গেমের পর্দায় বন্দি শৈশব, অজান্তেই বাড়ছে স্বাস্থ্য ও সাইবার ঝুঁকি

জীবনযাপন ডেস্ক
১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৩আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫৩

মোবাইল হাতে নিলেই গেম। খাওয়ার সময় গেম, পড়ার ফাঁকে গেম, এমনকি ঘুমানোর আগেও গেম। অনেক শিশুর দৈনন্দিন জীবনে অনলাইন গেম যেন বিনোদনের পাশাপাশি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি ও গেমিং নিজে খারাপ নয়, কিন্তু যখন খেলাধুলা, পড়াশোনা, ঘুম কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা দখল করে নেয় গেম, তখনই চিন্তার কারণ তৈরি হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অধিকাংশ মানুষের জন্য ভিডিও গেমিং একটি স্বাভাবিক বিনোদন হলেও অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন গেম খেলার অভ্যাস দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

শুধু সময় নষ্ট নয়, বদল আসতে পারে জীবনযাত্রায়

একটানা দীর্ঘ সময় গেম খেললে শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আসতে পারে। বাইরে খেলাধুলার সময় কমে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, ঘুমের ব্যাঘাত কিংবা অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অতিরিক্ত গেমিংয়ের সঙ্গে শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের ঘাটতি, চোখ বা শ্রবণসংক্রান্ত সমস্যা এবং মানসিক-সামাজিক নানা সমস্যার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে। তবে গেম খেললেই এসব সমস্যা হবে—এমনটা নয়; ঝুঁকি মূলত অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কখন বুঝবেন বিষয়টি গুরুতর হচ্ছে?

শিশু কত ঘণ্টা গেম খেলছে, শুধু সেটিই দেখলেই হবে না। বরং গেমের কারণে তার অন্য কাজগুলো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজ এড়িয়ে যাচ্ছে কি না; ঘুমের সময় কমে যাচ্ছে কি না; পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বা সামাজিক মেলামেশা কমছে কি না; গেম বন্ধ করতে বললে অস্বাভাবিক রাগ বা বিরক্তি দেখাচ্ছে কি না; অন্যান্য পছন্দের কাজের চেয়ে গেমকে সবসময় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কি না; নেতিবাচক প্রভাব বুঝেও গেম খেলা কমাতে পারছে না কি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, গেমিংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের তুলনায় গেমকে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো আচরণ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করলে সেটিকে ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গেমের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে অপরিচিত মানুষ

অনলাইন গেমের বড় আকর্ষণ হলো অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ। কিন্তু এখানেই তৈরি হতে পারে নিরাপত্তার ঝুঁকি। গেমের চ্যাট বা বার্তার মাধ্যমে অপরিচিত কেউ বন্ধুত্ব করতে পারে, ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইতে পারে কিংবা কোনো লোভনীয় প্রস্তাব দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সতর্ক করেছে, অপরাধীরা অনলাইন গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তারা কখনও বন্ধুত্ব বা পরিচিতির ভান করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে।

এমনকি গেমের ক্রেডিট, উপহার বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েও শিশুদের ফাঁদে ফেলার ঘটনা ঘটতে পারে।

ব্যক্তিগত তথ্য যেন গেমের ‘পুরস্কার’ না হয়

শিশুকে শুরু থেকেই শেখাতে হবে অনলাইনে পরিচিত কেউ বন্ধু মনে হলেও তার কাছে নিজের পুরো নাম, ঠিকানা, স্কুলের নাম, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ছবি বা পরিবারের আর্থিক তথ্য দেওয়া যাবে না।

কেউ যদি গোপনীয় কিছু চাইতে থাকে, ভয় দেখায়, টাকা বা গেমের সুবিধার বিনিময়ে ব্যক্তিগত ছবি চায় কিংবা অফলাইনে দেখা করতে বলে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি বাবা-মা বা বিশ্বাসযোগ্য কোনও বড় মানুষকে জানাতে হবে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুকে বকাঝকা না করে তার কথা মন দিয়ে শোনা জরুরি। কারণ ভয় পেলে শিশু অনেক সময় ঘটনাটি লুকিয়ে রাখতে পারে।

বাবা-মায়ের নজরদারি কেমন হবে?

শিশুকে একেবারে গেম থেকে দূরে রাখাই একমাত্র সমাধান নয়। বরং সে কী খেলছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কতটা সময় দিচ্ছে, এসব সম্পর্কে অভিভাবকের ধারণা থাকা দরকার।

বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বাবা-মা সন্তানের ব্যবহৃত গেম ও অ্যাপ সম্পর্কে নিজেরাও জানুন। গোপনীয়তার সেটিংস পর্যালোচনা করুন এবং বয়স উপযোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখুন।

প্রয়োজনে ফোন বা গেমিং ডিভাইসের অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুধু নজরদারি নয়, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘরে তৈরি হোক কয়েকটি সহজ নিয়ম

গেম খেলার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঘুম, পড়াশোনা, খাওয়া এবং শারীরিক খেলাধুলার সময় যেন গেমের কারণে বাদ না যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

রাতে শোবার ঘরে ফোন বা গেমিং ডিভাইস না রাখার নিয়মও করা যেতে পারে। এফবিআইও শিশু-কিশোরদের অনলাইন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ, ডিভাইসের সেটিংস পর্যালোচনা এবং সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সবচেয়ে ভালো হয়, বাবা-মা নিজেরাও যদি একই নিয়ম মেনে চলেন। কারণ শিশুকে ‘ফোন নামাও’ বলার সময় বাবা-মায়ের নিজের চোখ যদি ফোনের পর্দায় আটকে থাকে, তাহলে নিয়ম মানানো কঠিন!

ভয় দেখিয়ে নয়, সচেতন করেই সুরক্ষা

অনলাইন গেমকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। প্রযুক্তি যেমন বিনোদন ও শেখার সুযোগ তৈরি করে, তেমনই অসচেতন ব্যবহারে ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের ডিজিটাল পরিবেশের সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত গেম বন্ধ করানো নয়, গেমিংয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও নিরাপদ অনলাইন আচরণ তৈরি করা। শিশু যেন জানে, অনলাইনে কেউ তাকে ভয় দেখালে, অস্বস্তিকর কিছু চাইলে কিংবা কোনও সমস্যায় ফেললে চুপ করে থাকার দরকার নেই। বাবা-মা বা বিশ্বাসযোগ্য বড়দের জানানোই প্রথম পদক্ষেপ।

গেম খেলুক শিশু, আনন্দও করুক। কিন্তু সেই আনন্দ যেন ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা, পরিবার ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গ্রাস না করে। আর ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অপরিচিত কারও সঙ্গে বন্ধুত্বের আগে যেন মনে থাকে স্ক্রিনের ওপাশে কে আছে, তা সবসময় বোঝা যায় না।

 

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কাতারে বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমবাজার ও সুরক্ষা বৃদ্ধিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক
কাতারে বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমবাজার ও সুরক্ষা বৃদ্ধিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক
আরেক কনেকে বিয়ে করলেন সেই প্রবাসী, পাতে পেলেন আস্ত খাসি
আরেক কনেকে বিয়ে করলেন সেই প্রবাসী, পাতে পেলেন আস্ত খাসি
তারেক রহমানের ভারত সফরের সময় খুবই সীমিত: সাবেক কূটনীতিক
তারেক রহমানের ভারত সফরের সময় খুবই সীমিত: সাবেক কূটনীতিক
রাজধানী‌তে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৩, মামলা ৫৯ 
রাজধানী‌তে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৩, মামলা ৫৯ 
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
মৃত্যুদণ্ডে ফাঁসির বদলে ইনজেকশনের আবেদন, সুপ্রিম কোর্টের ‘না’
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
আস্ত খাসি না দেওয়ায় বর বললেন ‘তুই বিয়ে কর’, বিয়ে না দিয়ে বের করে দিলেন কনের বাবা
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
মহাসড়কে এআই ক্যামেরার অ্যাকশন শুরু, ৩ ঘণ্টায় ৩৭৯ মামলা
ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়েছিলেন, ধরে পিটিয়ে মেরে ফেললো একদল লোক
ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়েছিলেন, ধরে পিটিয়ে মেরে ফেললো একদল লোক
চেক ডিজঅনারের আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো মুজিব পরদেশীকে 
চেক ডিজঅনারের আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো মুজিব পরদেশীকে