একসময় স্কুল মানেই ছিল কাঠের বেঞ্চ, কালো বোর্ড, চক-ধুলোর গন্ধ আর একটা ঘণ্টা। সেই ঘণ্টাটা কোথায় যেন আজ হারিয়ে গেছে।
ক্লাস চলার মাঝখানে হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ শোনা যেতো। ঘণ্টা বাজানোর মানুষটি এগিয়ে আসছেন। তার হাতে থাকা ঘণ্টার দিকে তখন কতো চোখ! ক্লাসের শেষ কয়েক মিনিট যেন আর কাটতেই চাইতো না। শিক্ষক পড়াচ্ছেন, আর শিক্ষার্থীদের কান অপেক্ষা করতো সেই কাঙ্ক্ষিত শব্দের জন্য—ঢং… ঢং… ঢং…
তারপর একসময় ঘণ্টা বাজতো। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতো পুরো স্কুলের দৃশ্য। কেউ বই-খাতা গুছিয়ে ফেলছে, কেউ দৌড়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে দরজার দিকে ছুটছে। মাঠ, বারান্দা, সিঁড়ি—সবকিছুই যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেতো।
আর সেই ঘণ্টা বাজানোর মানুষটিও ছিলেন স্কুলজীবনের এক পরিচিত চরিত্র। তিনি শিক্ষক নন, ক্লাসে পড়াতেন না। কিন্তু প্রতিদিন তার হাতে থাকা ঘণ্টার শব্দই যেন স্কুলের সময়কে ভাগ করে দিতো। কখন ক্লাস শুরু, কখন শেষ, আর কখন টিফিন সবকিছুর সঙ্গেই মিশে ছিল তার উপস্থিতি।
এখনকার স্কুলে সেই অপেক্ষার দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে অটোমেটিক বেল বাজে, কখনও আবার সাইরেনের মতো শব্দ হয়। সময় মেনে সবকিছুই চলছে, কিন্তু কোথায় যেন সেই মানুষটির জায়গাটা নেই।
প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে বেল বাজে, কেউ ভুলে যায় না, আলাদা করে কাউকে ঘণ্টা বাজানোর দায়িত্বও নিতে হয় না। কিন্তু স্কুলের ঘণ্টা তো শুধু সময় জানানোর শব্দ ছিল না, সেটি ছিল আনন্দের, অপেক্ষার আর মুক্তির শব্দ।
বিশেষ করে ছুটির ঘণ্টা। সেই শব্দ শুনে বই বন্ধ করার আনন্দ, ব্যাগ কাঁধে তোলার তাড়া, বন্ধুর সঙ্গে বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা এসবের কোনও অটোমেটিক বিকল্প হয় না।
আজকের শিশুরা হয়তো জানেই না, একটা ঘণ্টার শব্দের জন্য পুরো একটা ক্লাস কীভাবে অপেক্ষা করতো। তারা হয়তো জানে না, ঘণ্টা বাজানোর মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকা কতটা আনন্দের ছিল।
সময় বদলেছে। বদলেছে স্কুল। সেই সঙ্গে বদলে গেছে পড়ানোর ধরন। আর বদলেছে ঘণ্টাও। শুধু আমাদের স্মৃতিতে এখনও রয়ে গেছে কোথাও একটা পুরোনো স্কুলের বারান্দা। সেখানে একজন মানুষ হাতে ঘণ্টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ক্লাস শেষের অপেক্ষায় শত শত চোখ।
তারপর—
ঢং… ঢং… ঢং…
ছুটি হয়ে গেছে।








