তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী-নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ ও দেনমোহরের বাস্তবায়ন বন্ধ হবে না মর্মে হাইকোর্টের রায় প্রকাশিত হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। একই সঙ্গে আদালত উল্লেখ করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাক বা পারিবারিক বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি শিশুর স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আইনগত অধিকার।
এই রায়ের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সন্তানের ভরণপোষণ বিষয়টি। কিন্তু ভরণপোষণ বলতে কী বোঝায়, কার দায়িত্ব এবং এতে কী কী অন্তর্ভুক্ত এসব বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই।
ভরণপোষণ কী
ভরণপোষণ বলতে একজন সন্তানের সুস্থ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের মৌলিক ব্যয় বহন করাকে বোঝায়। এর মধ্যে শুধু খাবার বা পোশাক নয়, বরং বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ এবং শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।
সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব কার
বাংলাদেশের প্রচলিত পারিবারিক আইন অনুযায়ী, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের প্রধান দায়িত্ব বাবার। তবে সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও অভিভাবক—উভয়েরই দায়িত্ব। মা-বাবার মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান হলেও সন্তানের প্রতি এই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
তালাক হলেও কেন ভরণপোষণ বন্ধ হবে না
হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত নয়। অর্থাৎ তালাক হয়েছে কি হয়নি, বা তা নিয়ে আইনি বিরোধ চলমান এসব কারণে সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ রাখা বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এটি শিশুর নিজস্ব আইনগত অধিকার।
আদালতের বার্তা
বিচারপতি আবদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চের প্রকাশিত রায়ে বলা হয়েছে, আইনগতভাবে প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এবং দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত শিশুর অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছেন, পারিবারিক বিরোধের কারণে কোনও শিশুকে তার ন্যায্য ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করা আইনসম্মত নয়।
রায় প্রসঙ্গে মামলার রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “আমার মতে এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও যথাযথ ভরণপোষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের পরিবর্তন হলেও সন্তানের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা মা-বাবা উভয়ের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব।









