বিয়ে পুরুষের জন্য ‘আশীর্বাদ’, নারীর জন্য কী?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৩আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৩

বিয়ের পর একজন পুরুষের জীবন অনেকটাই বদলে যেতে পারে। অসুস্থ হলে স্ত্রী ডাক্তার দেখানোর কথা মনে করিয়ে দেন, ওষুধ খেতে বলেন, খাবারের দিকে খেয়াল রাখেন। মন খারাপ হলে কথা বলেন, পারিবারিক ঝামেলা হলে সামলাতে সাহায্য করেন। অর্থাৎ একজন পুরুষ বিয়ের পর শুধু জীবনসঙ্গীই পান না, অনেক সময় এমন একজন মানুষও পান, যিনি তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নিয়মিত নজর রাখেন।

এ কারণেই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত পুরুষদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কিছু সূচক অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় ভালো হতে পারে। তাদের একাকীত্ব ও কিছু মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম দেখা যায়। এমনকি বিবাহিত পুরুষদের আয়ুও অনেক ক্ষেত্রে বেশি হয়। তবে এর মানে এই নয় যে বিয়ের জাদুতেই পুরুষরা সুস্থ হয়ে যান। বরং এর পেছনে সঙ্গীর যত্ন, মানসিক সমর্থন এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা সহায়তার বড় ভূমিকা থাকতে পারে।

তাহলে নারীরা কী পান?

প্রশ্নটা এখানেই। বিয়ে যদি পুরুষের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতায় এতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে নারীদের ক্ষেত্রে একই সুবিধা সবসময় দেখা যায় না কেন?

এর একটা ব্যাখ্যা হতে পারে, নারী ও পুরুষের সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার ধরন। ছোটবেলা থেকেই অনেক ছেলেকে শেখানো হয়, নিজের কষ্ট নিজেকেই সামলাতে হবে, দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না, বেশি আবেগ দেখানোও ঠিক নয়। ফলে বড় হওয়ার পর অনেক পুরুষের ঘনিষ্ঠ আবেগগত সম্পর্কের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে।

অপরদিকে নারীরা সাধারণত বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আবেগের জায়গাটা বেশি ধরে রাখেন। মন খারাপ হলে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন, সমস্যায় পরিবারের সাহায্য নেন, নিজেদের অনুভূতিও তুলনামূলক সহজে প্রকাশ করেন। ফলে বিয়ের পর একজন পুরুষের জীবনে স্ত্রী অনেক সময় তার প্রধান বা প্রায় একমাত্র আবেগগত আশ্রয় হয়ে ওঠেন।

একজনের জন্য যত্ন, অন্যজনের জন্য দায়িত্ব

সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন সম্পর্কের ভেতর এই যত্ন একমুখী হয়ে যায়। স্ত্রী স্বামীর শরীর-স্বাস্থ্য, মানসিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর দিকে খেয়াল রাখছেন; কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে একই ধরনের যত্ন পাচ্ছেন না।

ধরুন, স্বামী অসুস্থ হলে স্ত্রী তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলেন, ওষুধের সময় মনে করিয়ে দিলেন, খাবার তৈরি করে দিলেন। কিন্তু স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনিই যদি রান্না, সন্তান, সংসার কিংবা স্বামীর প্রয়োজনীয় কাজ সামলাতে থাকেন, তাহলে একই বিয়ে দুজনের জন্য একই অভিজ্ঞতা তৈরি করছে না।

একজন এখানে যত্ন পাচ্ছেন, অন্যজন যত্ন দেওয়ার পাশাপাশি নিজের দায়িত্বও পালন করছেন।

সংসারের অদৃশ্য কাজের হিসাব কে রাখেন?

বিয়েতে এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলোর কোনও দৃশ্যমান হিসাব থাকে না। সন্তানের স্কুলে কী লাগবে, কোন বিল কবে দিতে হবে, পরিবারের কার জন্মদিন কবে, কখন ডাক্তার দেখাতে হবে, ঘরে কী কী শেষ হয়ে এসেছে—এসব মনে রাখা, পরিকল্পনা করা এবং সময়মতো ব্যবস্থা করাও কাজ।

অনেক পরিবারে এই অদৃশ্য কাজের বড় অংশ নারীর ওপর পড়ে। বাইরে থেকে হয়তো দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করছেন, দুজনই সংসারে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু ঘরের কাজের পাশাপাশি সংসার কীভাবে চলবে, সেটার পরিকল্পনার ভার যদি একজনের ওপর থাকে, তাহলে তার ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হয়।

এই কারণেই শুধু কে কত ঘণ্টা অফিসে কাজ করছেন, সেই হিসাব দিয়ে দাম্পত্যে দায়িত্বের সমতা বোঝা যায় না। কে সংসারের সবকিছু মনে রাখছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে কি বিয়ে পুরুষদের জন্য বেশি লাভজনক?

এভাবে সরাসরি বললে বিষয়টা একটু বেশি সরলীকরণ হয়ে যায়। কারণ সব বিয়ে এক রকম নয়। কোনও সম্পর্ক দুজনের জন্যই নিরাপদ ও সহায়ক হতে পারে, আবার কোনো সম্পর্ক একজনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

বিয়ের সুবিধা অনেকটাই নির্ভর করে সম্পর্কের মান, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং দুজনের পারস্পরিক যত্নের ওপর। একজন পুরুষ যদি বিয়ের মাধ্যমে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, মানসিক সমর্থন এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি যত্ন পান, কিন্তু তার স্ত্রী একই সময়ে ঘরের কাজ, সন্তান, সম্পর্কের মানসিক চাপ এবং স্বামীর দেখাশোনার বড় অংশ একা সামলান, তাহলে একই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা দুজনের জন্য এক হবে না।

পুরুষের সব আবেগের দায়িত্ব কি স্ত্রীর?

দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ সম্পর্কের জন্য সম্ভবত এখানেই একটা পরিবর্তন দরকার। একজন পুরুষের সব আবেগগত প্রয়োজন যদি শুধু তার স্ত্রীর ওপর নির্ভর করে, তাহলে সম্পর্কের ওপর অদৃশ্য একটা চাপ তৈরি হয়।

বন্ধুত্বের মধ্যেও গভীর কথা বলা, নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা কিংবা প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া—এসব একজন মানুষের মানসিক জগতকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

তাহলে স্ত্রী তার একমাত্র মানসিক আশ্রয় হয়ে থাকেন না। বরং দুজন মানুষ নিজেদের আলাদা সম্পর্ক ও পরিচয় ধরে রেখেও একে অপরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হতে পারেন।

বিয়ে তখনই সুন্দর, যখন যত্নটা দুই দিকেই যায়

একটি সুস্থ দাম্পত্যে কে বেশি উপকার পেলেন, সেই হিসাব করাই হয়তো মূল কথা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুজনেই সম্পর্ক থেকে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা পাচ্ছেন কি না।

একজন যদি সবসময় অন্যজনের খেয়াল রাখেন আর বিনিময়ে নিজে শুধু দায়িত্ব পান, তাহলে সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে। আবার দুজনেই যদি একে অপরের স্বাস্থ্য, অনুভূতি, কাজ ও বিশ্রামের দিকে নজর রাখেন, তাহলে বিয়ে দুজনের জীবনকেই সহজ করতে পারে।

সেখানে স্বামী শুধু স্ত্রীর কাছ থেকে যত্ন নেবেন না, স্ত্রীরও খেয়াল রাখবেন। স্ত্রী শুধু স্বামীর মনের কথা বুঝবেন না, স্বামীও তার ক্লান্তি, চাপ ও প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করবেন।

আসল সমস্যা বিয়ে নয়, সম্পর্কের অসমতা

তাই ‘বিয়ে পুরুষদের বেশি উপকার করে’—এই প্রশ্নের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, কেন একই সম্পর্কের মধ্যে একজন বেশি যত্ন পান আর অন্যজন বেশি যত্ন দেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শুধু দাম্পত্যের দিকে তাকালে হবে না। দেখতে হবে ছোটবেলা থেকে ছেলে ও মেয়েদের কী শেখানো হচ্ছে, কে আবেগ প্রকাশ করতে শিখছে, কে নিজের যত্ন নিতে শিখছে এবং কে অন্যের যত্ন নেওয়াকে নিজের দায়িত্ব মনে করছে।

কারণ একজন পুরুষ যদি নিজের আবেগ সামলানো, স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া এবং অন্যের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে নিতে শেখেন, তাহলে তার স্ত্রীর ওপরও বাড়তি চাপ কমে।

একইভাবে একজন নারী যদি নিজের যত্ন, বিশ্রাম, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেন, তাহলে বিয়ের পর তার জীবনও শুধু অন্যদের দেখাশোনার মধ্যে আটকে থাকে না।

শেষ পর্যন্ত বিয়ে আশ্রয় হবে, নাকি বোঝা?

বিয়ে নিজে কাউকে সুখী বা অসুখী করে না। সম্পর্কের ভেতরে কী ঘটছে, সেটাই আসল।

যেখানে একজন মানুষ অসুস্থ হলে অন্যজন পাশে দাঁড়ান, মন খারাপ হলে কথা শোনেন, ঘরের কাজ ভাগ করে নেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একসঙ্গে নেন এবং দুজনেরই নিজের মতো থাকার জায়গা থাকে—সেই বিয়ে দুজনের জন্যই আশ্রয় হতে পারে।

কিন্তু যেখানে একজন সারাক্ষণ যত্ন দেন আর অন্যজন শুধু সেই যত্ন নেন, সেখানে বিয়ের সুবিধা সমানভাবে ভাগ হয় না।

তাই প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত ‘বিয়ে পুরুষের জন্য বেশি ভালো কি না’—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘আমরা এমন কীভাবে বিয়ে করতে পারি, যেখানে একজনের সুস্থতা আরেকজনের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না?’

কারণ ভালো দাম্পত্যে একজন শুধু ভালোবাসা পান না, ভালোবাসাও দেন। একজন শুধু যত্ন নেন না, যত্নও নেন। আর দুজনেই যেন বলতে পারেন—এই সম্পর্ক আমাকে আরও শক্তিশালী করছে, নিঃশেষ করে দিচ্ছে না।

/এম/ 
সম্পর্কিত
‘পুলিশে ধরেছে’—ফেসবুকে হাতকড়া পরা ছবির ট্রেন্ড কতটা বিপজ্জনক?
বাড়ছে লোডশেডিং, হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন?
প্রেম কি সত্যিই সারাজীবন টিকে থাকে?
সর্বশেষ খবর
ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের রায় সোমবার
ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের রায় সোমবার
সস্তা ফ্লাইট দিবস আজ
সস্তা ফ্লাইট দিবস আজ
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২০টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো উদ্বোধন
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২০টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো উদ্বোধন
অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেলেন পুলিশের ৫ কর্মকর্তা
অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেলেন পুলিশের ৫ কর্মকর্তা
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
ব্যক্তিগত যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার দাবি 
ব্যক্তিগত যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার দাবি