র‌্যাব বিলুপ্ত নাকি নাম-মোড়ক বদল? 

জামাল উদ্দিন
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০০

বিরোধী দলের আপত্তির মাঝে সংসদে পাস হয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’। সরকারের ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। কিন্তু আইনটির কাঠামো এবং নতুন বাহিনীর জনবল ও কার্যপরিধি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—র‌্যাব সত্যিই কি বিলুপ্ত হচ্ছে, নাকি শুধু নাম ও মোড়ক বদলাচ্ছে?

মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ বলছেন, নতুন আইনে র‌্যাবের পুরোনো কাঠামোর প্রায় সব কিছুই থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থায়ী ধরনের বিশেষ বাহিনী গঠনের ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

সরকার অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি, র‌্যাব ও এসআরবি সম্পূর্ণ আলাদা বাহিনী। র‌্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও সম্পদ এসআরবিকে দেওয়া হলেও সেটি করা হবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঠেকাতে।

নতুন মোড়কে পুরোনো বাহিনী

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।’’ তিনি বলেন, “এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কথিত ‘ক্রসফায়ার’, গুমসহ বিভিন্ন ধরনের বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শুধু গুম ও ক্রসফায়ারই নয়—আইনবহির্ভূত আরও নানা কর্মকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও বিভিন্ন সময়ে আমরা পেয়েছি। এ কারণে মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন, মানবাধিকার সুরক্ষার স্বার্থে এই বাহিনী বিলুপ্ত করার বিকল্প নেই।”

কিন্তু র‌্যাবের জায়গায় যে এসআরবি আসছে, তার কাঠামো নিয়ে আপত্তি নূর খানের। তিনি বলেন, ‘‘সম্প্রতি আমরা দেখলাম সংসদে র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি নামে নতুন একটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু র‌্যাবের মতো এই বাহিনীতেও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা থাকছেন। ফলে বাস্তবে আমরা নতুন মোড়কে পুরোনো বাহিনীরই একটি সংস্করণ দেখতে পাচ্ছি।’’

নূর খান লিটনের মতে, এর মধ্য দিয়ে বিশেষ বাহিনীনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পুরোনো জিনিসটাই বহাল রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘‘দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার বিশেষ ধরনের বাহিনী নির্ভরতার বিকল্প চিন্তা করতে পারছে না। অথচ এসআরবির মতো আরেকটি বিশেষ বাহিনী গঠন না করে প্রয়োজন হলে পুলিশের মধ্যেই বিশেষায়িত ইউনিট তৈরি করা যেত। পুলিশ সদস্যদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে সজ্জিত করা যেত।’’

‘‘পুলিশের কাজ আর সামরিক বাহিনীর কাজ এক নয়’’

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম প্রশ্ন তুলেছেন আরও মৌলিক জায়গায়। তার বক্তব্য, পুলিশিং এবং সামরিক বাহিনীর কাজের দর্শন ও প্রশিক্ষণই আলাদা।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রথমত, পুলিশের কাজ হচ্ছে একটি বেসামরিক কাজ। পুলিশ যাদের সঙ্গে কাজ করে, সে অপরাধী হোক বা সাধারণ মানুষ হোক, সে এই দেশেরই নাগরিক, শত্রু নয়। পুলিশের কাজ হলো—অপরাধ শনাক্ত করা, অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা এবং ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের মাধ্যমে তাকে সংশোধন করে সমাজে ফিরিয়ে আনা। তাকে মেরে ফেলা নয়। এটাই পুলিশের মৌলিক ম্যান্ডেট।’’

ক্রিমিনাল জাস্টিস ব্যবস্থার কাঠামো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘প্রথমে পুলিশ, এরপর আদালত এবং তারপর কারাগার। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলেই কাজ করে। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো—অপরাধীকে চিহ্নিত করা, তার বিচার নিশ্চিত করা এবং সংশোধনের মাধ্যমে তাকে আবার সমাজে ফিরিয়ে আনা।’’

অপরদিকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাজের প্রকৃতি ভিন্ন উল্লেখ করে বাহারুল আলম বলেন, ‘‘সেনাবাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাজ হচ্ছে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, প্রয়োজন হলে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করা বা বন্দি করা। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দায়িত্ব।’’

তার ভাষায়, এক ধরনের দায়িত্বের জন্য প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়মিতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দায়িত্বে ব্যবহার করলে সংকট তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘‘এক ধরনের কাজের জন্য যাদের তৈরি ও প্রশিক্ষিত করা হয়েছে, তাদের দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কাজ করানো হলে সমস্যার সৃষ্টি হয়।’’

‘‘একই ভুল আবারও করা হচ্ছে’’

র‌্যাবের শুরুর সময়কার অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন সাবেক এই আইজিপি। তিনি বলেন, ‘‘তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর। তারা যা করেছে, তখন মানুষ খুব প্রশংসা করেছে, মিষ্টি খেয়েছে। কিন্তু এটাও তো ভুল। কেউ একজন যত বড় ক্রিমিনালই হোক, আপনি তাকে বিচারবহির্ভূত হত্যা করে ফেললেন, আর মানুষ উল্লাস করলো। এটা কি ন্যায়বিচার হলো?’’

এসআরবির কাঠামোয় সামরিক বাহিনীর সদস্য রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি তার। বাহারুল আলম বলেন, ‘‘এখন আর্মির লোকজনকে দিয়ে পুলিশিং করানোই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বোকামি। আমি বলবো, জিনিসটা কী সেটা না বুঝে তাদের দিয়ে পুলিশিং করানো হয়েছে। এখন এসআরবি রাখা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, সেখানে আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স থেকেও সদস্য আসবেন। তাহলে একই ভুল, একই বোকামি আবারও করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’’

মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব ও সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘‘যিনি ওই ট্রেনিংটা পেয়েছেন, তাকে আপনি সিভিলিয়ান কাজে দিয়ে বলবেন, আপনি হিউম্যান রাইটস আপহোল্ড করেন। এটা একটা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।’’

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হলে সেনাবাহিনীকে সাময়িকভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি বাহারুল আলম। তিনি বলেন, ‘‘যদি ল অ্যান্ড অর্ডারের সিরিয়াস অবনতি ঘটে, যেখানে পুলিশ ফেল করে, তখন আপনি আর্মিকে কল ইন করতে পারেন পরিস্থিতি স্ট্যাবল করার জন্য।’’

৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘পুলিশ চলে গেছে, পুলিশ ফেল করেছে। তখন ন্যাচারালি সমাজে আর্মিকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। আপনারা স্ট্যাবিলিটি এস্টাবলিশ করেন। এরপর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তারা আস্তে আস্তে চলে যাবে, পুলিশ নিজেকে রি-এস্টাবলিশ করবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আপনি রেগুলার, সারা বছরের জন্য আর্মিকে দিয়ে পুলিশিং করাবেন, এটা হয় না। এটা বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ভুল,’’ বলেন সাবেক আইজিপি।

জাতীয় সংসদে রুমিন ফারহানা বলেছেন, র‍্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা থেকে জাতিসংঘ পর্যন্ত র‍্যাবের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। র‍্যাবের পরিবর্তে যে নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে, সেটি যেন কেবল পোশাক পরিবর্তনের মতো নাম পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ না থাকে।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘‘র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল সর্বজনীন। কিন্তু একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কেউ করেনি।’’ তার অভিযোগ, জনবল, স্থাপনা ও লজিস্টিক প্রায় একই রেখে শুধু নাম বদলানো হচ্ছে। তিনি বিলটি প্রত্যাহার করে আরও বিস্তৃত পরামর্শের দাবি জানিয়েছেন।

‘‘র‌্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনও সংস্পর্শ নেই’’

এদিকে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিলটি নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘র‌্যাব বিলুপ্ত করা সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকারের অংশ।’’ তিনি বলেন, ‘‘র‍্যাব বিলুপ্ত করা আমাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল এবং সব পক্ষেরও দাবি ছিল। বিলটি যত বিলম্বিত হবে, ততদিন র‍্যাবের অস্তিত্ব থেকে যাবে। আমরা সেই কারণেই র‍্যাব বিলুপ্ত করছি।’’

এসআরবি র‌্যাবের নতুন নাম, এমন অভিযোগও নাকচ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংসদে তিনি বলেছেন, ‘‘র‍্যাব আমরা বিলুপ্ত করছি। আইন পাস হওয়ার পর নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে, যার নাম হবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। র‍্যাবের সঙ্গে এর কোনও সংস্পর্শ নেই; এটি নতুনভাবে গঠিত একটি বাহিনী।’’

র‌্যাবের অস্ত্র, ইক্যুইপমেন্ট ও গোয়েন্দা সরঞ্জামসহ সম্পদ এসআরবিতে ব্যবহারের যুক্তিও দিয়েছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘র‍্যাবের অস্ত্র, ইক্যুইপমেন্ট, ইন্টেলিজেন্স সরঞ্জামসহ সব সম্পদ রাষ্ট্রের। এগুলো তো ফেলে দেওয়া বা নিলামে তুলে দেওয়া যায় না। নতুন সংস্থা গঠন হলে নতুন করে প্রকিউরমেন্ট না করে রাষ্ট্রের বিদ্যমান সম্পদই সেখানে ব্যবহার করা হবে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ও হবে না।’’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গেন্ডারিয়ায় গোলাগুলির ঘটনায় গ্রেফতার আরও ৫, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার
র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি বিল সংসদে পাস
সংসদে উঠছে এসআরবি বিল, র‌্যাবের দক্ষ জনবল কাজে লাগানোর সুপারিশ
সর্বশেষ খবর
সীমান্তে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ হয়ে ফিরলো বিএসএফ
সীমান্তে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ হয়ে ফিরলো বিএসএফ
ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোদির বৈঠক
ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোদির বৈঠক
স্ত্রীকে মৃত ঘোষণা করতেই পালালেন স্বামী, আটক করে পুলিশে দিলো স্থানীয়রা
স্ত্রীকে মৃত ঘোষণা করতেই পালালেন স্বামী, আটক করে পুলিশে দিলো স্থানীয়রা
পত্রিকার ব্যুরো অফিস থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির লাশ উদ্ধার
পত্রিকার ব্যুরো অফিস থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির লাশ উদ্ধার
সর্বাধিক পঠিত
এক ভবন থেকে ৭০ বিদেশি নাগরিক আটক, কী করছিলেন তারা
এক ভবন থেকে ৭০ বিদেশি নাগরিক আটক, কী করছিলেন তারা
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা? 
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা? 
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
মঈন খান ও সালাহউদ্দিন আহমদের দায়িত্ব বাড়লো 
স্বর্ণের দামে বড় পতন
স্বর্ণের দামে বড় পতন
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ
সেই ভবন ভাড়া নিয়ে কী করছিলেন ৬৩ বিদেশি নাগরিক, যা জানালো পুলিশ