প্রশ্ন: আমার বয়স ৩৫ বছর। আমি খুব ব্যস্ত থাকি পারিবারিক ও কর্মজীবনে। কিছুটা ফ্রি সময় পেলেই মনে হয় রেস্টুরেন্টে বসে পছন্দের কিছু খাই আর নিজের মতো সময় কাটাই। আগে মনে হতো ব্যাপারটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ব্যাপারটা আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। যেমন ক্ষুধা না লাগলেও মনে হয় কিছু একটা খাই। বাইরে কোনও কাজ নিয়ে বের হলেও মনে হয় রেস্টুরেন্টে বসে থাকি। এমন করে করে ওজনটাও বেড়ে যাচ্ছে। কীভাবে সমাধান করতে পারি?
উত্তর: ১. মূল কারণ খুঁজে বের করুন (কেন এমন হচ্ছে?): আপনার সমস্যাটি মূলত এক ধরনের ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা আবেগতাড়িত খাওয়া। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ বা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সহজ উপায় হিসেবে মানুষ রেস্টুরেন্টের খাবার বা পছন্দের খাবারকে বেছে নেয়। যেকোনো অভ্যাস পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো এর পেছনের কারণটা বোঝা। নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন: কখন রেস্টুরেন্টে যেতে ইচ্ছে করে? যখন আপনি ক্লান্ত? মানসিক চাপে আছেন? একা বোধ করছেন? নাকি বিরক্ত লাগছে? রেস্টুরেন্টে গেলে আপনার কেমন অনুভূতি হয়? আপনি কি এক ধরনের প্রশান্তি বা মুক্তি খুঁজে পান? এটা কি আপনার জন্য পুরস্কারের মতো কাজ করে? খাওয়া ছাড়া আর কোন কাজটি আপনাকে একই রকম আনন্দ দেয়? একটি ছোট নোটবুক বা ডায়েরি রাখতে পারেন। যখনই রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হবে, তখন লিখে রাখুন সেই মুহূর্তে আপনার কেমন লাগছিল, কী ভাবছিলেন এবং কী পরিস্থিতি ছিল। কিছুদিন এটা করলেই আপনি আপনার এই অভ্যাসের একটি প্যাটার্ন খুঁজে পাবেন।
২. অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি করুন: যেহেতু রেস্টুরেন্টে যাওয়া আপনার জন্য মানসিক শান্তির একটি উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই হঠাৎ করে এটি বন্ধ করে দিলে মনে একটি শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এর জন্য আপনাকে নতুন কিছু স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে যা আপনাকে একই রকম আনন্দ বা প্রশান্তি দেবে। ‘নিজের মতো সময় কাটানো’-এর নতুন সংজ্ঞা দিন। কাছাকাছি কোনও পার্কে বা লেকের ধারে কিছুক্ষণ হাঁটুন। কানে হেডফোন দিয়ে পছন্দের গান বা পডকাস্ট শুনতে পারেন। বই পড়ার অভ্যাস থাকলে, একটি শান্ত কফি শপে গিয়ে শুধু এক কাপ কফি বা গ্রিন টি অর্ডার করে বই পড়ুন। মূল উদ্দেশ্য হবে সময় কাটানো, খাওয়া নয়। গাড়িতে বা বারান্দায় বসে ভালো কোনও মিউজিক শুনুন। ব্যায়াম বা ইয়োগা শুরু করতে পারেন। শারীরিক কার্যকলাপ মানসিক চাপ কমাতে দারুণভাবে সাহায্য করে। ঘরেই রেস্টুরেন্টের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। সপ্তাহে এক বা দুই দিন নিজের পছন্দের কোনও স্বাস্থ্যকর খাবার ঘরেই রান্না করার চেষ্টা করুন। ইউটিউব দেখে নতুন রেসিপি চেষ্টা করতে পারেন। পরিবেশটা সুন্দর করে সাজিয়ে নিন। পছন্দের গান চালিয়ে, সুন্দর প্লেটে খাবার পরিবেশন করে খেতে বসুন। এতে খাওয়ার আনন্দও পাবেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবারও খাওয়া হবে।
৩. পরিকল্পিতভাবে রেস্টুরেন্টে খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করুন: পুরোপুরি বন্ধ না করে, একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী রেস্টুরেন্টে যান। সপ্তাহে একটি দিন নির্দিষ্ট করুন। ঠিক করুন যে সপ্তাহে কতবার বাইরে খাবেন (যেমন - সপ্তাহে মাত্র ১ বা ২ বার)। বাকি দিনগুলোতে কঠোরভাবে ঘরে খাওয়ার নিয়ম মেনে চলুন। বাইরে খাওয়ার জন্য প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করুন। বাজেট শেষ হয়ে গেলে আর বাইরে খাবেন না। রেস্টুরেন্টে গেলেও ভাজা-পোড়া বা অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবারের বদলে গ্রিলড আইটেম, সালাদ বা স্যুপ বেছে নিন। - ক্ষুধা লাগলেই খান। ক্ষুধা না থাকলেও শুধু অভ্যাস বা সময় কাটানোর জন্য রেস্টুরেন্টে বসা বন্ধ করুন। যদি একান্তই বসতে হয়, তাহলে শুধু পানি, গ্রিন টি বা ব্ল্যাক কফি অর্ডার করুন।
৪. জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনুন: ঘুম কম হলে আমাদের শরীরে ক্ষুধার হরমোন (Ghrelin) বেড়ে যায় এবং এমন খাবারের প্রতি আসক্তি জন্মায় যা শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায় (যেমন - মিষ্টি বা ফাস্টফুড)। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। অনেক সময় আমাদের শরীর তৃষ্ণাকে ক্ষুধা বলে ভুল করে। তাই বাইরে খেতে যাওয়ার ইচ্ছা হলে আগে এক গ্লাস পানি পান করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। যখন কাজের জন্য বাইরে বের হবেন, সাথে কিছু স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস যেমন বাদাম, ফল বা দই রাখুন। এতে হঠাৎ ক্ষুধা পেলে অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝোঁক কমবে। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এবং অটোফেজি চর্চা করুন। খাবারের প্রতি আসক্তি এবং অতিরিক্ত ওজন কমাতে প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা শুধু পানি পান করুন। বাকি ৮ ঘন্টার মধ্যে বাকি সব খাবার গ্রহণ করুন (ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং)। ন্যূনতম শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণের পাশাপাশি অধিক পরিমাণে আমিষ ও স্নেহজাতীয় খাবার গ্রহণ করুন। প্রতিটি ছোট সাফল্যের জন্য নিজেকে পুরস্কৃত করুন (তবে পুরস্কার যেন খাবার না হয়)।
৫. বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিন: যদি মনে হয় একা একা এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে, তাহলে একজন পুষ্টিবিদ (Nutritionist) বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের (Counselor) সাহায্য নিতে পারেন। তারা আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক পথ দেখাতে পারবেন। আপনার ওজন বৃদ্ধি এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে তারা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন।
প্রশ্ন: আমার বয়য়া ৩৮ বছর। বিয়ে করিনি, কাউকে পছন্দ করতে পারিনি এজন্য। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হয়তো ভুল করেছি। পারিবারিক প্রেসারে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। বাবা মায়ের এমন অবস্থা এখন যে পারলে কানা খোঁড়ার সাথেও আমার বিয়ে দিয়ে দেয়। এই প্রেসার আমি আর নিতে পারছি না।
উত্তর: ১. নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিন: এই মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে বেশি জরুরি নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। আপনার রাগ, কষ্ট, হতাশা - এই সবগুলো অনুভূতিই স্বাভাবিক। এগুলোকে চেপে না রেখে মেনে নিন। বুঝতে চেষ্টা করুন যে আপনার এই অবস্থার জন্য আপনি দায়ী নন, বরং পরিস্থিতি দায়ী। ‘মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি’ - আপনার এই কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাথে কথা বলা এই মুহূর্তে আপনাকে অবিশ্বাস্যভাবে সাহায্য করতে পারে। তিনি আপনাকে আপনার অনুভূতিগুলো গুছিয়ে নিতে, মানসিক চাপ মোকাবেলা করার কৌশল শিখতে এবং পরিবারের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবেন, সে বিষয়ে পথ দেখাতে পারবেন। এটি কোনও বিলাসিতা নয়, এটি আপনার প্রয়োজন। প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করুন যা শুধুমাত্র আপনার নিজের জন্য। পছন্দের গান শুনুন, বই পড়ুন, ছাদে বা বারান্দায় গাছ লাগান, ব্যায়াম বা মেডিটেশন করুন, অথবা এমন কিছু করুন যা আপনাকে সাময়িক শান্তি দেয়। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো মানসিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
২. পরিবারের সাথে যোগাযোগের কৌশল পরিবর্তন করুন: সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে একটু ভিন্ন কৌশলে এগোনো যেতে পারে। যখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকে বা আপনাকে চাপ দেওয়া হয়, তখন কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন না। বরং যখন সবাই শান্ত থাকে, তখন আপনার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন। ‘আমি’ ব্যবহার করে কথা বলুন ‘তোমরা আমাকে বুঝতে পারছ না’ বা ‘তোমরা ভুল করছ’ - এভাবে না বলে, নিজের অনুভূতি দিয়ে শুরু করুন। যেমন – ‘যখন তোমরা বিয়ের জন্য এমনভাবে চাপ দাও, তখন আমার খুব অসহায় লাগে এবং নিজের মূল্যহীন মনে হয়। আমি জানি তোমরা আমার ভালো চাও, কিন্তু এই চাপের কারণে আমার মানসিক শান্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’ আপনার বাবা-মা সম্ভবত সামাজিক নিন্দা, আপনার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং একাকীত্ব নিয়ে চিন্তিত। তাদের ভয়ের জায়গাটা যদি আপনি সহানুভূতির সাথে শোনেন, তাহলে তারাও হয়তো আপনার দিকটা বোঝার চেষ্টা করবে। তাদের বলুন, ‘আমি তোমাদের চিন্তাটা বুঝি, কিন্তু আমি তাড়াহুড়ো করে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চাই না, যার জন্য সারাজীবন কষ্ট পেতে হয়,’ পরিবারে বা আত্মীয়দের মধ্যে এমন কি কেউ আছেন যিনি আপনার বাবা-মাকে বোঝাতে সক্ষম এবং আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল? তার সাহায্য নিয়ে আপনার মনের অবস্থাটা বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন।
৩. নিজের জীবনকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করুন: যখন বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন নিজের জীবনের ছোট ছোট বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটা জরুরি। আপনি যদি কর্মজীবী হন, তাহলে আপনার আর্থিক স্বাধীনতা আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। নিজের উপার্জনের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ আছে, যা আপনাকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস জোগাবে। বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ বাড়ান। তাদের সাথে ঘুরতে যান, সময় কাটান। একটি ভালো সাপোর্টিভ নেটওয়ার্ক এই কঠিন সময়ে আপনাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেবে না। নতুন কোনও কোর্স, ভাষা বা শখ আপনার মনোযোগকে অন্যদিকে সরাবে এবং আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে।
৪. বিয়ে নিয়ে নিজের ভাবনাটা গুছিয়ে নিন: পরিবারের চাপ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি নিজে সত্যিই কী চান? আপনি কি সত্যিই বিয়ে করতে চান? নাকি শুধু চাপ থেকে মুক্তি পেতে চান? যদি বিয়ে করতে চান, তাহলে কেমন জীবনসঙ্গী আপনার পছন্দ? বিয়ে ছাড়াও জীবনকে সুন্দরভাবে কাটানোর আর কী কী উপায় আপনার সামনে আছে? আপনার জীবন আপনার। সমাজের বা পরিবারের বেঁধে দেওয়া সময়ে সবকিছু হতেই হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। ৩৮ বছর বয়সে বিয়ে করা বা না করাটা আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ‘কানা-খোঁড়ার সাথেও বিয়ে দিয়ে দেয়’ - কথাটি আপনার প্রতি তাদের ভালোবাসার চেয়েও সামাজিক ভয় এবং হতাশাকেই বেশি প্রকাশ করে।









