৫০ পেরিয়ে যে সত্যটা অনেকেই প্রথমবার বুঝতে পারেন

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৬আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৬

একই মানুষ, একই পরিবার, একই সম্পর্ক, একই জীবন। কিন্তু হঠাৎ একদিন মনে হতে পারে—সবকিছুকে যেন নতুন করে দেখছেন। যে বন্ধুত্ব এতদিন খুব কাছের মনে হয়েছে, সেটিই একসময় একতরফা বলে মনে হতে পারে। যে সম্পর্ককে ভালোবাসা ভেবেছেন, সেটার মধ্যে দায়িত্বের অংশটিই হয়তো বেশি ছিল। এমনকি নিজের নেওয়া পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোকেও নতুন করে বিচার করতে ইচ্ছা হতে পারে।

বয়স ৫০ বা ৬০ ঘরে পৌঁছালে অনেক মানুষের মধ্যেই এমন পরিবর্তন দেখা যায়। এটি সবসময় কথিত ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ নয়। বরং অনেকটা নিজের জীবন, সম্পর্ক আর চাওয়াগুলোকে নতুন চোখে দেখার একটা সময়। মনোবিজ্ঞানী ও লেখক ফার্ন শুমার চ্যাপম্যান একে বলেছেন ‘মধ্যজীবনের জাগরণ’। তার পর্যবেক্ষণ, এই সময়ে জীবনের ঘটনাগুলো হয়তো খুব একটা বদলায় না, কিন্তু সেসব ঘটনার অর্থ মানুষের কাছে বদলে যেতে পারে।

হঠাৎ এমন হয় কেন?

৫০ বা ৬০-এর দিকে এসে জীবনে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন একসঙ্গে আসতে পারে। বাবা-মা মারা যেতে পারেন, সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে যেতে পারেন, কর্মজীবনে আগের মতো গতি নাও থাকতে পারে। শরীরেও পরিবর্তন আসে।

এসব পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই পেছন ফিরে তাকান। কয়েক দশকের সম্পর্ক, দায়িত্ব, সাফল্য, ব্যর্থতা, আপস আর হতাশার দিকে এবার একটু দূর থেকে তাকানোর সুযোগ তৈরি হয়। যে বিষয়গুলো নিয়ে তরুণ বয়সে ব্যস্ততার কারণে ভাবার সময় ছিল না, সেগুলো তখন সামনে এসে দাঁড়ায়।

তখন প্রশ্ন জাগতে পারে—এতদিন আমি কী করলাম? কী পেলাম? আর এখন আসলে কী চাই?

সম্পর্কগুলোও তখন অন্যরকম লাগে

এই বয়সে এসে সম্পর্কের হিসাবও বদলে যেতে পারে। কোনও বন্ধুত্ব হয়তো এতদিন খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন মনে হতে পারে, সবসময় আমিই যোগাযোগ করছি, আমিই খোঁজ নিচ্ছি। সম্পর্কটা আসলে যতটা ভেবেছিলাম, ততটা পারস্পরিক নয়।

ভাই-বোনের সম্পর্ক, দাম্পত্য, সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু নিয়েই নতুন করে ভাবতে পারেন কেউ কেউ। এমনকি পরিবারের বহু পুরোনো কোনও গল্প বা বিশ্বাসও হঠাৎ আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য মনে নাও হতে পারে।

এর মানে অবশ্য এই নয় যে বয়স ৫০ পেরোলেই সবাই সম্পর্ক ছিন্ন করতে শুরু করবেন। বরং কে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, কোন সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করা দরকার আর কোথায় নিজের সীমারেখা তৈরি করা প্রয়োজন—এসব বিষয় পরিষ্কার হতে পারে।

‘সবাইকে খুশি’ রাখার ইচ্ছা কমে যায়

যৌবনে অনেকেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রাখেন। ঝামেলা এড়াতে চুপ থাকেন, অন্যের মন খারাপ হবে ভেবে নিজের কথা বলেন না, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দায়িত্ব নেন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ৫০ বা ৬০ বছরে পৌঁছে কেউ হয়তো আর প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে চান না। সবসময় অন্যকে খুশি রাখার জন্য নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেওয়ার আগ্রহও কমে যেতে পারে।

চ্যাপম্যানের ভাষায়, এই সময় অনেকে নিজের আবেগ ও শক্তি কোথায় খরচ করছেন, সেটাও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। ফলে ‘না’ বলা সহজ হতে পারে। প্রয়োজন হলে দূরত্ব তৈরি করাও স্বাভাবিক মনে হতে পারে।

এটা স্বার্থপর হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের জন্য কী প্রয়োজন, সেটা বুঝতে শেখার অংশও হতে পারে।

ভালোবাসা, দায়িত্ব আর ভয়—সব কি এক?

এই বয়সে এসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর উপলব্ধিগুলোর একটি হতে পারে নিজের পুরোনো সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তগুলোকে নতুন করে দেখা।

কেউ হয়তো এতদিন যেটাকে ভালোবাসা মনে করেছেন, পরে বুঝতে পারেন সেখানে দায়িত্বের ভূমিকা অনেক বেশি ছিল। যেটাকে আনুগত্য ভেবেছিলেন, সেটার পেছনে হয়তো ভয় কাজ করছিল। আবার যেটাকে সহানুভূতি মনে হয়েছিল, সেটি হয়তো অন্যের ভুল আচরণকে বারবার মেনে নেওয়া।

এমন উপলব্ধি সহজ নয়। কারণ এতে শুধু অন্য মানুষকে নয়, নিজেকেও নতুন করে দেখতে হয়।

তবে এই উপলব্ধিই অনেককে জীবনের বাকি সময়টা একটু বেশি সচেতনভাবে কাটানোর সুযোগ দিতে পারে।

পুরোনো কষ্টও ফিরে আসতে পারে

বয়স বাড়লে মানুষ শুধু সুখের স্মৃতি নিয়ে বসে থাকেন না। বহু বছর আগের কোনো ঘটনা, সম্পর্ক বা অপূর্ণতার কথাও নতুন করে মনে আসতে পারে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রবার্ট এন. বাটলার মানুষের জীবনের এই পর্যায়কে ‘লাইফ রিভিউ’ বা জীবন ফিরে দেখার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু পুরোনো দিনের কথা মনে করেন না; বরং নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে নতুনভাবে সাজিয়ে সেগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন।

 

ফলে পুরোনো কোনও কষ্টকে অন্যভাবে দেখা সম্ভব হয়। কোনো ভুলের জন্য নিজেকে ক্ষমা করা যায়। কারও প্রতি দীর্ঘদিনের রাগও হয়তো কিছুটা কমে আসে।

আবার এমন কিছু বিষয় মেনে নেওয়াও সম্ভব হয়, যেগুলো বদলানোর ক্ষমতা এখন আর নেই।

তখন প্রশ্নটা শুধু ‘আমি কী পেলাম?’ থাকে না

জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের সাফল্য মাপা হয় নিজের অর্জন দিয়ে—চাকরি, টাকা, বাড়ি, পরিবার, সামাজিক অবস্থান। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটা একটু বদলাতে পারে।

‘আমি কী অর্জন করেছি?’-এর পাশাপাশি সামনে আসে—‘আমি অন্যদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?’

মনোবিশ্লেষক এরিক এরিকসনের তত্ত্বে মধ্যজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘জেনারেটিভিটি’—অর্থাৎ নিজের বাইরে গিয়ে অন্য মানুষ, পরবর্তী প্রজন্ম বা সমাজের জন্য কিছু করার ইচ্ছা।

কাউকে শেখানো, পরামর্শ দেওয়া, নতুন প্রজন্মকে সাহায্য করা, সৃজনশীল কিছু করা কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো—এসব তখন জীবনে নতুন অর্থ তৈরি করতে পারে।

তখন সাফল্যের সংজ্ঞাটাও বদলে যেতে পারে।

সবকিছু ওলটপালট করতে হবে, এমন নয়

মধ্যজীবনের এই পরিবর্তনকে অনেক সময় ভুলভাবে দেখা হয়। যেন ৫০ পেরোলেই চাকরি ছেড়ে দিতে হবে, পুরোনো সম্পর্ক ভেঙে ফেলতে হবে কিংবা হঠাৎ একেবারে নতুন জীবন শুরু করতে হবে।

আসলে ব্যাপারটা এতটা নাটকীয় নয়।

অনেক সময় পরিবর্তনটা খুব ছোট। আগে যেখানে শুধু দায়িত্বের কারণে ‘হ্যাঁ’ বলতেন, এখন সেখানে ‘না’ বলতে পারেন। আগে যে সম্পর্ক নিয়ে সবসময় নিজেকে দোষ দিতেন, সেটাকে এবার একটু দূর থেকে দেখতে পারেন। কোনো সম্পর্ক ঠিক করার সুযোগ থাকলে সেটি ঠিক করার চেষ্টা করতে পারেন। আর যা বদলানো সম্ভব নয়, সেটি মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।

অর্থাৎ জীবন ভেঙে নতুন করে সাজানো নয়। বরং কোনটা রাখবেন, কোনটা বদলাবেন আর কোনটা ছেড়ে দেবেন—সেটা বুঝতে শেখা।

বয়স বাড়লে নিজের কাছে সৎ হওয়া কি সহজ হয়?

সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখানেই।

৫০ বা ৬০ বছরে এসে অনেকেই বুঝতে পারেন, সবার প্রত্যাশা পূরণ করার মতো সময় বা শক্তি সবসময় থাকবে না। ফলে অন্যরা কী ভাবছে, তার চেয়ে নিজের কাছে কোনটা সত্যি—সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেউ হয়তো নিজের জন্য একটু বেশি সময় রাখছেন। কেউ পুরোনো কোনো সম্পর্ক মেরামত করছেন। কেউ দীর্ঘদিনের কোনো অভ্যাস ছাড়ছেন। আবার কেউ এমন কোনো স্বপ্নের দিকে ফিরছেন, যেটা সংসার বা দায়িত্বের চাপে বহু বছর ধরে পিছিয়ে ছিল।

এটা বয়সের কাছে হার মেনে নেওয়া নয়। বরং জীবনের বাকি সময়টা কীভাবে কাটাতে চান, সেই সিদ্ধান্তে নিজের কথাটাকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

তাহলে ৫০-৬০ কি জীবনের শেষের শুরু?

বরং অনেকের জন্য এটা হতে পারে নিজের জীবনকে নতুন করে বোঝার শুরু।

এই বয়সে মানুষ অনেক কিছু হারান ঠিকই। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু পুরোনো ধারণা, ভয় আর অপ্রয়োজনীয় দায় থেকেও বেরিয়ে আসতে পারেন।

যে মানুষটি এতদিন শুধু দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি হয়তো প্রথমবার নিজের ইচ্ছার কথাও ভাবছেন। যে সম্পর্ককে শুধু ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, সেটার মান কেমন তা বুঝতে পারছেন। যে পুরোনো কষ্ট এতদিন বয়ে বেড়িয়েছেন, সেটাকে এবার মেনে নিয়ে নামিয়ে রাখার সাহসও হয়তো তৈরি হচ্ছে।

জীবনের ঘটনা হয়তো বদলায়নি। বদলেছে সেই ঘটনাগুলোর দিকে তাকানোর চোখ।

আর সেখানেই ৫০-৬০-এর এই ‘জাগরণ’-এর আসল অর্থ—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবন শেষ হয়ে যায় না; কখনো কখনো মানুষ এই বয়সেই প্রথমবার নিজের জীবনটাকে নিজের চোখে দেখতে শুরু করেন।

/এম/
সম্পর্কিত
আপনি ব্যথা পান, রং দেখেন, ভয় পান—কিন্তু কেন? উত্তরটা অবাক করবে
অগোছালো থাকাটাই নাকি ট্রেন্ড! সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কাইন্ডা চিক’
‘পুলিশে ধরেছে’—ফেসবুকে হাতকড়া পরা ছবির ট্রেন্ড কতটা বিপজ্জনক?
সর্বশেষ খবর
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্বস্তি ট্রাম্পের
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্বস্তি ট্রাম্পের
এবার শিক্ষক পরিবারকে হত্যার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো ডিবিকে
এবার শিক্ষক পরিবারকে হত্যার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলো ডিবিকে
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের
আপনি ব্যথা পান, রং দেখেন, ভয় পান—কিন্তু কেন? উত্তরটা অবাক করবে
আপনি ব্যথা পান, রং দেখেন, ভয় পান—কিন্তু কেন? উত্তরটা অবাক করবে
সর্বাধিক পঠিত
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
টাকার অভাব নেই, কমেছে সুদহার: তবু ঋণ নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা 
টাকার অভাব নেই, কমেছে সুদহার: তবু ঋণ নিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা 
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’