ট্রাভেলগবর্ষাশেষের কুকরি মুকরি

Send
জাকারিয়া মণ্ডল
প্রকাশিত : ১১:০০, অক্টোবর ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪১, অক্টোবর ২৮, ২০২০

মেঘনার মোহনায় সূর্যাস্ত (ছবি: মেহেদী হাসান)কচ্ছপিয়া ঘাটে জেলে নৌকার ভিড়। ঝুড়ি ঝুড়ি মাছ নামছে। জেলে আর মাছ ব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে চাপা পড়ে যাচ্ছে যাত্রীদের আওয়াজ। পর্যটন মৌসুম নয় বলে যাত্রীবাহী ট্রলার একটাও নেই ঘাটে। স্পিডবোটও চোখে পড়ছে না। মওকা বুঝে লাগামহীন দর হাঁকছে দালালরা। অন্য ঘাট থেকে বোট আনার মুলো ঝোলাচ্ছে উদ্বিগ্ন যাত্রীদের সামনে।

অগত্যা বাড়তি দরেই একটা স্পিডবোট আনানো গেলো। মাথার ওপর ভরদুপুরের প্রখর রোদ। ভরা জোয়ারে টালমাটাল ঢেউয়ে নাচতে নাচতে এগোতে শুরু করলো বোট।

পেছনে ঢেউ ভাঙছে দু’পাড়ে। ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে জলের গান। খানিক পরই গতি কমাতে হলো পেতে রাখা জাল বাঁচাতে। একটু পরপরই এমন জাল পেতে রাখা।

মেঘনার বুকে জাল পেতেছে জেলেরা (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)দু’পাড়ের সবুজ চরগুলোর ওপর থইথই পানি। সূর্যটা আজ ঢেউয়ের দোলায় ভাঁজ খেতে খেতে দুলছে না। পাড় ধরে চরছে না মহিষের পাল। লক্ষ্মী-পক্ষীর চরে বকের ঝাঁকও দেখা যাচ্ছে না। মাছ শিকারের অপেক্ষায় নেই অন্য কোনও অতিথি পাখি।

মেঘনার শাখা খাল আজ আরও বেশি উত্তাল। পূর্বদিক থেকে মেঘনার সঙ্গ ছেড়ে আসা ধারার সঙ্গে এখানে মিলিত হয়েছে পশ্চিম থেকে তেঁতুলিয়া থেকে আসা ধারা। এই মিলিত ধারা আর মেঘনার বেড়ে শুয়ে থাকা বঙ্গোপসাগরমুখী দ্বীপটাই ‘চর কুকরি মুকরি’। একসময় প্রচুর কুকুর ও মেকুর বা ইঁদুর ছিল বলেই নাকি এমন নাম দিয়েছিল সাহেবরা।

কুকরি-মুকরির চরে জীবনের তরী (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)প্রশস্ত খাল ছেড়ে গাছপালায় ছাওয়া সরু খালে ঢুকে পড়লো স্পিডবোট। জলধারা এদিকে অতিশয় সরু। খালের ওপর ঝুঁকে এসেছে কেওড়া গাছের সারি। কোথাও কোনও নোঙর করা নৌকা থাকলেই গতি কমিয়ে সাবধানে পার হতে হচ্ছে স্পিডবোটকে। ক্রমশ খালটা আরও সরু হয়ে এলো। যেকোনও মুহূর্তে পাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার শঙ্কা! থইথই পানির ভেতরও বনবিভাগের ঘাটে ভিড়লো বোট।

ভরদুপুরে কুকরি মুকরি বাজারে কাক-পক্ষীও লাপাত্তা। এ জনপদের অধিকাংশ পুরুষ এখন মাছ ধরার জন্য মোহনায় ভাসছে। বাইরের যে শ’খানেক মানুষ জীবিকার তাগিদে এখানে থাকে, তাদের এখন ভারী বিড়ম্বনা। বাজারে সবজি নেই। জেলেদের ধরা মাছ আড়তদারের কব্জায় চলে যায় বলে বাজারে মাছও ওঠে না। তবে স্থানীয়রা নিজেদের ধরা মাছে দিব্যি চালিয়ে নেয় দিন। যদিও সবজির মূল চালান এখনও শহর থেকেই আনতে হয়। মরিচের চাষ কেউ করেই না হরিণের পাল এসে খেয়ে যায় বলে। এমন দিনে এসে ত্রাণের মোটা চালের ভাত নেহায়েত মন্দ লাগলো না।

চরের বুকে বকের মেলা (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)ফের যখন বোটটা ভাসলো তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মেঘনার মূল প্রবাহে উঠে ছুটল মোহনা পানে। নারিকেল বাগান সৈকতে যখন পৌঁছালো, তখন রোদের তেজ একেবারেই পড়ে এসেছে। গুটিকয় জেলেনৌকা এরই মধ্যে ফিরে এসে নোঙর ফেললেও পর্যটক একজনও নেই। ঘাসে ছাওয়া সবুজ নারিকেল বাগান সৈকতের অধিকাংশটাই পানির নিচে। অগভীর জলে জাল পেতেছে উদোম গায়ের দুই শিশু।

আধাভেজা বনের ফাঁকে ফাঁকে একটি-দুটি মহিষ চরছে। বস্তুত এটা কেওড়া, গেওয়া, পশুর, বেত আর সুন্দরীর শ্বাসমূলীয় ম্যানগ্রোভ। ভেজা মাটিতে ঊর্ধ্বমুখী শ্বাসমূল সুন্দরবনের আবহ তৈরি করে রেখেছে। মাঝে মধ্যে প্রাণী চলাচলের বুনো ট্রেইল।

এ সময় বিষাক্ত বিছার খুবই প্রাদুর্ভাব বনটায়। প্রজনন মৌসুম ওদের। তাই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে পালে পালে। পাতার সঙ্গে কোনও বিছা চিবিয়ে খেয়ে মহিষের মুত্যুও ঘটে এ সময়টায়। আর কারও শরীরে যদি একবার ছুঁয়ে যায়, তাহলে নিশ্চিত ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন। তাই এ সময় একান্ত বাধ্য না হলে স্থানীয়রাও বনের ভেতর খুব একটা আসে না।

কুকরি মুকরির ফড়িং (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)একযুগ আগে সিডরে উপড়ে যাওয়া গাছগুলো এখনও শিকড় মেলে পড়ে আছে বনের কিনারে। পড়ে যাওয়া গাছেও প্রাণের কোরাস। ডালের ভাঁজে আয়েসে বসার অদ্ভুত আসন। মাথার ওপরে ডালপাতার ছাউনি। কিন্তু ওগুলোতে বসে দোল খাওয়ার মতো পর্যটক আর আসবে না শীত শুরুর আগে। যদিও শরৎ শেষে হেমন্তের গান গাইছে প্রকৃতি। কিন্তু এখনও কী দাপট বর্ষার! বাংলাদেশে এমন দীর্ঘমেয়াদি বর্ষাকাল কে কবে দেখেছে কে জানে! বাড়বাড়ন্ত ঢেউ এসে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে বনের পা। বাতাসের সঙ্গে কোরাস তুলছে ছলাৎছল, ছলাৎছল।

বন দেখতে দেখতে কমে এলো শেষ বিকালের আলো। পশ্চিম পাড়ে বনের ওপরে ঝুলে থাকা সূর্যটায় দিন শেষের বার্তা। একটু পরই বনের ওপাশে আড়াল নিল সূর্যটা। আর কালচে রূপ নিলো সবুজ বনানী। মেঘনার টলোমলো বুকে মায়াবী সূর্যের মোহনীয় প্রতিফলন তবু কমলো না। বরং বিচিত্র বর্ণ নিতে থাকলো ক্ষণে ক্ষণে। ছড়াতে থাকলো অপার্থিব মায়া আর মোহের আবেশ। সারাদিনের কর্মযজ্ঞ শেষে বাড়ির পথে ভাসা জেলে নৌকাগুলোও যেন রূপকথার পটে আঁকা অপরূপ তরী হয়ে উঠেছে আকাশ ও সাগরের ক্যানভাসে।

সাগর থেকে ফিরছে জেলে নৌকা। পেছনে মেঘনা (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)এত সুন্দর মোহনাটা কিন্তু হঠাৎ হঠাৎই উত্তাল হয়ে উঠে। মেঘনার এই মোহনাতেই ঢাল চর, হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপের মতো অনেক চর, দ্বীপ। ওসব চরের জীবন সবসময়ই সংগ্রামমুখর। প্রমত্তা পানির সঙ্গে লড়াই করে মানুষ কখনও জেতে, কখনওবা আত্মসমর্পণ করে অসহায়ের মতো। হুমায়ুন কবিরের ‘মেঘনার ঢল’ কবিতায় মেঘনার কাছে মানুষের হার মানার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায়–
‘দেখ দেখ দূরে মাঝ দরিয়ায়

কালো চুল যেন ওই দেখা যায়

কাহার শাড়ির আঁচল আভাস সহসা উঠিল ভাসি
আমিনারে মোর নিলো কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী’

ডাকাতিয়া খালের মোহনায় নোঙর ফেলা জেলে নৌকা (ছবি: কেএইচ হাসিবুজ্জামান)এ যাত্রায় যদিও কোনও অঘটন ছাড়াই স্পিডবোটটা ফিরে চললো কচ্ছপিয়া ঘাট অভিমুখে।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

/জেএইচ/
টপ