জীবন যত ব্যস্ত হয়ে ওঠে, মানসিক চাপও তত বাড়তে থাকে। তখন হঠাৎ কোনও ঘরে গিয়ে কেন সেখানে গিয়েছিলেন তা মনে না থাকা, কথা বলার মাঝখানে কী বলতে চেয়েছিলেন ভুলে যাওয়া কিংবা সহজ কোনও কাজেও মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে ছুটির পর কাজ বা পড়াশোনার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতেও অনেকের সময় লাগে।
এ ধরনের মানসিক ধোঁয়াশাকে ‘ব্রেন ফগ’ বলা হয়। এটি নিজে কোনও রোগ নয়। বরং মনোযোগে ঘাটতি, ভুলে যাওয়া এবং চিন্তা বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণে ধীরগতির মতো কিছু জ্ঞানীয় উপসর্গের সমষ্টি। মেনোপজ বা পেরিমেনোপজ, দীর্ঘমেয়াদি কোভিড, লুপাসের মতো কিছু অটোইমিউন রোগ এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের সঙ্গেও ব্রেন ফগের সম্পর্ক থাকতে পারে।
মর্নিং লাইভ-এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থারাকার মতে, ব্রেন ফগ যে কারও হতে পারে। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কিংবা কেউ নিজের পরিস্থিতি সামলাতে পারছেন না, এমন কোনও লক্ষণ নয়। অনেক সময় এটি মস্তিষ্কের একটি সতর্কবার্তা, যা জানায় যে মস্তিষ্ক ক্লান্ত, চাপে রয়েছে কিংবা একসঙ্গে অনেক কাজ ও চিন্তার ভার বহন করছে।
তাই ব্রেন ফগ দেখা দিলে নিজের প্রতি কঠোর না হয়ে কিছুটা ধীরগতিতে চলা, প্রয়োজন হলে কাজ ভাগ করে দেওয়া এবং অন্যের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। সাধারণত এটি সাময়িক হলেও সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
দৈনন্দিন জীবনে রুটিন তৈরি করুন
প্রতিদিনের কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি করলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিক চাপ কমানো যায়। দিনের কাজের একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো থাকলে মস্তিষ্ককে প্রতিটি বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে হয় না। এতে মনোযোগ ধরে রাখাও সহজ হতে পারে।
সকাল ও রাতের জন্য আলাদা রুটিন তৈরি করতে পারেন। আগের রাতেই পরদিনের পোশাক গুছিয়ে রাখা কিংবা সকালের নাশতার কিছু প্রস্তুতি আগে থেকে করে রাখার মতো ছোট অভ্যাসও কাজে আসতে পারে। এতে প্রতিদিনের ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ কমে এবং মস্তিষ্ককে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যায়।
কাজের মাঝে বিরতি রাখুন
এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়ার মাঝে কিছুটা বিরতি দিলে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নেওয়া এবং মনোযোগ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। দিনের পুরো সময়টি মিটিং, সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রয়োজনীয় কাজ ও নানা দায়িত্ব দিয়ে পরপর সাজিয়ে রাখলে মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই প্রতিটি কাজের মাঝে ৫ থেকে ১০ মিনিটের ছোট বিরতি রাখার চেষ্টা করুন। এ সময় একটু হাঁটাহাঁটি, শরীর স্ট্রেচ করা, পানি পান করা, বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো কিংবা নীরবে বসে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। এই বিরতি মস্তিষ্ককে সদ্য শেষ করা কাজের চাপ থেকে বেরিয়ে পরবর্তী কাজের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে।
ক্যালেন্ডার ও অনুস্মারকের সাহায্য নিন
প্রতিটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখার চেষ্টা করলে মস্তিষ্কে অপ্রয়োজনীয় তথ্যের চাপ বাড়তে পারে। তাই সবকিছু মনে রাখার দায়িত্ব নিজের ওপর না নিয়ে ডিজিটাল ক্যালেন্ডার ও অনুস্মারক ব্যবহার করুন।
যেসব কাজ নিয়মিত করতে হয়, সেগুলোর জন্য আগেই অনুস্মারক নির্ধারণ করে রাখতে পারেন। যেমন প্রতিদিন দুপুরের খাবারের সময় মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা কিংবা প্রতি সপ্তাহে বিল পরিশোধ ও ঘরের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য অনুস্মারক রাখা। এতে বারবার ‘এরপর কী করতে হবে’ এমন চিন্তা করতে হয় না।
ব্রেন ফগ কাটাতে মনে রাখুন ‘স্বানস’ সূত্র
দৈনন্দিন অভ্যাসের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ডা. থারাকা ‘স্বানস’ নামে একটি সহজ সূত্র অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এর প্রতিটি অক্ষর মস্তিষ্কের সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসকে বোঝায়।
ঘুম হলো এই সূত্রের প্রথম বিষয়। পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি স্মৃতি সুসংহত করতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা ভালো।
পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরের বড় একটি অংশ পানি দিয়ে গঠিত এবং সামান্য পানিশূন্যতাও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হাতের কাছে পানি রাখুন এবং নিয়মিত পানি পান করুন।
শারীরিক সক্রিয়তা মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী। শরীরচর্চা মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেন সরবরাহে সহায়তা করে। অল্প সময় হাঁটা, হালকা দৌড় কিংবা নিয়মিত শরীর স্ট্রেচ করার মতো সহজ অভ্যাসও দৈনন্দিন জীবনে রাখা যেতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে পুষ্টিকর ও প্রাকৃতিক খাবারকে গুরুত্ব দিন। ডিম, মাছ ও বাদামের মতো খাবারে কোলিন পাওয়া যায়, যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান।
সবশেষে রয়েছে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ চিন্তাভাবনা ও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান, মননশীলতার অনুশীলন, পছন্দের শখ কিংবা অন্য কোনো স্বাস্থ্যকর উপায়ে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
ব্রেন ফগকে অবহেলা না করে জীবনযাপনে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা যেতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার, শারীরিক সক্রিয়তা, নির্দিষ্ট রুটিন এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো অভ্যাস মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্রেন ফগ দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার হলে বা দৈনন্দিন জীবন ও কাজকর্মে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: বিবিসি









