ফোন কি আপনার মেজাজ বুঝতে পারে?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৩আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৩

সকাল থেকে মনটা খারাপ। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বাইরে বের হওয়ার বদলে ঘরেই থাকতে ইচ্ছে করছে। এমনকি মোবাইল ফোনটাও হয়তো আগের চেয়ে বেশি সময় হাতে নিয়ে বসে আছেন।

এসব পরিবর্তন আপনি হয়তো খেয়ালই করছেন না। কিন্তু আপনার ফোনের কাছে এর কিছু তথ্য থেকে যেতে পারে।

কতবার ফোন খুলছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কতক্ষণ বাইরে থাকছেন, রাতে কখন ফোন ব্যবহার করছেন, কতটা নড়াচড়া করছেন কিংবা কোন ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করছেন—এসব আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করে মানুষের মানসিক অবস্থার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

অর্থাৎ, ফোন আপনার মনের কথা সরাসরি পড়ে ফেলতে পারে না। কিন্তু আপনার আচরণের ডিজিটাল ছাপ দেখে মেজাজের পরিবর্তন সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা সম্ভব। গবেষণার এই ক্ষেত্রকে বলা হয় ‘ডিজিটাল ফেনোটাইপিং’।

ফোন কীভাবে আপনার মেজাজের ইঙ্গিত পায়?

ফোনকে কোনও জাদুর যন্ত্র ভাবার সুযোগ নেই। বরং দিনের পর দিন আপনার আচরণে তৈরি হওয়া ছোট ছোট পরিবর্তনই গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, একজন মানুষ নিয়মিত বাইরে যান, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং সক্রিয় থাকেন। হঠাৎ কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি কম বাইরে যাচ্ছেন, বেশি সময় ঘরে থাকছেন, কম চলাফেরা করছেন এবং ঘুমের সময়ও এলোমেলো হয়ে গেছে।

এই পরিবর্তনগুলো একসঙ্গে দেখা গেলে তার মানসিক অবস্থায় কোনও পরিবর্তন এসেছে কিনা, তা নিয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

গবেষণায় তাই অবস্থান পরিবর্তন, চলাফেরা, ঘুমের ধরন, ফোন ব্যবহারের সময়, যোগাযোগ এবং অ্যাপ ব্যবহারের মতো বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

ফোন বেশি ব্যবহার করলেই কি মন খারাপ?

না। কেউ বেশি সময় ফোন ব্যবহার করছেন মানেই তিনি বিষণ্ন বা উদ্বিগ্ন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

একজন সাংবাদিক কাজের কারণে সারাদিন ফোনে ব্যস্ত থাকতে পারেন। আবার একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে অনলাইনে পড়াশোনার জন্য ফোন ব্যবহার করতে পারেন। দুজনের স্ক্রিন টাইম বেশি হলেও তাদের মানসিক অবস্থা খারাপ—এমনটা বলা যাবে না।

তাই গবেষকেরা সাধারণত একটি মাত্র তথ্যের ওপর নির্ভর করেন না। বরং অনেক ধরনের আচরণ একসঙ্গে দেখেন। পাশাপাশি একজন মানুষের স্বাভাবিক আচরণ কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মন খারাপ হলে মানুষ কি কম ঘোরাফেরা করেন?

এমন সম্পর্ক গবেষণায় পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় ৪০টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হালকা বিষণ্নতার সঙ্গে কম জায়গায় যাওয়া, কম শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুমের অনিয়ম এবং কিছু ক্ষেত্রে বেশি ফোন ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে।

২০২৬ সালের আরেকটি পর্যালোচনায় ৫২টি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাড়িতে বেশি সময় কাটানো, ঘুমের অনিয়ম এবং কম চলাফেরার মতো কিছু আচরণ বিষণ্নতার উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে

তবে ‘সম্পর্ক’ আর ‘কারণ’ এক নয়। কেউ কম বাইরে যাচ্ছেন বলে মন খারাপ হতে পারে, আবার মন খারাপ থাকার কারণেই তিনি বাইরে যেতে চাইছেন না—দুটোই সম্ভব।

আপনার ফোন কি বুঝতে পারে আপনি আগের চেয়ে খারাপ আছেন?

গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা এখানেই। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের স্মার্টফোনের বিভিন্ন আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ফোনের পর্দা ব্যবহারের ধরন, যোগাযোগ, অ্যাপ ব্যবহার, অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সংকেত হিসেবে উঠে আসে। গবেষণাটিতে বিষণ্নতার উপস্থিতি শনাক্তের ক্ষেত্রে প্রায় ৮২ শতাংশ নির্ভুলতা পাওয়া গেলেও গবেষকেরা এটিকে চিকিৎসাগত মূল্যায়নের বিকল্প হিসেবে দেখাননি।

অন্য একটি গবেষণায় ২১৭ জনের ফোন থেকে অবস্থান ও অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানেও কিছু সংকেত পাওয়া গেলেও এই পদ্ধতির সক্ষমতা এখনও সীমিত বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

অর্থাৎ, বিজ্ঞান এখনো বলছে না—‘ফোন আপনার মেজাজ জানে।’ বরং ফোনের তথ্য থেকে মেজাজের পরিবর্তনের সম্ভাব্য সংকেত খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

একজনের ফোন আরেকজনের মতো নয়

ধরা যাক, দুজন মানুষের ফোন ব্যবহারের ধরন একেবারেই আলাদা। একজন প্রতিদিন হাঁটতে বের হন, অন্যজন কাজের কারণে প্রায় সারাদিন ঘরে থাকেন। একজন নিয়মিত বন্ধুদের ফোন করেন, অন্যজন খুব কম কথা বলেন।

তাদের আচরণের পার্থক্য মানেই একজন ভালো আছেন আর অন্যজন খারাপ আছেন—এমনটা বলা যাবে না।

এ কারণেই ব্যক্তিভেদে আলাদা আচরণ বোঝার ওপরও গবেষকেরা জোর দিচ্ছেন। ১৮৩ জনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তির নিজস্ব আচরণগত ধরন বিবেচনায় নেওয়া হলে বিষণ্নতার মাত্রা অনুমানের ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।

অর্থাৎ, আপনার জন্য ‘স্বাভাবিক’ যা, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ফোন নয়, ঘুম আর চলাফেরাও গুরুত্বপূর্ণ

মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ধরতে শুধু স্ক্রিন টাইম দেখলেই হবে না।

ঘুমের ধরন, শারীরিক সক্রিয়তা, বাইরে যাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ৪৫৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, স্মার্টফোনের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্যের সঙ্গে মানুষের নিজের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি শনাক্ত করা যায় কি না। ফলাফল বলছে, শুধু ফোনের তথ্যের চেয়ে মানুষের নিজের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখলে মডেলের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

কারণ মানুষ নিজের অনুভূতি সম্পর্কে যে তথ্য দিতে পারেন, ফোনের সেন্সর সবসময় তা দিতে পারে না।

তাহলে কি একদিন ফোন নিজেই বলবে—‘আপনার মন খারাপ?

সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা মানুষের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক করতে পারে। ভবিষ্যতে কোনও অ্যাপ হয়তো বলতে পারে, আপনার ঘুমের ধরন বদলেছে, আপনি কম বাইরে যাচ্ছেন বা সামাজিক যোগাযোগ কমেছে—তাই নিজের মানসিক অবস্থার দিকে একটু নজর দিন।

তবে এখানেই বড় প্রশ্ন—গোপনীয়তা।

মানুষের চলাফেরা, যোগাযোগ, ঘুম কিংবা ফোন ব্যবহারের ধরন অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য। তাই এসব তথ্য কে সংগ্রহ করছে, কোথায় রাখছে, কে দেখতে পারছে এবং কী কাজে ব্যবহার করছে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনও প্রযুক্তি যদি বলে বসে ‘আপনি বিষণ্ন’, সেটিও বিপজ্জনক হতে পারে।

/এম/
সম্পর্কিত
স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণে এআইয়ের নতুন সাফল্য, চিকিৎসায় বাড়ছে সম্ভাবনা
অফিসে হঠাৎ পরিবর্তন এলে নিজেকে সামলাবেন যেভাবে
ভালোবাসার মানুষটির ওপরই কেন সবচেয়ে বেশি রাগ হয়?
সর্বশেষ খবর
এনসিপি সাংগঠনিক বিস্তারে কী কী করছে জানালেন সারজিস আলম
এনসিপি সাংগঠনিক বিস্তারে কী কী করছে জানালেন সারজিস আলম
তাপপ্রবাহে শিশুদের সুরক্ষায় যা করবেন
তাপপ্রবাহে শিশুদের সুরক্ষায় যা করবেন
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা 
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা 
দেশের ৯ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত 
দেশের ৯ অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত 
সর্বাধিক পঠিত
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
বরিশাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
‘পরের বছর থেকে হবে না শর্তে ২৮ আগস্ট হচ্ছে নৌকাবাইচ’
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ
৪০ লাখের বেশি ইভি ফেরত নেওয়ার নির্দেশ