জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডকে ‘অপরাধের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ দাবি করে তা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করার আবেদন করা হয়েছে। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায়ে যেসব অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেসব খালাসের আদেশও বাতিল করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভুক্তভোগীদের জন্য দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তির মোট মূল্য সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এ আপিল আবেদন জানানো হয়। পরে আপিল দায়েরের বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
প্রসিকিউটর তামিম জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে কোনও আপিল করতে গেলে তা রায় পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা আপিলটি করেছি। জাসদ সভাপতি ইনুকে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের সাজা আমরা অপর্যাপ্ত মনে করেছি। এ কারণে আমরা ১১টি গ্রাউন্ডের ভিত্তিতে ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে তার সর্বোচ্চ শাস্তির প্রার্থনা করেছি। এছাড়া যেসব অভিযোগে তিনি খালাস পেয়েছেন, সেগুলোতেও যেন একই সাজা দেওয়া হয়।
গ্রাউন্ডগুলোতে যা বলা হয়েছে
আপিলের প্রথম গ্রাউন্ডে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনও ব্যক্তিকে ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করলে মৃত্যুদণ্ডই মূল দণ্ড এবং অপর কোনও ধরনের কারাদণ্ড অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যতিক্রমী সাজা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ যুক্তিতে অভিযোগ নম্বর ৩, ৬ ও ৭-এ দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডকে আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগে দেওয়া সাজা বাতিল করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। একইসঙ্গে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশও বাড়িয়ে দণ্ডিত ব্যক্তির সব সম্পত্তির মোট মূল্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অপরদিকে অভিযোগ নম্বর ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ থেকে দেওয়া খালাসের আদেশও বাতিলের আবেদন করা হয়েছে। আপিলকারীর দাবি, এসব অভিযোগেও আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।
আপিলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রাউন্ডে আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক বিচারিক নীতির উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অপরাধ সংঘটনে নেতৃত্বদানকারীদের অপরাধমূলক দায় অনুসারীদের তুলনায় বেশি।
বিশেষ করে বেসামরিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে ‘সুপেরিয়র রেসপন্সসিবিলিটি’-এর বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আপিলে দাবি করা হয়েছে, একজন বেসামরিক বা রাজনৈতিক নেতার দেওয়া নির্দেশ বা আদেশ অনেক ক্ষেত্রে সামরিক কর্মকর্তার আদেশের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে থাকে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বেসামরিক বা রাজনৈতিক নেতারা সরাসরি অপরাধ সংঘটনে অংশ না নিলেও তাদের অধস্তনদের ওপর কর্তৃত্ব ও প্রভাব অপরাধ সংঘটনের পরিবেশ তৈরি এবং তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নেতৃত্বের অবস্থান, অনুসারীদের ওপর প্রভাব এবং বিশেষ মর্যাদার কারণে এ ধরনের দায়ের ক্ষেত্রে কঠোর সাজা প্রযোজ্য বলে আপিলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ গ্রাউন্ডে সরাসরি ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(২)- ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপিলে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে কোনও ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার পর ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডই প্রাথমিক বা সর্বোচ্চ দণ্ড হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত এবং তা থেকে সরে আসতে হলে অত্যন্ত জোরালো প্রশমনকারী পরিস্থিতি থাকতে হবে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট রায়ে এমন পরিস্থিতি যথাযথভাবে চিহ্নিত বা ব্যাখ্যা করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে আপিলে জোর দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ গ্রাউন্ডে অভিযোগগুলোর প্রকৃতি এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আপিলে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক বা সিস্টেমেটিক অ্যাটাকের বিষয় জড়িত। নথিতে থাকা মৌখিক, নথি ও প্রযুক্তিগত সাক্ষ্য এবং প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের সাক্ষ্য আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অপরাধের ন্যাক্কারজনক পদ্ধতি, ব্যাপকতা এবং বেসামরিক জনগণের ওপর হামলার মাত্রা বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডই উপযুক্ত ছিল বলে আপিলে দাবি করা হয়েছে।
দশম গ্রাউন্ডে জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আপিলে অভিযোগ করা হয়েছে, অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে দণ্ডিত ব্যক্তি বহু মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী হয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ওই সময়ে এক ধরনের সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা অসহায় ছিলেন এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু করে অত্যন্ত বর্বর ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে— এমন বক্তব্যও রয়েছে আপিলে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের কাছ থেকে সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কার্যকর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
নবম গ্রাউন্ডে সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুতরতা ও অপরাধীর দায়ের মাত্রার সঙ্গে শাস্তির সামঞ্জস্যের নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আপিলে বলা হয়েছে, ১০ বছরের সাজা দেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনাল অপরাধের ভয়াবহতা এবং অপরাধীর দায়ের মাত্রার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বিবেচনা করেনি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে ‘নিষ্ঠুর, ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত’ প্রভৃতি হিসেবে বর্ণনা করে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার উপযুক্ত মামলা বলে দাবি করা হয়েছে। এ গ্রাউন্ডেই অভিযোগ ১, ২, ৪, ৫ ও ৮-এ দেওয়া খালাসের আদেশও বাতিলের আবেদন করা হয়েছে।
একাদশ গ্রাউন্ডে প্রসিকিউশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো— ট্রাইব্যুনালের প্রমাণ মূল্যায়ন ও উত্থাপিত প্রমাণাদির সঙ্গে চূড়ান্ত সাজা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আপিলে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উত্থাপিত প্রমাণাদির গ্রহণ করলেও সেই মূল্যায়নের প্রতিফলন সাজা নির্ধারণে দেখা যায়নি। অর্থাৎ, যেসব প্রমাণ ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অভিযোগের বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, তার তুলনায় আসামিকে দেওয়া ১০ বছরের সাজা অত্যন্ত কম এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আপিলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রার্থনা হলো ‘ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ’। এতে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে দণ্ডিত ব্যক্তির সমস্ত সম্পত্তির মোট মূল্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ‘‘গ্রাউন্ডগুলোতে আমরা বলেছি যে, একটি আদালতের কোনও মামলায় শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরাধের ভয়াবহতা বা গভীরতা দেখতে হয়। অর্থাৎ অপরাধী কী পরিমাণ মানুষের ওপর এই গণহত্যা চালিয়েছে, কী পরিমাণ মানুষ নিহত-আহত হয়েছেন, ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন— সেসবও আমরা দেখিয়েছি। কিন্তু সাজার ক্ষেত্রে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ থেকে সামঞ্জস্যহীন হয়েছে। এ কারণে আমরা আপিল করেছি।’’