যে কাপড়ের মডেল বদলে দিয়েছিল হাজারো মায়ের ভাগ্য

জীবনযাপন ডেস্ক
৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫১আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৪

একসময় সন্তান জন্ম দেওয়া ছিল নারীদের জন্য জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মতো ফ্রান্সেও মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুহার ছিল উদ্বেগজনক। অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত ধাত্রীর অভাব এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞানের কারণে প্রসবকালীন জটিলতায় অসংখ্য মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটত।

এই সংকটের সময়ই ইতিহাসের পাতায় আবির্ভাব ঘটে এক অসাধারণ নারী আঞ্জেলিক মার্গারিট ল্য বুরসিয়ে দু কুদ্রের। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ধাত্রী, উদ্ভাবক এবং প্রশিক্ষক। তার লক্ষ্য ছিল শুধু প্রসব করানো নয়, বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করে অসংখ্য মায়ের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সেই লক্ষ্য থেকেই তিনি তৈরি করেন কাপড়, চামড়া ও তুলা দিয়ে নির্মিত একটি বাস্তবসম্মত নারীদেহ ও জরায়ুর মডেল। এটি ইতিহাসে ‘দ্য মেশিন’ নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রথম দিকের হাতে-কলমে ধাত্রীবিদ্যা শিক্ষার এই মডেলে একটি পুতুল ব্যবহার করা হতো, যার মাথা ঘোরানো যেত, মুখের গঠন ছিল বাস্তবসম্মত এবং বিভিন্ন দড়ি ও স্ট্র্যাপের সাহায্যে প্রসবের নানা জটিল পরিস্থিতি অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।

এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো পরিবেশে নিরাপদ প্রসবের কৌশল অনুশীলন করতে পারতেন। ফলে দক্ষ ধাত্রী তৈরির ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন।

ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃমৃত্যুর উচ্চহার কমাতে আঞ্জেলিক দু কুদ্রের ওপর বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেন। এরপর প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে তার উদ্ভাবিত প্রশিক্ষণ মডেল নিয়ে ফ্রান্সের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। এ সময় তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেন। তাদের বড় একটি অংশই ছিলেন গ্রামের সাধারণ নারী, যাদের অনেকেরই আগে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা শিক্ষা ছিল না।

শুধু প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। ১৭৭৩ সালে প্রকাশ করেন তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘আব্রেজে দ্য লার দে জাকুশমঁ’ বা ‘প্রসববিদ্যার সারসংক্ষেপ)’। বইটি ধাত্রীবিদ্যার জ্ঞানকে আরও সুসংগঠিত ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয় এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিকদের মতে, তার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির ফলে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ প্রসবের হার বৃদ্ধি পায় এবং মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। যদিও সে সময়ের পরিসংখ্যান সীমিত, তবুও চিকিৎসা ইতিহাসে আঞ্জেলিক দু কুদ্রের অবদানকে ধাত্রীবিদ্যার বিকাশে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইতিহাসের এই বিস্মৃত নারী কেবল একজন ধাত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন উদ্ভাবক, শিক্ষক এবং জনস্বাস্থ্য সংস্কারক। এমন এক সময়ে, যখন নারীদের সামাজিক ও পেশাগত পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন তিনি নিজের মেধা, সাহস এবং উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। আজও আঞ্জেলিক দু কুদ্রের গল্প স্মরণ করিয়ে দেয়—কখনও কখনও একটি সৃজনশীল ধারণা, একটি শিক্ষামূলক উদ্ভাবন এবং একজন মানুষের অদম্য প্রচেষ্টাই বদলে দিতে পারে হাজারো মানুষের জীবন।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত
২৬ দেশের অংশগ্রহণে চলছে বিশ্বমানের পাঠ
২৬ দেশের অংশগ্রহণে চলছে বিশ্বমানের পাঠ
তারেক রহমান বেশিদিন সরকার চালাতে পারবে না: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
তারেক রহমান বেশিদিন সরকার চালাতে পারবে না: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্বিতীয় আউটলেট চালু করলো ‘স্বপ্ন’
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দ্বিতীয় আউটলেট চালু করলো ‘স্বপ্ন’
সর্বাধিক পঠিত
বৈঠক করে যাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসএমএসে সুখবর দিলেন ট্রাম্পের দূত
বৈঠক করে যাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এসএমএসে সুখবর দিলেন ট্রাম্পের দূত
ডেভিড ইমনের কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার কার্ড আসলে কী, কোন কাজে লাগে
ডেভিড ইমনের কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার কার্ড আসলে কী, কোন কাজে লাগে
এক ডিআইজিসহ পুলিশের ৩ কর্মকর্তা বরখাস্ত
এক ডিআইজিসহ পুলিশের ৩ কর্মকর্তা বরখাস্ত
ডেভিড ইমনের কাছে মিলেছে ভারতের আধার কার্ড
ডেভিড ইমনের কাছে মিলেছে ভারতের আধার কার্ড
ফ্লাইট বাতিলে বাবা-ছেলেকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দুই এয়ারলাইন্সকে
ফ্লাইট বাতিলে বাবা-ছেলেকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দুই এয়ারলাইন্সকে