রিমান্ড শুনানি উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালেই আদালতে হাজির করা হয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে। তাকে রাখা হয় ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। দুপুর ১টা ৩মিনিটের দিকে তাকে কারাগার থেকে বের করা হয় এজলাসে তোলার জন্য।
এ সময় ডনের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট আর বুকে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। সংবাদকর্মী আর সালমান ভক্তদের ভিড় ঠেলে ১টা ১০ মিনিটের দিকে ডনকে নিয়ে এজলাসে পৌঁছান পুলিশ সদস্যরা।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তখন অন্য মামলার শুনানি করছিলেন। ডনকে আসামির কাঠগড়ায় রাখা হয়। তার মাথা থেকে হেলমেট, দুই হাতের হাতকড়া খুলে এক হাতে দিয়ে কাঠগড়ার সঙ্গে আটকে রাখা হয়। তবে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তখনো গায়ে ছিল। এজলাসের সামনে সালমান ভক্তরা স্লোগান দিতে থাকেন বিচার চেয়ে। ‘ডনের রিমান্ড চায়, ফাঁসি চায়।’ পরে পুলিশ সদস্যরা তাদের নিবৃত্ত করেন।
কিছুক্ষণ পর বিচারক জুয়েল রানা বিরতিতে যান। এ সময় আইনজীবীদের সাথে কথা বলেন ডন। কয়েকজন আইনজীবীকে ডনের ছবি তুলতেও দেখা যায়। সাধারণ পাবলিকরাও চান ডনের ছবি তুলতে। তবে পুলিশের বাধায় তা আর হয়ে ওঠেনি।
কালো ছাপা শার্ট, সাদা পাজাম আর হলুদ জুতো পরিহিত ডন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন নিজস্ব স্টাইলে। এ সময় তাকে ঘামতে দেখা যায়।
১টা ২০মিনিটের দিকে বিচারক জুয়েল রানা এজলাসে ওঠেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুকী ফারুকী সর্বোচ্চ রিমান্ডের প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, ‘সালমান শাহর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলা করায় সালমান শাহর পরিবারকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় ফরহাদ ওরফে রেজভী নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। রেজভী ওই মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেই স্বীকারোক্তিতে কীভাবে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়, কে কে হত্যায় অংশ নেয়, কত টাকায় হত্যা করা হয় তা উঠে আসে। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ আসামি গত ৯ অগাস্ট পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেফতার হন।’
রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, ‘৩০ বছর আগে একজন জনপ্রিয় নায়ককে হত্যা করা হয়। এরপর অনেক নায়ক, অভিনেতা আসছেন, কিন্তু সালমান শাহর গান, সিনেমা এখনো এখনকার প্রজন্ম দেখে। যুগ যুগ ধরে এখনো মানুষের হৃদয়ে সালমান রয়েছে। মামলাটা নিয়ে জাতি উদ্বিগ্ন। রহস্য বের হয়ে আসুক।’
এরপর বাদীপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনও রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
ডনের পক্ষে ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ও অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করেন।
অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডন ওমরার জন্য সৌদি আরব যাচ্ছিলেন। বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। আর তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। আর রেজভী যখন গ্রেফতার ছিল তখন কিন্তু এই তদন্ত সংস্থা সিআইডি মামলার তদন্ত করেছিল। তখন সিআইডি জানিয়েছিল, রেজভী কিছু জানে না। বহু ঘটনা আছে। থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ, সিআইডি পুলিশ, এমনকি বিচার বিভাগীয় তদন্তও হয়। সবশেষ তদন্ত করে পিবিআই। সবার প্রতিবেদনে উঠে আসে, আত্মহত্যা। তার গলায় অর্ধচন্দ্রাকার দাগ আছে। আঘাতের চিহ্ন নেই।’
তিনি বলেন, ‘ডন সালমান শাহর কাছের বন্ধু, সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে কিন্তু তিনি পালিয়ে যেতেন। রিমান্ডের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। রিমান্ড বাতিল করে প্রয়োজনে তাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।’
অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আলোচিত মামলা, আলোচিত নায়ক। ভিলেনও আলোচিত হতে হবে। এই ভিলেনের কারণেই কিন্তু তিনি সালমান শাহ হয়েছিলেন। ডন ভিলেনের রোল প্লে না করলে সালমান শাহ হতে পারতো। আর যদি হত্যাকাণ্ড হয়, তাহলে হত্যাকাণ্ডকে যারা আত্মহত্যা বলে চালিয়েছে, তাদের সবাইকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। তারপর ডনকে রিমান্ডে নিতে হবে। এ অবস্থায় আসামির রিমান্ড আবেদন নাকচ করে তাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের প্রার্থনা করছি।’
উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক বলেন, ‘একটা মানুষ মারা গেলো, একটা মার্ডার কেস রেকর্ড হতে পারে না?’
পরে আদালত ডনের ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
এরপর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সালমান ভক্তরা ডনের ফাঁসির দাবি জানান। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চায়, ডনের ফাঁসি চায়’- এমন স্লোগান দিতে থাকেন সালমান ভক্তরা। পরে দ্রুততার সঙ্গে ডনকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডনকে হাজির করা হবে জেনে সকাল থেকেই সালমান ভক্তরা আদালতপাড়ায় জড়ো হতে থাকেন।
গত ৯ অগাস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। গত ১২ অগাস্ট ঢাকার সিএমএম আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর মঙ্গলবার মহানগর দায়রা জজ আদালতও তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দেন।
এরই মাঝে গত ২০ অগাস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান তিন কারণ দেখিয়ে ডনের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন বৃহস্পতিবার।
গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি।
তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেয় আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন।
সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
মামলাটি এরপর তদন্ত করে র্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।
তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনও প্রমাণ মেলেনি।
পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ আর স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নিলুফা চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেই অভিমানী সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট নন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে তিনি আরও তদন্ত চান।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়।
২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে আর রিভিশন শুনানি হয়নি।
গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় তার মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে আদালত। এ বিষয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।
এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগশাজসে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ্কে হত্যা করেছে বলে মামলায় অভিযোগ করেন মোহাম্মদ আলমগীর।









