেবে সম্প্রসারিত হয়। এখানে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন গ্যালারি। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি জাদুঘরের নৃতাত্ত্বিক গ্যালারিটি নতুন করে উদ্বোধন করা হয়।
জাদুঘরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলির একটি রাজকীয় নৌকা ‘হিয়াং হিরেন’। প্রায় ৭৮ ফুট লম্বা এই নৌকাটি একসময় রাজপরিবারের ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল। খোলা গ্যালারিতে প্রদর্শিত নৌকাটি দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এ ছাড়া রয়েছে মণিপুরের রাজা স্যার মেইদিংগু চুরাচাঁদ সিংয়ের ব্যবহৃত সুসজ্জিত রাজকীয় হাওদা।
সংগ্রহশালায় দেখা মিলবে মেইতৈ সম্প্রদায়ের প্রাচীন মুদ্রা, হাতে লেখা পুঁথি বা ‘পুয়া’, বাদ্যযন্ত্র, মাটির পাত্র, চিত্রকলা, অলংকার ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের। পাশাপাশি রয়েছে উপজাতীয় গয়না, কৃষিকাজের সরঞ্জাম, গৃহস্থালির সামগ্রী, শিকারের উপকরণ, অস্ত্রশস্ত্র, ঝুড়ি তৈরির সরঞ্জাম এবং পোলো খেলার নানা উপকরণ। এসব সামগ্রী মণিপুরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে।
জাদুঘরের বিশেষ আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন সময় পরিমাপক যন্ত্র ‘তানেই পুং’ ও ‘তানেই ছেই’। এগুলি প্রাচীন মণিপুরের মেইতৈ জনগোষ্ঠীর সময়জ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার পরিচয় বহন করে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকারের সংগ্রহ থেকেও রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
মণিপুরের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কেও আগ্রহ জাগায় জাদুঘরের প্রকাশনায় থাকা অর্কিডের তথ্য। সেখানে ৫০০-র বেশি বিরল অর্কিড প্রজাতির উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭২টি প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইম্ফল ভ্রমণে শুধু পাহাড়, উপত্যকা বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, মণিপুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানতে চাইলে রাজ্য জাদুঘর হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বিশেষ করে রাজ্যের ঐতিহ্য, রাজপরিবারের ইতিহাস এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে এখানে কিছুটা সময় কাটানো সার্থক হবে।