চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হকের কাছে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে শুক্রবার রাতে গ্রেফতার হওয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শীর্ষ নেতা হাফেজ মাওলানা মো. মাকসুদুর রহমান ওরফে আব্দুল্লাহ। বছর দুয়েক আগে উত্তরার দেওয়ানবাড়ীর একটি বাসায় সামরিক প্রশিক্ষণ নেয় সে। দেড় মাসের ওই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে কম্পিউটার, ঈমান, তাওহিদ, কাফের হওয়ার কারণ, জিহাদের মাসালা, চাপাতি চালানো, আগ্নেয়াস্ত্র খোলা ও লাগানো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে নিরাপদে কিভাবে মেসেজ আদান-প্রদান করা হয়, সে বিষয়েও প্রশিক্ষণ নেয় সে। মেজর জিয়া আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শরিয়া বোর্ডের একজন সদস্য হলেও সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ থাকায় সংগঠনে তাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে সামরিক প্রশিক্ষণের সব বিষয় দেখভাল করেন মেজর জিয়া। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে মাওলানা মাকসুদুর রহমান ওরফে আব্দুল্লাহ।
শুক্রবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) একটি দল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে মাওলানা মাকসুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাওলানা মাকসুদের সাংগঠনিক নাম আব্দুল্লাহ। ২০০৭ সালে ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় পড়ার সময় কিতাবুল জাহিদ পড়তে গিয়ে সে জিহাদ বিষয়ে আগ্রহী হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাদ্রাসার অন্য এক শিক্ষকের সঙ্গে জিহাদ বিষয়ে আলোচনা করে। এছাড়া তাদের মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বিভিন্ন বইপত্র ও ভিডিও আদান-প্রদান হতো।’
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘গ্রেফতার হওয়া আব্দুল্লাহর বাবার নাম মতিউর রহমান আকন্দ। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আশ্রমপাড়া এলাকায়। গ্রেফতারের আগপর্যন্ত সে ময়মনসিংহের ফুলপুর বাসস্টপেজ মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। যাত্রাবাড়ী এলাকায় সে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে আসার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়।’
শরিয়া বোর্ডের অনুমতি নিয়ে হত্যা
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া আব্দুল্লাহ জানিয়েছে, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে পাঁচ সদস্যের একটি শরিয়া বোর্ড রয়েছে। কাউকে হত্যার আগে এই শরিয়া বোর্ডের অনুমতি নিতে হয়। পাঁচ সদস্যের শরিয়া বোর্ডের প্রধান হলো আরেকজন মাওলানা। যাকে এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা বলা হয়। ২০১৩ সালে এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করলে পলাতক এই শীর্ষ নেতাকে আধ্যাত্মিক নেতা ও শরিয়া বোর্ডের প্রধান করা হয়। মেজর জিয়া এই শরিয়া বোর্ডের অন্যতম সদস্য। সামরিক শাখার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া গত বছর মাওলানা নাঈম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ, সেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের এই শরিয়া বোর্ডের সদস্য।
গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সাধারণত ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে কটূক্তিকারীকে হত্যার জন্য টার্গেট করে। টার্গেটেড ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় সংগ্রহ করে তা শরিয়া বোর্ডে উত্থাপন করা হয়। শরিয়া বোর্ড টার্গেটেড সেই ব্যক্তিকে হত্যার অনুমোদন দিলে একটি ‘স্লিপার সেল’ কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব ‘স্লিপার সেল’ পরিচালনা করেন মেজর জিয়া।’’ ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘শরিয়া বোর্ডের সদস্যরা সরাসরি কোনও অপারেশনে অংশ না নিলেও হত্যার অনুমোদন ও দিক-নিদের্শনা দিয়ে থাকেন। ২০১৩ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতৃত্বে যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার সবই শরিয়া বোর্ডের অনুমতি নিয়ে করা হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর বছর খানেক বিরতি দিয়ে ধারাবাহিকভাবে ব্লগার অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নিলয় নীল, অনন্ত বিজয় দাস, নাজিমুদ্দিন সামাদ ও সর্বশেষ গত বছরের শুরুর দিকে সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন রূপবান সম্পাদক জুলহাস মান্নান ও তার সহযোগী মাহবুব তনয়কে হত্যা করা হয়। যার প্রতিটি ঘটনার তদন্তেই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামের জড়িত থাকার বিষয় উঠে এসেছে। রাজীব হায়দার হত্যার বিচার ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এই মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও সাবেক আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমউদ্দীন রাহমানীসহ অন্য ছয় আসামির বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরের এপ্রিলে সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের পর আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা আত্মগোপনে রয়েছে, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে বছর খানেক ধরে দৃশ্যমাণ কোনও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত না করলেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা গোপনে গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর নব্য জেএমবির নেতাদের গ্রেফতার করতে দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে সিটিটিসি ও পুলিশের অন্যান্য ইউনিট। জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণায় মানুষ সচেতন হওয়ায় এবিটির নেতাকর্মীরা একটু সময় নিচ্ছে। সময় ও সুযোগ নিয়ে এই জঙ্গি দলটি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
সিটির একজন কর্মকর্তা জানান, ‘‘এবিটির শরিয়া বোর্ডের প্রধান, অন্যান্য সদস্য ও চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। জিয়াকে গ্রেফতার করতে পারলেই এবিটি কিছুটা দুর্বল হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জিয়া সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে কিলার বাহিনী হিসেবে একাধিক ‘স্লিপার সেল’ তৈরি করার আশঙ্কা রয়েছে।’’
/এমএনএইচ/








