কম্বোডিয়ার পবিত্র বনে আত্মার খোঁজে রোমাঞ্চকর ভ্রমণ

ফিচার ডেস্ক
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২০:০০ আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২০:০০

ঘন জঙ্গল, আঁকাবাঁকা নদী, অজস্র বন্যপ্রাণী আর গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নানা রহস্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার কার্ডামম পর্বতমালার বনভূমিতে গেলে প্রকৃতির এমনই এক অন্য রূপের দেখা মেলে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই বনের গাছপালা, নদী ও পাহাড়ের রক্ষক হয়ে রয়েছে নানা অতিপ্রাকৃত আত্মা। সেই বিশ্বাসকে সঙ্গী করেই পর্যটকেরা পা রাখছেন জঙ্গলের গভীরে।

কম্বোডিয়ার রাজধানী নম পেন থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার বাসযাত্রায় পৌঁছনো যায় কোহ কং অঞ্চলের চি ফাট এলাকায়। সেখান থেকে নদীপথে এগিয়ে শুরু হয় কার্ডামম পর্বতমালার গভীর অরণ্যে ট্রেকিং। মোবাইলের নেটওয়ার্ক হারিয়ে গেলে শহুরে জীবনের সঙ্গে যোগাযোগও যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সামনে থাকে শুধু ঘন সবুজ বন, নদীর জল আর অরণ্যের বিচিত্র শব্দ।

বনের রক্ষক আত্মাদের ঘিরে স্থানীয় বিশ্বাস

কম্বোডিয়ার লোকবিশ্বাসে ‘নিয়াক তা’ নামে পরিচিত এক ধরনের রক্ষাকর্তা আত্মার ধারণা রয়েছে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই আত্মারা প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করেন। বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি এই প্রাচীন আধ্যাত্মিক বিশ্বাসও কম্বোডিয়ার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

কার্ডামমের জঙ্গলে ঢোকার আগে স্থানীয় গাইডরা পর্যটকদের কিছু নিয়ম মেনে চলতে বলেন। বনের মধ্যে নেতিবাচক বা অশুভ কথা না বলা, গাছপালা থেকে কিছু তুলে না নেওয়া এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা সেই নিয়মের অংশ। এমনকি প্রকৃতির প্রয়োজনে কোথাও থামার আগেও স্থানীয় রীতিতে বনদেবতার অনুমতি চাওয়ার কথা বলা হয়।

নদীপথে যেতে যেতে চোখে পড়ে পাথরের উপর তৈরি ছোট ছোট উপাসনাস্থল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এগুলো নদী ও আশপাশের এলাকার রক্ষাকর্তা আত্মাদের সঙ্গে যুক্ত। এমনই একটি পবিত্র স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘সাদা কুমির’-এর কিংবদন্তি। স্থানীয় লোককথায় এই রহস্যময় প্রাণীকে মৃত্যু কিংবা অনিবার্য পরিণতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

বন্যপ্রাণী আর অরণ্যের বিস্ময়

কার্ডামম পর্বতমালার বনভূমি মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অখণ্ড বৃষ্টিঅরণ্য অঞ্চল। হাতি, বন্য কুকুরসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বাস এই অরণ্যে। ঘন গাছপালা, নদীর ধারের ম্যানগ্রোভ, রঙিন প্রজাপতি, মাছরাঙা ও বানরের দেখা মেলে পথ চলতে চলতে। কোথাও গাছের শিকড় পেরিয়ে এগোতে হয়, কোথাও ভাঙা গুঁড়ি ডিঙিয়ে পৌঁছতে হয় সরু বনপথে।

জঙ্গলের মধ্যে দেখা মিলতে পারে বিশাল সোনালি জাল বোনা মাকড়সারও। আবার কোথাও গজিয়ে ওঠে উজ্জ্বল রঙের বিরল মাশরুম। স্থানীয় গাইডদের কাছে বনের এমন অনেক উপাদানই প্রকৃতির উপহার। তবে এই অরণ্যে ঘুরতে গেলে সতর্ক থাকা জরুরি। বিষধর সাপ, মশাবাহিত রোগ এবং আর্দ্র গরমের মতো বিপদের কথাও মাথায় রাখতে হয়।

জঙ্গলেই রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা

এই ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ জঙ্গলের গভীরে তৈরি অস্থায়ী শিবিরে রাত কাটানো। নদীর ধারের শিবিরে রয়েছে ছাউনি দেওয়া কাঠের শোয়ার মাচা, রান্নার জায়গা এবং ছোট জলাশয়। সন্ধ্যা নামলে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর চারপাশের অন্ধকার জঙ্গলকে আরও রহস্যময় করে তোলে।

স্থানীয় রাঁধুনি ও গাইডরা আগুন জ্বেলে রাতের খাবার তৈরি করেন। মুরগির মাংস, ভাত এবং বনে পাওয়া উপযুক্ত মাশরুম দিয়ে তৈরি খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে এমন পরিবেশে কোনও বন্য উদ্ভিদ বা মাশরুম নিজে থেকে সংগ্রহ করা উচিত নয়; স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানেই এ ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

রাতভর প্রবল বৃষ্টির পর সকালে ফের শুরু হয় ট্রেকিং। আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগোতে এগোতে ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গল ফাঁকা হয়, চওড়া হয়ে আসে পথ। অবশেষে চি ফাট এলাকায় ফিরে এলে আবার মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। শহুরে যোগাযোগ ফিরে এলেও জঙ্গলের নিস্তব্ধতা আর অরণ্যের অভিজ্ঞতা থেকে যায় স্মৃতিতে।

প্রকৃতি বাঁচাতে পর্যটন

কার্ডামমের বনভূমি দীর্ঘদিন ধরেই কাঠ কাটা, চোরাশিকার ও নানা সংঘাতের চাপে বিপন্ন। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবস্থা।

২০০৭ সালে ওয়াইল্ডলাইফ অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে চি ফাটে কমিউনিটি ইকোট্যুরিজম প্রকল্প শুরু হয়। এর লক্ষ্য স্থানীয় মানুষকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দেওয়া এবং বনভূমি রক্ষায় তাঁদের যুক্ত করা। একসময় যাঁরা কাঠ পাচার বা শিকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করছেন। কেউ কেউ আগে কাঠ পরিবহণের কাজ করতেন, এখন সেই বনকেই রক্ষার চেষ্টা করছেন।

এই পর্যটন ব্যবস্থায় জঙ্গল ভ্রমণ, স্থানীয় গাইড, খাবার এবং বনভূমির মধ্যে রাত কাটানোর সুযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রেকিং, গাইড, খাবার ও থাকার ব্যবস্থাসহ পাঁচ দিনের একটি প্যাকেজের খরচ জনপ্রতি প্রায় ৩৫০ মার্কিন ডলার।

কম্বোডিয়ার এই বনভ্রমণ তাই শুধু রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা নয়। স্থানীয় মানুষের প্রাচীন বিশ্বাস, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং বিকল্প জীবিকার এক অনন্য মেলবন্ধনও। এখানে প্রকৃতিকে বোঝার জন্য শুধু চোখ মেলে তাকালেই হয় না, স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হয়।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
যে মেট্রো চালান শুধু নারীরাই
বন্দে ভারতে এক বছর আগেই টিকিট বুকিং! সুবিধা পাবেন কারা?
জানেন কি, কোন শহর ‘প্রাচ্যের লন্ডন’ নামে পরিচিত?
সর্বশেষ খবর
ধূমপানমুক্ত এলাকা হচ্ছে জাতীয় সংসদ চত্বর
ধূমপানমুক্ত এলাকা হচ্ছে জাতীয় সংসদ চত্বর
ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বিশ্লেষণ করবে ক্লড, জানাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব
ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন বিশ্লেষণ করবে ক্লড, জানাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব
সোমবার শুরু হচ্ছে সংসদের চতুর্থ অধিবেশন
সোমবার শুরু হচ্ছে সংসদের চতুর্থ অধিবেশন
যে মুসলিম কবি ‘মা কালী’র জন্য গেয়েছিলেন, লিখেছিলেন শ্যামাসংগীত
যে মুসলিম কবি ‘মা কালী’র জন্য গেয়েছিলেন, লিখেছিলেন শ্যামাসংগীত
সর্বাধিক পঠিত
১০ লাখ টাকা থাকলে কোথায় বিনিয়োগ করবেন
১০ লাখ টাকা থাকলে কোথায় বিনিয়োগ করবেন
রেডি হও জামায়াত, তোমাদের উপযুক্ত জায়গা পাকিস্তান পাঠানো হবে: পাপিয়া 
রেডি হও জামায়াত, তোমাদের উপযুক্ত জায়গা পাকিস্তান পাঠানো হবে: পাপিয়া 
আজই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হতে পারে 
আজই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল নিশ্চিত হতে পারে 
ব্যানারে জিয়ার ছবি নেই, ডিসিকে সরাতে ছাত্রদলের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
ব্যানারে জিয়ার ছবি নেই, ডিসিকে সরাতে ছাত্রদলের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে