বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান হঠাৎ বদলে গেলে অনেক সময় অভিভাবকেরা সেটিকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ভেবে এড়িয়ে যান। মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ঘরে কম কথা বলা কিংবা পড়াশোনায় অনাগ্রহ এসব সত্যিই কৈশোরের নানা মানসিক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে যদি আরও কিছু অস্বাভাবিক আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তন যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কখনও কখনও এসব পরিবর্তন মাদক বা অন্য কোনও নেশায় জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিতও হতে পারে।
কৈশোরে মানসিক চাপ, পড়াশোনার সমস্যা, পারিবারিক অশান্তি, বন্ধুদের প্রভাব, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা বিষণ্ণতার মতো নানা কারণে কেউ কেউ নেশার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরেও আসে না। তাই সন্তানের আচরণে ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা গেলে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা জরুরি।
আচরণে হঠাৎ বদল কি কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে?
আগে যে কাজগুলো করতে সন্তান আগ্রহী ছিল, সেগুলো থেকে হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলা কিংবা দীর্ঘসময় একা থাকতে চাওয়ার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।
মেজাজের অস্বাভাবিক ওঠানামাও খেয়াল করার মতো বিষয়। সামান্য কথায় অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, অকারণে মন খারাপ করা, ঘন ঘন কান্না কিংবা পরিবারের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়া এ ধরনের পরিবর্তন যদি নিয়মিত হতে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
পড়াশোনায় হঠাৎ ফল খারাপ হওয়া, ক্লাসে অনুপস্থিতি বেড়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে অনীহাও সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে আগে নিয়মিত ও দায়িত্বশীল থাকা সন্তান আচমকা নিজের পড়াশোনা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়েমাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত কিছু কিশোর-কিশোরীর আচরণে অস্বাভাবিক গোপনীয়তা দেখা যেতে পারে। ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লুকোচুরি উদাসীন হয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে রাখা উচিত।
গোপনীয়তা ও টাকার বিষয়ে বদল
মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত কিছু কিশোর-কিশোরীর আচরণে অস্বাভাবিক গোপনীয়তা দেখা যেতে পারে। ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লুকোচুরি করা, কোথায় যাচ্ছে বা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে সে বিষয়ে অস্পষ্ট উত্তর দেওয়া কিংবা নিজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মিথ্যা বলার প্রবণতা বাড়তে পারে।
অস্বাভাবিকভাবে বেশি হাতখরচ চাওয়া বা টাকা কোথায় খরচ করছে তার হিসাব দিতে না চাওয়াও অভিভাবকদের নজরে রাখা উচিত। তবে এসব লক্ষণ একাই মাদক গ্রহণের প্রমাণ নয়। সন্তানের বয়স, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও অন্যান্য পরিবর্তন মিলিয়েই বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
শরীরেও দেখা দিতে পারে পরিবর্তন
শুধু আচরণ নয়, শারীরিক পরিবর্তনও কখনও সতর্কবার্তা দিতে পারে। ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন বদলে যাওয়া, রাতে দীর্ঘসময় জেগে থাকা বা অস্বাভাবিক বেশি ঘুমানো, খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং সারাক্ষণ দুর্বল বা অবসন্ন দেখানোর মতো বিষয় খেয়াল করা দরকার।
চোখ অস্বাভাবিক লাল বা ফুলে থাকা, অল্প সময়ের মধ্যে ওজনের বড় পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়া কিংবা কথা বলার সময় অস্বাভাবিকতা দেখা গেলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
কখনও নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহারের পর কথা অসংলগ্ন হতে পারে বা নিজের বক্তব্য প্রকাশে সমস্যা হতে পারে। তবে একই ধরনের উপসর্গ বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই শুধু একটি লক্ষণ দেখে সন্তানকে মাদকাসক্ত বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সন্দেহ হলে প্রথমেই কী করবেন?
সন্তানের আচরণে এমন পরিবর্তন দেখলে ভয় পাওয়া বা রেগে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু চিৎকার, অপমান, মারধর কিংবা ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বরং শান্ত থেকে সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাস ও নিরাপত্তার পরিবেশে কথা বলার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সন্তান যখন স্বাভাবিক ও শান্ত অবস্থায় থাকবে, তখন একান্তে তার সঙ্গে কথা বলা ভালো। অভিযোগের সুরে প্রশ্ন না করে কী ধরনের পরিবর্তন আপনার চোখে পড়েছে, তা জানিয়ে বোঝাতে পারেন যে আপনি তাকে শাস্তি দিতে নয়, সাহায্য করতে চাইছেন।
সন্তান মাদক গ্রহণ করছে বলে সন্দেহ হলে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা আসক্তি চিকিৎসায় অভিজ্ঞ পেশাদারের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ। প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে নেশার সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানকে সমস্যার জন্য একা দায়ী না করে তার পাশে থাকা। সময়মতো পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করে সহমর্মিতা, সঠিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় পেশাদারি সহায়তা নিশ্চিত করতে পারলে নেশার ঝুঁকি মোকাবিলার পথ অনেকটাই সহজ হতে পারে।









