বেলুন ফোলানোর জন্য হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি ও তার মাধ্যমে বেলুন ফুলিয়ে বিক্রি করা আইনে নিষিদ্ধ। মাঝে-মধ্যেই সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে প্রাণহাণির ঘটনাও ঘটছে। বেলুন বিক্রেতারা বাজার থেকে কেমিক্যাল কিনে এনে তৈরি করছে হাইড্রোজেন গ্যাস। মানহীন সিলিন্ডার ব্যবহার করার কারণে বিস্ফোরণও ঘটছে হরহামেশাই। কিন্তু, এ বিষয়ে কার্যকর কোনও তদারকি নেই। বিস্ফোরক অধিদফতর বলছে, তারা মাঝে-মধ্যেই পুলিশকে চিঠি দিয়ে এরকম সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের ধরতে অভিযান চালাতে বলে আসছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে কেমিক্যাল বিক্রির বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যেই অভিযান চালানো হয়। পুরো বিষয়টি তদারকি করার কথা বিস্ফোরক অধিদফতরের। সিলিন্ডারের মান বা কোনও কেমিক্যাল খোলা বাজারে বিক্রি করা যাবে কি যাবে না, তা বিস্ফোরক অধিদফতর দেখভাল করে।
বুধবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকায় বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সাত শিশু নিহত হয়েছে। এরপরই আলোচনায় উঠেছে এসব সিলিন্ডার দেখভাল করার দায়িত্ব কার? বিস্ফোরক অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত বেলুন ফোলানো সিলিন্ডারের ভেতরে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরানো হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা অ্যালুমিনিয়াম, পানি ও কস্টিক সোডার মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে থাকে। এসব বেলুন উড়ে বেশি। এটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ এবং অবৈধ। সাধারণত হিলিয়াম গ্যাসের মাধ্যমে বেলুন ফোলানো হয়। এটি তুলনামূলক নিরাপদ।
বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা বিভাগের তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩৮ জন মারা গেছেন। এর আগেও বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ‘বেলুন বিক্রেতা হকাররা সাধারণত নিজেরাই সিলিন্ডারের মধ্যে হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে। খোলা বাজার থেকে কিনে নন রেস্ট্রিক্ট্রেট কেমিক্যাল ব্যবহার করে তারা। এজন্য তাদের ধরার উপায়ও নেই। তবে প্রাণহাণি হতে পারে, এমন বিস্ফোরক আইনত নিষিদ্ধ। আমরা এ বিষয়টি উল্লেখ করে এসব হকারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে মাঝে-মধ্যেই পুলিশকে চিঠি দিয়ে আসছি। এদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব পুলিশের। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে জনগণকেও সচেতন করার চেষ্টা করছি। যাতে কেউ এ ধরনের হকারদের দেখলে সঙ্গে-সঙ্গে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ যাতে তৎপর হয়ে কোনও দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু, পুলিশ তা করছে কিনা, আমরা জানি না।’
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, খোলাবাজারে কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করাসহ সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদফতরের। কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এই বিষয় নিয়ে আলোচনাও করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরাও এই বিষয়ে কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে খোলা বাজারে কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার আশায় খোলা বাজারে কেমিক্যাল বিক্রি করে থাকে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অবৈধভাবে কেমিক্যাল মজুদ বা বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। এটি সবসময়ই চলমান রয়েছে।’
বেলুন ফোলানোর সিলিন্ডার দেখলেই গ্রেফতারের নির্দেশ
এদিকে মিরপুরে বেলুন ফোলানো সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সাত শিশু নিহত হওয়ার পর কোথাও বেলুন ফোলানোর সিলিন্ডার ব্যবসায়ীকে দেখলেই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম। ডিএমপির আট ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনারদের (ডিসি) কাছে মৌখিকভাবে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডিসিরা নিজ নিজ এলাকার থানার ওসিদের এই নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে বেতারবার্তার মাধ্যমেও পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি। অবৈধভাবে কেউ সিলিন্ডার ব্যবহার করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বিশেষ করে বিভিন্ন স্কুল বা খেলার মাঠসহ নিম্ন আয়ের লোকজনের আবাসস্থলগুলোতে পুলিশ নজরদারি করবে। এছাড়া এসব সিলিন্ডার কারা সরবরাহ করে, কোথা থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, কারা হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে অবৈধভাবে সিলিন্ডারে ভরে বিক্রি করে তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘আমরা এরকম একটা নির্দেশনা পেয়েছি। মাঠে দায়িত্বপালনকারী পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
নির্দেশনা পেয়েছেন জানিয়ে সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কেউ বেলুন ফোলানো সিলিন্ডার ব্যবহার করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






