ছিনতাইয়ের সেই ঘটনা হার মানিয়েছিল সব নৃশংসতাকে। প্রাইভেটকারযোগে ছিনতাইয়ের সময় এক নারীর ব্যাগ ধরে টান দিয়েছিল ছিনতাইকারীরা। ঘাড়ে পেঁচানো সেই ব্যাগসহ রাস্তায় পড়ে যান সেই নারী। ছিনতাইকারীরাও ছিল নিষ্ঠুর আর নাছোড়বান্দা। ব্যাগ ছেড়ে না দিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে সেই নারীকে টেনেহিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায় বেশ কিছুদূর। গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় হেলেনা বেগম নামে ওই নারীর। আর ছিনতাইকারীরা চলে যায় ব্যাগ নিয়ে। মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছিল গত ২৬ জানুয়ারি, ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে।
ঘটনার পর পুলিশ বিষয়টি দুর্ঘটনা বললে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা। এরপর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ওই প্রাইভেটকারটিকে শনাক্ত করা হয়। পরে গাড়িচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং পরবর্তীতে ব্যাগ টান দেওয়া ছিনতাইকারী জাকারিয়া হাওলাদারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দুজনই আদালতে নৃশংস এই ছিনতাইয়ের ঘটনার বিশদ বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
গত রবিবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আমিরুল হায়দার চৌধুরীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জাকারিয়া হওলাদার বলে, ‘আমি, আব্দুল্লাহ, মিজান, শিমুল ঘটনার দিন (২৬ জানুয়ারি, শুক্রবার) সকালবেলা প্রাইভেটকারটি নিয়ে বের হই। প্রাইভেটকারটি আব্দুল্লাহর। ছিনতাই করার উদ্দেশে আমরা উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল হয়ে ফকিরাপুল দিয়ে গুলিস্তান যাই। গুলিস্তানে শিমুল এক নারীর ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু পারেনি। ওইখান থেকে ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের মুখে যাই। দেখি ১ জন পুরুষ এবং ১ জন মহিলা ব্যাগ হাতে রাস্তা পার হচ্ছে। পার হওয়ার সময় মহিলার হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগটি আমি টান দেই। মহিলা পড়ে যায়। মহিলা ডিভাইডারের ওপর ছিল। পড়ে যাওয়ার সময় শব্দ হয়। আমি জোরে টান দিয়ে চলে যাই।’
নৃশংস এই ঘটনার শিকার হেলেনা বেগম গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে স্বামী মনিরুল ইসলাম মন্টুর সঙ্গে ঢাকার কলাবাগানের বাসায় ফিরছিলেন। সদরঘাট থেকে বাসযোগে ধানমন্ডি ৭ নম্বরে আসেন তারা। সকাল ৭টা ১৯ মিনিটে বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তারা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ছিলো মর্মান্তিক। ঘটনার পর থেকে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে ছিনতাইকারীদের ধরতে অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে আব্দুল্লাহ ও পরে ছিনতাই চক্রটির দলনেতা জাকারিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।’ এই ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত বাকি দুজনকেও গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দিতে পেশাদার ছিনতাইকারী জাকারিয়া হাওলাদার আরও বলে, ‘আমরা পান্থপথ হয়ে মগবাজার ফ্লাইওভারে উঠি। ব্যাগের মধ্যে মাত্র ৩০০ টাকা পাই। ব্যাগটি ফেলে দেই। শিমুলকে খিলক্ষেত ফ্লাইওভারের নিচে নামিয়ে ওখান থেকে উত্তরা হয়ে আশুলিয়া-বাইপাইল চলে যাই। পরের দিন আব্দুল্লাহ আমাকে ফোন দিয়ে বলে, দেখ খবরে দেখাচ্ছে ধানমন্ডিতে এক মহিলা ছিনতাইকারীর গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে। আমি তাকে বলি আমাদের কিছু হবে কিনা? তখন আব্দুল্লাহ বলে আমাদের গাড়ি তো দেখেনি, কিছু হবে না। কিছুদিন পর পুলিশ আমার আশুলিয়ার বাসায় এলে আমি পালিয়ে যাই। পরে পুলিশ আমাকে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শেওড়াপাড়া থেকে গ্রেফতার করে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নিহত হেলেনা বেগমের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঘটনার পর হেলেনা বেগমকে উদ্ধার করে গ্রিনলাইফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ব্যাগসহ টেনেহিঁচড়ে কিছুদূর নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে হেলেনা বেগমের মাথার ওপর দিয়ে ছিনতাইকারীদের গাড়ির চাকা চলে যায়।
নৃশংস এই ছিনতাইয়ের আরেক আসামি প্রাইভেটকারটির চালক আব্দুল্লাহ আল মামুন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম খুরশীদ আলমের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আব্দুল্লাহ বলে, ‘আমি ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-৪৪৫২ নং গাড়ি, যার মালিক আব্দুল জলিল, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতাম। বাইপাইল রেন্ট-এ কারে বসে জাকিরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। জাকিরের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরে। গত ২৫ জানুয়ারি জাকির আমাকে ফোনে ডেকে নেয় একটা কাজ আছে বলে। আমি মাঝে মধ্যে জাকিরের সঙ্গে ছিনতাই করতাম। একটা বিয়ের ট্রিপ ছিল। সেখানে ছিনতাই করার কথা বলে। কিন্তু শিমুল ওরফে শ্যামল রাতে আসে নাই বলে ওই বিয়েতে আর ছিনতাই করতে যাওয়া হয় নাই।’
‘২৬ জানুয়ারি ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে জাকির আমাকে ডেকে নেয়। আমি গাড়ি বের করি। জাকির গাড়িটি চালায়। আমি ও নিজাম নামের একজন (জাকিরের বন্ধু) গাড়ির পেছনে বসি। নিজামের বাড়ি আর জাকিরের বাড়ি একই জায়গায়। আমরা ফকিরাপুল থেকে শিমুল ওরফে শ্যামলকে আমাদের গাড়িতে তুলি। জাকিরের বাম পাশের সিটে বসে শ্যামল। জাকির গাড়ি চালিয়ে গুলিস্তান আসে। গুলিস্তানে শিমুল ওরফে শ্যামল একজন মহিলার ব্যাগ টান মারে। সামনে পুলিশ থাকায় ব্যাগ নিতে পারে নাই।’ স্বীকারোক্তিতে এসব বলে আব্দুল্লাহ, যাকে প্রথম গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আব্দুল্লাহ আদালতে আরও বলে, ‘এরপর গাড়ি চালাতে চালাতে ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কে গিয়ে দেখি একটি ছেলে ও মেয়ে, তারা স্বামী-স্ত্রী হবে, রাস্তা পার হচ্ছে। তখন জাকির গাড়িটা ওই মেয়ের পাশে চাপিয়ে মেয়ের ব্যাগ টান দেয়। মেয়ে ব্যাগ না ছাড়ায় গাড়ির সঙ্গে পাকা রাস্তার ওপর ছ্যাঁচড়াতে থাকে। পরে একসময় মেয়ে ব্যাগ ছেড়ে দেয়। ব্যাগটা প্লাস্টিকের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিল। শিমুল ওরফে শ্যামল ব্যাগটা খোলে। ব্যাগটা মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপরে খুলে ৩০০ টাকা ও একটি বাটনওয়ালা সিমফোনি কমদামি মোবাইল পায়। ফ্লাইওভার থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটি নিচে ফেলে দেওয়া হয়। জাকির আমাকে গাড়ি ভাড়া বাবদ তিন হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেয়। মালিকের স্ত্রীকে ৩ হাজার টাকা দেই। শ্যামল ওরফে শিমুলের বাড়ি মাগুরা বলে জানি।’
আলোচিত এই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নয়ন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘এরা পেশাদার ছিনতাইকারী। ছিনতাইয়ে মোট চারজন অংশ নিয়েছিল। দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দুজনের অবস্থান জানা এবং গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বাকি দুজনকে শনাক্ত করতে পারলেই আদালতে মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’







