জাপানি নাগরিক হত্যার আসামি মোহাদ্দেস জেএমবিতে যোগ দেয় যেভাবে

রাফসান জানি
২৫ অক্টোবর ২০১৭, ২২:৪৯আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৭, ২২:৫২

জেএমবি সদস্য মোহাদ্দেস আলী ওরফে বিজয় (ছবি: সংগৃহীত) জাপানি নাগরিক ওসি কুনিও হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল বগুড়া শাজাহানপুরের দর্জি দোকানি মোহাদ্দেস আলী ওরফে বিজয় (৩৬)। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি জেএমবি নেতা রাজীব গান্ধির হাত ধরে জেএমবিতে যোগ দেয় সে। পারিবারিক বিরোধ ও ক্ষোভই বিপথে নিয়ে যায় তাকে।
শুরুতে মোহাদ্দেসকে দিয়ে উত্তরাঞ্চলের একটি শিয়া মসজিদে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে তা বাতিল করে জাপানি নাগরিক ওসি কুনিওকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই অপরাধমূলক কাজে সে সফলও হয়েছে।
র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ অক্টোবর বগুড়ায় শাজাহানপুরের ডেমাজানী ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের ভোলাবাড়ি স্ট্যান্ড বাজারের দর্জি দোকান থেকে জেএমবি সদস্য মোহাদ্দেস আলীকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডে আনা হলে সে ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় জাপানি নাগরিককে হত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করে।
ওসি কুনিওকে হত্যার পর মোহাদ্দেস তার গ্রামের বাড়ি গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করে এবং পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিল। এর মধ্যে র্যা বের হাতে গ্রেফতার হলো সে।
র‌্যাব-১২’র অধিনায়ক ডিআইজি সেলিম মো. জাহাঙ্গীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত প্রতিবেশীর ওপর প্রতিশোধ নিতে জেএমবিতে যোগ দেয় মোহাদ্দেস। পরবর্তীতে অবশ্য আর প্রতিশোধ নেয়নি। তবে জঙ্গি কার্যক্রমে ঠিকই জড়িয়ে পড়ে।’

এই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান— ২০১৫ সালে পারিবারিক কলহের জের ধরে মোহাদ্দেসের মাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে প্রতিবেশী। সে বাধা দিলে তাকেও মার খেতে হয়। প্রতিবেশীরা এ দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করে। বাল্যবন্ধু মোস্তাফিজ ওরফে বোমা শাকিলের (২৮) কাছে এ ঘটনা বিস্তারিত জানায় সে। তখন তাকে প্রতিশোধ নিতে জেএমবি’তে যুক্ত হওয়ার দাওয়াত দেয় মোস্তাফিজ। একপর্যায়ে সে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জেএমবিতে যোগ দিতে রাজি হয়।

নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা রাজীব গান্ধির অনুগত হয়ে মোহাদ্দেস যোগ দেয় বলে জানান র্যা ব-১২’র অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে মাঝামাঝি একদিন সন্ধ্যায় বগুড়ার শাজাহানপুরের একটি মাঠে মোস্তাফিজ তাকে রাজিবুল ও রাজীব গান্ধির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। রাজীব গান্ধি তাকে একটি সিমসহ মোবাইল ফোন দেয় ও তার অনুগত হয়ে উগ্রবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলে।’

পরিচয়ের ১৫-২০ দিন পর মোহাদ্দেসকে উত্তরাঞ্চলের একটি শিয়া মসজিদে আক্রমণের দায়িত্ব দিতে রংপুরের শাপলা চত্বরে ডেকে পাঠায় রাজীব গান্ধি। সেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি টিনশেডের বাসায়। তখন তার পরিচয় হয় রফিক, শফিক, বাইক হাসান ও রাহুলের সঙ্গে।

ওই টিনশেড বাসাতেই মোহাদ্দেসের সাংগঠনিক নাম দেওয়া হয় ‘বিজয়’। বাড়িটিতে চার দিন অবস্থান করে রাজীব গান্ধির আদেশে সে, রফিক, রাহুল ও বাইক হাসানকে উত্তরাঞ্চলের একটি শিয়া মসজিদ হামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে রাজীব গান্ধির নির্দেশে শিয়া মসজিদে হামলার পরিকল্পনা বাতিল হয়। তাই বাড়ি ফিরে আসে মোহাদ্দেস।

রংপুরের শাপলা চত্বর সংলগ্ন টিনশেড বাড়িতেই রাজীব গান্ধির কাছে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেয় মোহাদ্দেস। র্যা বের জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, শিয়া মসজিদে হামলার পরিকল্পনা বাতিলের ১০-১৫ দিন পর আবার ওই টিনশেড বাড়িতে তাকে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে রাজীব গান্ধি পিস্তল লোড, আনলোড ও গুলি করার প্রশিক্ষণ দেয়। তাকে একটি ৬ মিমি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিন আর রফিককে একটি ৯ মিমি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিন দেওয়া হয়।

অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে মোহাদ্দেসকে রংপুরের কাউনিয়ায় জাপানি নাগরিক ওসি কুনিওকে হত্যার জন্য নির্বাচন করা হয়। রাজীব গান্ধির কথামতো ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর অপারেশনের জন্য বের হয় সে। ওইদিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে বাইক হাসানের মোটর সাইকেলে চড়ে মোহাদ্দেস ও রফিক তিনজন রংপুরের সাতমাথায় যায়। সেখানে রাজীব গান্ধি তাদের সঙ্গে দেখা করে ‘আল্লাহর দুশমনকে মারতে হবে’ নির্দেশনা দেয়।

এরপর মোহাদ্দেস ও রফিক অবস্থান নেয় কাউনিয়া আলুটারি কাঁচা রাস্তায়। পাকা রাস্তায় মোটর সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করে বাইক হাসান। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে রিকশায় চড়ে কাঁচা রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন জাপানি নাগরিক ওসি কুনিও। রিকশার গতিরোধ করে গুলি চালাতে থাকে রফিক। গুলিতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন জাপানি নাগরিক।

তখন রফিক ও মোহাদ্দেস ঘটনাস্থল থেকে সরে পাকা রাস্তায় বাইক হাসানের মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে আসে। পালিয়ে আসার পর বাইক হাসান তাদেরকে যার যার মতো চলে যেতে বললে বাড়িতে চলে আসে মোহাদ্দেস। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত সে গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছিল বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

/আরজে/জেএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: সোহেল রানার জবানবন্দিতে যা উঠে এলো
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: সোহেল রানার জবানবন্দিতে যা উঠে এলো
নকিব মুকশির নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিনুকধানী’
নকিব মুকশির নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিনুকধানী’
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের