আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারই এক সময়কার রানার ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। জবানবন্দিতে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমসহ ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন।
রবিবার (২১ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দিতে সাক্ষী ইমরুল কায়েস (৪৩) বলেন, আমি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে আর্মার্ড কোরে যোগদান করি। আমার চাকরির একটি পর্যায়ে ২০১০-২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলাম। কর্মরত থাকা অবস্থায় র্যাব হেডকোয়ার্টার ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে চাকরি করি। আমি ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র্যাবে পোস্টিং হয়ে আসি। আমরা যারা পোস্টিং হয়ে আসি প্রথমে আমাদের অ্যাডমিন উইংয়ে রাখা হয়। পরবর্তীকালে র্যাবের বিভিন্ন ইউনিট বা সংস্থায় বদলি করা হয়। আমি বদলির অপেক্ষায় ছিলাম। এ অবস্থায় সিভিল পোশাকে তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার (বর্তমানে অব. মেজর জেনারেল) র্যাব হেডকোয়ার্টারে আসেন। তিনি আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। ২০০৪ সালে আমি তার অধীনে আর্মি কমান্ডো কোর্স করি। তখন উনি কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে আমি তার অধীনে কর্মরত ছিলাম। তাছাড়া তখন তিনি আমাদের ব্যাটালিয়নে ক্যান্টিন অফিসার ছিলেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। দেখা হওয়ার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কীরে ইমরুল তুই এখানে?’ আমি স্যারকে তখন বলি, ‘স্যার আমার র্যাবে পোস্টিং হয়েছে।’ স্যার জিজ্ঞেস করলেন কোথা থেকে আমার পোস্টিং হয়েছে? আমি বললাম, স্যার আমার ১২ ল্যান্সার থেকে পোস্টিং হয়েছে। তখন স্যার আমার নাম ও নম্বর দিতে বলেন। আমি আমার নাম ও নম্বর স্যারকে দেই। তার দুই-তিনদিন পরেই র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে পোস্টিং হয়।’
‘এরপর আমি ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের স্বাভাবিক ডিউটি, যেমন- স্ট্যান্ডবাই পেট্রোল, এয়ারপোর্ট ডিউটি, র্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে যেখানে আমরা সংযুক্ত থাকি সেখানে ডিউটি করতে থাকি। আমি মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় সিনিয়র ডিএডি (নাম মনে নেই) আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘‘ইমরুল তোমাকে ডাইরেক্টর ইন্টিলেজেন্সের রানার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’’ যা র্যাবে বডিগার্ড হিসেবে বলা হয়। জিয়াউল স্যারের রানার থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিল—সব সময় স্যারের সাথে থাকা এবং স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন, সেখানে আমাকে নিয়ে যেতেন। স্যারের সাথে আমি বিভিন্ন জায়গায়, যেমন জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) ইত্যাদিতে যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যেতাম। এছাড়া স্যার বিভিন্ন ব্যক্তির বাসায় যেতেন। তার মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকীর (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিকিউরিটি চিফ অ্যাডভাইজার) বাসায় যেতেন। আমিও স্যারের সাথে যেতাম। তারেক সিদ্দিকী স্যারের সাথে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। তারেক সিদ্দিকী স্যারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সাথেও আমার স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন তার গাড়িতে অস্ত্র-অ্যামোনিশন থাকতো, কিন্তু জিয়া স্যারের গাড়ি বিধায় তা তল্লাশি করা হতো না। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা, যেমন- মাহবুবুল হক হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকদের সাথেও জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। স্যার তাদের বাসায় যেতেন।’
সাক্ষী আরও বলেন, রানার হিসেবে যোগদান করার ২০/২৫ দিন পরে রাত আনুমানিক ১২টা সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘‘কই তুই?’’ আমি বলি, আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র্যাব-১-এর অফিসের সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি—দুটি কালো রঙে হায়েস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ওই গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন। গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পেছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র্যাব-১-এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরও দুই জন ছিলেন, আমি তাদেরকে চিনি না। রাত আনুমানিক পৌনে একটার দিকে র্যাব-১ কার্যালয় থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন (উত্তরার) হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বেশ কিছু দূর যাই। যাওয়ার পর সেখানে একটি রেল ক্রসিং পড়ে, রাস্তার দুই পাশে গাছগাছালি ছিল, সেখানে আমাদের গাড়িগুলো থামে। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ‘‘ইমরুল ডিক্কিটা খোল, বস্তাটা বের কর।’’ আমি ডিক্কি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশ্যে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না বরং একটা ডেডবডি ছিল এবং ঠান্ডা ছিল। প্রথম অবস্থায় আমি ভয় পেয়ে যাই। আমার সাথে যারা ছিল, তাদের সহায়তায় বডিটা রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখি। স্যার সেখানে দাঁড়ানো ছিল। বডিটা সেখানে রেখে আমি মাইক্রোতে চলে আসি। তখন দেখি জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেললাইনের ওপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি।’
তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, লাইনে ফিরে আসার পর ৫/৭ দিন আমি অস্বাভাবিক ছিলাম। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল যে আমি কোথায় এলাম, কীভাবে চাকরি করবো। আমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছিলাম না। এই ঘটনার কিছু দিন পর আমি জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে কয়েকবার সুন্দরবন অপারেশনে যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনের কথা আমার মনে আছে। আমরা বোটে করে সুন্দরবন অপারেশনস্থলে যাই। ওই সময় সেখানে নদীর ভাটা ছিল। আমাদের সাথে র্যাব-৮-এর সদস্যরাও ছিলেন। আমাদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে ২/৩ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের ফায়ার করার নির্দেশ দেওয়া হলে আমরা র্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা এবং র্যাব-৮ সদস্যরা ফায়ার করি। ভাটা থাকার কারণে কাদায় আমাদের হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে আমাদের ফায়ার বন্ধ করার নির্দেশ দেন। সেখানে জিয়াউল আহসান স্যার, র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিল। আমরা জঙ্গলের ভেতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২/৩টি লাশ পড়ে আছে। গাছের ডালপালা দিয়ে সেখানে একটি হাঁটার রাস্তা দেখতে পাই। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে ছোট ছোট ঘর ছিল। সেখানে জলদস্যুরা বসতে পারতো। সবগুলো ঘরই গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ছিল। একটি গাছের ওপর একটি ওপি (অবজারভেশন পোস্ট), যার চারপাশে বুলেটপ্রুফ পাত লাগানো ছিল, দেখতে পাই। এছাড়া আমরা দুটি বোট দেখতে পাই। বোটগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যাদি ছিল, যেমন- সিগারেট, মদের বোতল, বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী ও একটি ছাগলও ছিল। ছাগলটি আমরা দুপুরের খাবারের সময় জবাই করে খেয়েছিলাম। এই অপারেশনটি আমার কাছে একটি সাজানো অপারেশন মনে হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ওই সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮/১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদের হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিল এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে বলে জিয়া স্যার বলেছেন। এই লোকগুলোকে দুইভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিল ইনজেকশন পুশ করে এবং আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের নিকট আর্মি ক্যাম্প আছে, তার ভেতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা একটি বস্তা নিচে রাখা হতো, তার ওপর যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, তাকে রাখা হতো, তার ওপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।’
‘২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে আমি লাইনে ছিলাম। একদিন ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে জিয়াউল আহসান স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারের ওখানে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে আমি স্যারকে পাইনি। একটু পরে জিয়া স্যার ফোন দিয়ে আমাকে আরেকটু সামনে যেতে বলেন। ওই দিন আমি ইফতার করতে পারিনি। নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চার জন লোককে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই অপারেশনটা সাজানো ছিল। ২০১২ সালের প্রথমের দিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। সেখানে ওই ১১ জন আসামিকে বোটে ওঠানো হয়। জিয়া স্যার কাছে ডাকলে গিয়ে দেখি—এই বোটটি সেই বোট, যেটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল। তখন হঠাৎ করে একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেয়। জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ‘ইমরুল ধর ধর।’ স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ওই আসামিকে ধরি। রশির সাহায্যে আমাকে এবং ওই আসামিকে বোটে ওঠানো হয়। ওই সময় অন্ধকার ছিল। আমি আসামিকে চিনতে পারিনি। তবে তার বয়স আনুমানিক ২৫/২৬ বছর হবে। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমি অনেক ময়লা পানি খেয়েছি। পরে আমি বমি করি এবং দুর্বল হয়ে যাই। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ওই অপারেশনে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার, এডিজি (অপস) মুজিব স্যার ছিলেন। অপারেশন শেষে আমরা লাইনে চলে আসি।’
‘২০১২ সালের মাঝামাঝি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে দুই জন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় জমটুপি পরানো ছিল। আনুমানিক রাত ২টা বা আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌঁছাই। সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪/৫ জন লোক এসে তাদের আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করি। জাফলং বর্ডার থেকে আনুমানিক ২৫/৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয় এবং জিয়াউল আহসান স্যার তখন তাকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। ওই সময় স্যারের নির্দেশে আমি এবং অন্য একজন গাড়ির সামনে এবং পেছনে সিকিউরিটি হিসেবে দাঁড়াই। অন্য আসামিকে নিয়ে রওনা করে ১০/১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে তাকে জিয়াউল আহসান স্যার গুলি করে হত্যা করেন।’
ইলিয়াস আলী গুম ও হত্যা প্রসঙ্গে
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করা প্রসঙ্গে সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার এবং মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দেই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে যাই। ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে ইলিয়াস আলী নামক একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি আমার কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন। সাধারণত ফল-ইন (রোল কল) সকাল ৯টায় হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিল থেকে সকাল ৭টায় ফল-ইন হতো এবং জিয়া স্যার পর পর বেশ কয়েকদিন ফল-ইনের সময় এসেছিলেন। জিয়া স্যারের থাকা অবস্থায় একদিন জিয়া স্যার ফোনে কোন একজনের সাথে কথা বলছিলেন। ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল আসলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার ফোন দিয়েছেন।’ জিয়া স্যার তারেক স্যারের সাথে কথা বলা শুরু করেন। অপরপ্রান্তে কী বলেছে আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে, এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠাই দেন, এটাই আমার ভালো।’
‘তার বেশ কিছু দিন পরে র্যাব-৪-এর সেইফ হাউজ থেকে দুজন আসামিকে দুটো মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধা ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়।’
ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষী পরে বলেন, ‘গাড়ি দুটি থামানো হয়। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সে গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জিয়াউল আহসান স্যার ওই আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন এবং হত্যা করেন। ওই আসামির অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সকলে হাসাহাসি করছিল। ওই আসামির হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। আসামিকে হত্যা করার পর আমরা গিয়ে স্যারের নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসি। আমাদেরকে আমাদের গাড়ি নিয়ে র্যাব-৪-এ চলে যেতে বলেন। জিয়া স্যার অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান। জিয়া স্যার যখন র্যাব-৪-এ ফেরত আসেন তখন ওই আসামি তার সাথে ছিল না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।’
‘এই ঘটনার এক-দুই সপ্তাহ পর আমি লাইনে কেরাম খেলতেছিলাম। তখন জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘র্যাব-১-এর সামনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়ানো আছে, সেখানে গিয়ে ওই গাড়িতে ওঠো।’ আমি স্যারের আদেশ শুনে গাড়িতে গিয়ে উঠি এবং দেখতে পাই মেজর নওশাদ স্যার গাড়িতে বসা আছেন এবং দুই জন আসামি (পরে বলেন) টার্গেট জম টুপি পরা অবস্থায় গাড়ির ভেতরে বসে আছে। কিছুক্ষণ পরে জিয়াউল আহসান স্যার রাস্তার অপর পার্শ্বের একটি প্রাইভেটকারে এসে নামেন। তারপর রাস্তা পার হয়ে আমাদের গাড়িতে এসে ওঠেন। আমরা যাত্রা শুরু করে টঙ্গী হয়ে আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের ওপরে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ‘ইমরুল নামো।’ আমি স্যারের আদেশ অনুযায়ী গাড়ির পাশেই দাঁড়াই গার্ড দেওয়ার জন্য। তখন জিয়া স্যার একজন টার্গেটকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পর পর দুটি গুলি করেন এবং ব্রিজ থেকে যখন ফেলে দেয়, তখন টার্গেটের লুঙ্গি খুলে দেয়। ব্রিজ থেকে টার্গেটকে নদীর পানিতে ফেলে দেয়। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখান থেকে টার্গেটকে নদীর পানিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। তখন একইভাবে মেজর নওশাদ স্যার পরবর্তী টার্গেটকেও গুলি করে হত্যা করে এবং লুঙ্গী খুলে পানিতে ফেলে দেয়।’
‘এই ঘটনা ছাড়াও আমি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র্যাব-৮-এর সহযোগিতায় পাথরঘাটার চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনও দুই জন, কখনও তিন জন, কখনও চার জন টার্গেটকে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে, অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ওই টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।’
‘জিয়াউল আহসান স্যারের সাথে আমি এক বছর তিন-চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসাবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ করি, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিকে গুম করতেন। তিনি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিল গুলি এবং ইঞ্জেকশন। পূর্বের বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরও ১০/১২ জন ব্যক্তিকে ইঞ্জেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনও টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনও গাড়িতে সংঘটিত হতো। আমি র্যাব থেকে চলে যাওয়ার পরে আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি নাই (সাক্ষী এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে)। আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি, তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সাথে দেখেছি, তিনি ওই সময়ে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনও সৈনিককে কখনই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।
জবানবন্দির শেষে সাক্ষী ইমরুল কায়েস আরও বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা একাধিকবার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত আছি। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’









