সড়কে মৃত্যুর মিছিল: ১৩ বছরে ঝরেছে সোয়া লাখ প্রাণ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৭ আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৭

দেশে গত ১৩ বছরে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির অভিযোগ, দূরদর্শী পরিবহন পরিকল্পনার অভাব, রেল ও নৌপথের ব্যবহার সংকুচিত করা এবং সড়কনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে বুধবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব কথা বলেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ, দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এই দুই মাধ্যমে ৮০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করতেন। সড়ক ব্যবহার করতেন মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ। তখন সড়ক দুর্ঘটনার হারও ছিল ২০ শতাংশের মধ্যে।

মোজাম্মেল হক চৌধুরীর অভিযোগ, স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার ঋণনির্ভর উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোতে দুর্নীতি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং রেল ও নৌপথ সংকুচিত করার প্রবণতা বেড়েছে। বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে একের পর এক সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর করা হয়েছে। সরকারের দুর্নীতি ও ভুলনীতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ জন্য সড়কে প্রাণহানির দায় অতীতের সব সরকারকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন সংগঠনটির মহাসচিব।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সড়ক খাতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতি, অযোগ্য যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়া এবং অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার মতো সমস্যা। প্রশিক্ষণহীন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে যানবাহন তুলে দেওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করে সংগঠনটি।

সংগঠনটির দাবি, তাদের পর্যবেক্ষণে পাওয়া হতাহতদের এই সংখ্যা মূলত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, প্রকৃত হতাহত মানুষের সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। একই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন চলমান যুদ্ধে যত মানুষ নিহত হয়েছেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা তার চেয়ে বেশি বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

সড়কে চাপ বাড়লেও বাড়েনি গণপরিবহন

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে এগোলেও পরিবহন খাতে দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে নিরাপদ নৌপথ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়েনি। বরং সড়ক সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বাড়লেও সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সড়কের ওপর একচেটিয়া চাপ তৈরি হয়েছে। সেই তুলনায় গণপরিবহনের বড় ব্যবস্থা বা ম্যাস ট্রানজিট বাড়েনি, গড়ে ওঠেনি নির্দিষ্ট বাস নেটওয়ার্কও।

উন্নত গণপরিবহনের অভাবে প্রতিদিনের যাতায়াতে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে মনে করে সংগঠনটি। এই সংকটের সুযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি নসিমন-করিমন, প্রতিবেশী দেশে তৈরি মাহিন্দ্রা ও পিয়াজিও এবং পিকআপভ্যানকে লেগুনা হিসেবে ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন বেড়েছে। সংগঠনটির মতে, এসব কারণে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা বেড়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিরোধে ১০ সুপারিশ

সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে ছয়টি উল্লেখযোগ্য কারণ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এগুলো হলো মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া বৃদ্ধি ও অবাধ চলাচল; সড়কে মিডিয়ান বা বিভাজক না থাকা এবং গাছপালার কারণে অন্ধ বাঁক তৈরি হওয়া; মহাসড়ক ও যানবাহনের নির্মাণত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা; উল্টোপথে যানবাহন চালানো, চাঁদাবাজি ও পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন; অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন; এবং বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও বিরতি ছাড়া দীর্ঘ সময় যানবাহন চালানো।

দুর্ঘটনা কমাতে ১০ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) আমলাদের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক ও সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চালকদের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়া নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ, কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, মহাসড়কে পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন এবং মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন বাতিল, বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো এবং ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলার কথাও বলেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

/আইএ/ইউএস/
সম্পর্কিত
নাটোরে ১২ প্রাণহানি, বাস ও ট্রাকের অজ্ঞাতনামা চালকদের বিরুদ্ধে মামলা
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১৪ নয়, নিহত ১২: প্রশাসন
মিসরে পর্যটকবাহী বাসে ট্রাকের ধাক্কা, প্রাণ গেলো ১৩ জনের
সর্বশেষ খবর
অভিষেক সিনেমাতেই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে ইশা, কারণ জানালেন নিজেই
অভিষেক সিনেমাতেই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে ইশা, কারণ জানালেন নিজেই
গুগল ক্লাউডে বিভ্রাট, যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যাহত
গুগল ক্লাউডে বিভ্রাট, যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা ব্যাহত
অর্ধেক টাকা খরচের পর সাড়ে ৬ হাজার কোটির প্রকল্প বাতিল, এবার হবে মহাসড়ক
অর্ধেক টাকা খরচের পর সাড়ে ৬ হাজার কোটির প্রকল্প বাতিল, এবার হবে মহাসড়ক
ডেঙ্গুতে প্রাণ গেলো আরও ৭ জনের, হাসপাতালে ভর্তি ১৩৭৩
ডেঙ্গুতে প্রাণ গেলো আরও ৭ জনের, হাসপাতালে ভর্তি ১৩৭৩
সর্বাধিক পঠিত
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, দুইপক্ষ এক হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
পুলিশের সেই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে যা বললেন জামায়াত আমির
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে চেয়ে প্রত্যাহার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর
পে-স্কেল: বেতন-ভাতা নির্ধারণে প্রস্তুতি কতদূর
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান
স্থানীয় নির্বাচনে কেমন প্রার্থী বেছে নিতে হবে, সাফ জানিয়ে দিলেন তারেক রহমান