আলোচিত দুই হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলায় ফরিদপুরের সাবেক যুবলীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের সহযোগীরা এলাকায় ফের তৎপর হওয়ার চেষ্টা করছেন। দুই ভাই বরকত ও রুবেলের বিরুদ্ধে সিআইডির চার্জশিটের পরই তাদের অনেক অনুসারী ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি দুই সহদোরের অন্যতম সহযোগী ও ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমানকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছে ফরিদপুর জেলা পুলিশ।
গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে সিদ্দিকুর রহমানকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করে ফরিদপুরের গোয়েন্দা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে জমি দখল ও মিথ্যা মামলায় হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলিমুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্রেফতার সিদ্দিকুর রহমান কারাগারে থাকা বরকত ও রুবেলের সহযোগী। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।’
ফরিদপুরের পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বরকত, রুবেল ও সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের এপিএস এএইচএম ফোয়াদের ঘনিষ্ঠ ছিল সিদ্দিকুর। তারাই সিদ্দিকুরকে চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি বানিয়েছে।
সূত্রটি জানায়, সিদ্দিকুরের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ ৮টি মামলা রয়েছে। ছোটন বিশ্বাস হত্যা মামলায় হুকুমদাতা হিসেবেও তার নাম রয়েছে।
পুলিশের শুদ্ধি অভিযানের শুরুতে দুই ভাই বরকত ও রুবেলকে আটক করা হয়। পরে তার ২৫ সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। আরও ৪২ সহযোগীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী নেতা সিদ্দিকুর রহমান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ বিন ওয়াজেদ, বরকতের শ্বশুর পান্নু হাওলাদার, চাচা-শ্বশুর সেলিম হাওলাদার, জামাল, আজমসহ বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে।
গত বছরের জুলাইয়ে আবুল হাসেম ফকির নামের এক ব্যক্তি ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা করেন। তার অভিযোগ—পুকুর লিজ নিয়ে তিনি মাছ চাষ করতেন। রুবেল, বরকত ও সিদ্দিকুরের অনুসারীরা তার কাছে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় ২০১৯ সালের মে’তে পুকুরের মাছ ধরে বিক্রি করে দেয় তারা। এতে তার ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। সিদ্দিকুরের মদতে স্থানীয় আনোয়ার হোসেন, খায়রুজ্জামান, মুরাদ মোল্যা, ফজল বেপারী, লিটন, বাবু ফকির, তাবু ফকির, রুবেল শেখ, বাসার মোল্যা ও বাপ্পী মন্ডল মাছ ধরা ও বিক্রিতে জড়িত ছিল।’
এজাহারে আবুল হাসেম বলেন, ‘২০১৯ সালে চক্রটির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি। তাই তখন মামলা করিনি। ২০২০ সালে পুলিশের অভিযানের পর মামলা করি।’
কোতয়ালী থানার এই মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অভিযোগে সিদ্দিকুরের জড়িত থাকার প্রমাণও পেয়েছে তারা।
বরকত, রুবেলসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে ২০২০ সালের জুলাইতে কোতয়ালী থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন মানিক চক্রবর্তী নামে একজন। ফরিদপুরের উত্তর কালীবাড়ি সড়কের একটি ওষুধের দোকানের ম্যানেজার তিনি। ওই মামলার তদন্তেও সিদ্দিকুরের নাম রয়েছে। এই মামলারও অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়াও পুলিশের করা গরুর হাটে চাঁদাবাজির একটি মামলায়ও আসামি সিদ্দিকুর।
নান্নু খান নামের এক ব্যক্তির অভিযোগ—তার জমি দখল করে ইটের ভাটা দেয় সিদ্দিকুর। নান্নু খান বাধা দিতে গেলে তার ওপর হামলা করে সিদ্দিকুরের লোকজন। এই ঘটনায় তিনিও গত জুলাইতে একটি মামলা করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সিআইডি ইতোমধ্যে সিদ্দিকুরের বৈধ ও অবৈধ বিপুল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে। ফরিদপুরে তার নামে দুই শতাধিক বিঘা জমি, দুটি ইট ভাটা, তার ভাই জলিলের নামে একটি ইট ভাটা, ১৩টি ট্রাক, ৫টি মিক্সচার মেশিন ও ২টি পাথর ভাঙার মেশিনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলিমুজ্জামান জানান, সিদ্দিকুরের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাছ চুরিসহ আটটি মামলা রয়েছে। থানার পাঁচটি মামলাগুলোর মধ্যে চারটিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। একটি তদন্তাধীন। আদালতে দায়ের করা তিন মামলার তদন্ত চলছে।’
কাফরুল থানায় গত বছরের ২৬ জুন দায়ের করা সিআইডির আড়াই হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই রুবেল, বরকতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি। অভিযোগপত্রে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী ও ফরিদপুর–৩ আসনের সাংসদ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন ওরফে বাবরকে। খন্দকার মোশাররফের সাবেক এপিএস এএইচএম ফোয়াদকে ৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। ফোয়াদ জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়কও। অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য ছয় আসামি হলেন—শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার নাজমুল ইসলাম ওরফে লেবি, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান ওরফে ফারহান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ বিন ওয়াজেদ, শহর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল হাসান ডেভিড, জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী (মিনার) ও শহর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম নাসিম।
আসামিদের মধ্যে কারাগারে রয়েছেন রুবেল, বরকত, নাজমুল ইসলাম, ফোয়াদ ও আসিবুর রহমান। খন্দকার মোহতেশাম হোসেনসহ পাঁচ আসামি এখনও পলাতক।







