বর্ষা মানেই প্রকৃতির নতুন রূপ। পাহাড়ি ঝরনা, টইটম্বুর নদী আর সবুজে মোড়া পথ। এই সময় প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে ভ্রমণের আনন্দও যেন বেড়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ থাকায় বর্ষার ছুটিতে একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা চাইলে বেছে নিতে পারেন সাহিবগঞ্জ ও রাজমহল। গঙ্গার বিস্তীর্ণ জলরাশি, রাজমহল পাহাড়, ঝরনা ও ঐতিহাসিক স্থাপনা মিলিয়ে দুই-তিন দিনের ভ্রমণের জন্য জায়গাটি হতে পারে দারুণ একটি বিকল্প।
সাহিবগঞ্জ জেলার রাজমহল শহরকে ঘিরে রয়েছে প্রকৃতি ও ইতিহাসের মিলন। সাহিবগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছানোর পরই চোখে পড়বে গঙ্গার বিস্তৃত জলরাশি। কোথাও নদীর ওপার দেখা যায় না, আবার কোথাও গঙ্গার তীরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে রাজমহল পাহাড়।
এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ মোতি ঝরনা। বর্ষায় পাহাড়ের ওপর থেকে প্রবল জলধারা নেমে আসে নিচে। দূর থেকেই শোনা যায় ঝরনার শব্দ। পাথরের গায়ে আছড়ে পড়া পানির অসংখ্য কণা রোদের আলোয় অনেকটা মুক্তোর মতো ঝলমল করে। সেখান থেকেই ঝরনার নাম ‘মোতি ঝরনা’ বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। ঝরনার কাছে গুহার ভেতরে রয়েছে মোতিনাথ শিবমন্দির।
গঙ্গার তীরে রাজমহলের পাহাড়
সাহিবগঞ্জ শহরের সঙ্গে গঙ্গা ও রাজমহল পাহাড়ের সম্পর্কই এই এলাকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই গঙ্গার তীরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। বর্ষায় নদীর জল বেড়ে গেলে বিস্তীর্ণ জলরাশি ও পাহাড়ের সবুজ মিলে তৈরি করে মনোরম দৃশ্য।
স্থানীয় ইতিহাসেও সাহিবগঞ্জ ও রাজমহলের গুরুত্ব রয়েছে। একসময় এই অঞ্চলে ইউরোপীয়দের আনাগোনা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে।
সবুজে ঘেরা কানহাইয়া স্থান
মোতি ঝরনা থেকে প্রায় ১৭-২০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে কানহাইয়া স্থান। সাদা রঙের শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরটি সবুজে ঘেরা। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী জায়গাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতেও ভালো লাগতে পারে জায়গাটি।
ইতিহাসের সাক্ষী সিংহীদালান
প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসের খোঁজ করতে চাইলে যেতে পারেন সিংহীদালান। সাহিবগঞ্জ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত বলে জানা যায়। খিলানযুক্ত বিস্তৃত হলঘর এবং পুরোনো স্থাপত্যের পাশাপাশি এখান থেকে গঙ্গার দৃশ্যও উপভোগ করা যায়।
সিংহীদালান থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে রয়েছে জামা মসজিদ। কেউ কেউ একে জামি মসজিদও বলেন। মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায় এই পুরোনো মসজিদের নকশায়। বর্তমানে ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা এএসআই এর সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে।
আরও যা দেখবেন
তিন দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে সাহিবগঞ্জ-রাজমহলের আশপাশের আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যেতে পারে। তালিকায় রাখতে পারেন ফসিল পার্ক, বারোদুয়ারি ও শিবগড়ি ধাম। ফলে একই সফরে প্রকৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় স্থাপনার স্বাদ পাওয়া সম্ভব।
কোথায় থাকবেন
সাহিবগঞ্জ ও রাজমহল এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল ও লজ রয়েছে। নিজের বাজেট ও যাতায়াতের সুবিধা অনুযায়ী থাকার জায়গা বেছে নেওয়া যায়।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এটি ভারত ভ্রমণ, তাই যাওয়ার আগে বৈধ পাসপোর্ট ও প্রযোজ্য ভারতীয় ভিসা/ভ্রমণ অনুমতির বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। সীমান্ত পারাপার ও পরিবহণের বর্তমান নিয়মও আগে যাচাই করে নেওয়া ভালো।
বর্ষায় ঝরনা ও পাহাড়ি এলাকায় গেলে আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, পিচ্ছিল পথে সতর্ক থাকা এবং অতিবৃষ্টির সময় ঝরনার একেবারে কাছে না যাওয়াই নিরাপদ।
প্রকৃতি, পাহাড়, গঙ্গা আর ইতিহাস সবকিছুকে একসঙ্গে পেতে চাইলে বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য সাহিবগঞ্জ-রাজমহল হতে পারে পরিচিত গন্তব্যের বাইরে এক ভিন্নধর্মী বর্ষার ভ্রমণ।








