শ্রাবণের আকাশে মেঘের ঘনঘটা। কখনও ঝুম বৃষ্টি, কখনও আবার মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীল আকাশ। প্রকৃতির এমনই নানা রূপ গান ও নৃত্যের ছন্দ ধারণ করে উদযাপিত হলো বর্ষামঙ্গল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ষার গান, দলগত সংগীত আর নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রাজধানীর ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) তৈরি হয় ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক আবহ। ‘রবিরাগ’র বর্ষামঙ্গল উদযাপনের পুরো আয়োজনজুড়ে যেন মঞ্চে বারবার ফিরে আসে শ্রাবণের মেঘ-বৃষ্টি, উচ্ছ্বাস, বিষণ্নতা আর বিরহ।
অনুষ্ঠানের শুরু হয় দলগত সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে একের পর এক রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশিত হতে থাকে। শুরুতেই শোনা যায় ‘বিশ্বভুবনরে বিশ্বজন মোহিছে, বর্ষামানিক দিয়ে গাঁথা’ এবং ‘ঝর ঝর বরিষে বারিধারা’।
গানের পর মঞ্চজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নৃত্যের ছন্দ। ‘ওই আসে ওই অতি’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। নৃত্যের ছন্দে ফুটে ওঠে বর্ষার উচ্ছ্বাস, প্রকৃতির পরিবর্তন আর বৃষ্টির আনন্দ।
এরপর দলগত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘নীল নবঘনে/ধরণীর গগনের’। গানের সঙ্গে মঞ্চে তৈরি হয় মেঘমেদুর বর্ষার আবহ। এরপর ‘কোন পুরাতন প্রাণের টানে’ গানটি পরিবেশন করেন নিরুপমা ও লিপিকা।
একক পরিবেশনাতেও ছিল বৈচিত্র্য। ‘আবার এসেছে আষাঢ়’ গানটি পরিবেশন করেন তপন। এরপর সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘আষাঢ় কোথা হতে আজ’। ‘ওই মালতী লতা দোলে’ গানটির সঙ্গে তপন ও তন্ময়ী পরিবেশন করেন সংগীত।
গান আর নৃত্যের এই ধারাবাহিকতায় বর্ষার নানা অনুভূতি একে একে উঠে আসে মঞ্চে। ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। এরপর শামা আলীর কণ্ঠে শোনা যায় ‘সখী আঁধারে’। ‘আজ ঝরঝর মুখর’ গানটি পরিবেশন করেন নাজনীন ও চন্দন দে।
সম্মিলিত সংগীত পরিবেশনাতেও ছিল বেশ কয়েকটি পরিচিত রবীন্দ্রসংগীত। ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জ ছায়ায়’ এবং ‘আজি বরিষণ মুখরিত’ গান দুটি শিল্পীরা পরিবেশন করেন সম্মিলিতভাবে। ‘আমি শ্রাবণ আকাশে ওই’ গানটি পরিবেশন করেন সন্ধ্যা ভট্টাচার্য।
বর্ষার উচ্ছ্বাস ও ছন্দকে নৃত্যে আরও স্পষ্ট করে তোলে ‘বিপুল তরঙ্গরে’ এবং ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ গানগুলোর পরিবেশনা। এর সঙ্গে ছিল ‘তপের তাপের বাঁধন কাটুক’ এবং ‘আজি গোধূলিলগ্নে এই বাদল’ দুটি ভিন্ন আবহের গানও।
অনুষ্ঠানের পরের পর্বে দলগত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড’, ‘আজি বরিষণ মুখরিত’ এবং ‘এসো শ্যামল সুন্দর/শ্যামল ছায়া’। একক পরিবেশনায় ‘আমার দিন ফুরালো’ গানটি গেয়ে শোনান নিরুপম।
বর্ষার আনন্দের পাশাপাশি বিদায়, বিরহ আর আবেগের সুরও উঠে আসে পরিবেশনায়। রমার কণ্ঠে ‘যেতে দাও, গেল যারা’ এবং শ্রোতা/নীরের পরিবেশনায় ‘শ্রাবণ তুমি বাতাসে কার’ গান দুটি দর্শকদের নিয়ে যায় ভিন্ন এক অনুভূতির জগতে।
সবশেষে দলগত কণ্ঠে ‘যায় দিন শ্রাবণ দিন যায়’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বর্ষামঙ্গলের আয়োজন।
পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে গান ও নৃত্যের পাশাপাশি বর্ষার আনন্দ-বেদনা, মেঘ-বৃষ্টির রূপ আর ঋতুর পরিবর্তন যেন বারবার ফিরে আসে। কখনও ঝরঝর বৃষ্টির শব্দ হয়ে, কখনও মেঘলা আকাশের বিষণ্নতা হয়ে, আবার কখনও নৃত্যের দুরন্ত ছন্দে বর্ষাকে নানা রূপে অনুভব করেন দর্শকেরা।
অনুষ্ঠান শেষে রবি রাগের সদস্য শামা আলী বলেন, ‘আমরা গান শুনলাম, তার সামনে নাচ হলো। কী সুন্দর নৃত্য! নৃত্যাঞ্জলের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেছেন। শিল্পী সাদি মহম্মদ...উনি আছেন অসীম শূন্যে, দেখছেন আমাদের, ভালোবাসছেন আমাদের, আশীর্বাদ করছেন। আর আমরা শ্রাবণের গান গাচ্ছি। কী সুন্দর পরিবেশ! আপনারা শুনছেন, আপনারা এসেছেন। আবারও আসবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের পরিচালক আমিনা আহমেদ আপাকে আমরা স্মরণ করছি। উনি দেশের বাইরে আছেন। তারপরও তিনি সবকিছু দূরে থেকেও পরিচালনা করেছেন।’
পাশাপাশি প্রচারণার জন্য ৭১ টেলিভিশন ও বাংলা ট্রিবিউনকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এ সময় অনুষ্ঠানের পর্দার সামনের ও পেছনের কারিগরসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতিও ধন্যবাদ জানান শামা আলী।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যকে ধারণ করার এই আয়োজন তাই কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। গান ও নৃত্যের সম্মিলনে ‘রবিরাগ’র বর্ষামঙ্গল বর্ষার সঙ্গে দর্শকদের তৈরি করেছে এক ধরনের নান্দনিক সংযোগ।









