ঝাল খাবার সামনে এলেই অনেকের জিভে পানি আসে। কিন্তু খেতে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, নাক দিয়ে পানি গড়াচ্ছে, এমনকি কপালেও ঘাম জমেছে। ঝাল খাবারের স্বাদ উপভোগ করতে গিয়ে নাক দিয়ে পানি পড়ার এই অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। কিন্তু ঝাল তো নাকে দেওয়া হচ্ছে না, তাহলে নাক দিয়ে পানি আসে কেন?
এর পেছনে রয়েছে ঝাল খাবারের একটি বিশেষ উপাদান এবং আমাদের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
ঝালের ঝাঁজ তৈরি করে যে উপাদান
মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন নামের একটি রাসায়নিক উপাদান ঝালের মূল কারণ। এই উপাদান জিহ্বা ও মুখের ভেতরের নির্দিষ্ট স্নায়ুকে উত্তেজিত করে। ফলে মস্তিষ্কে এমন একটি সংকেত পৌঁছায়, যেন মুখে প্রচণ্ড গরম বা জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হচ্ছে।
আসলে ঝালকে সাধারণ স্বাদের মতো করে অনুভব করা হয় না। ক্যাপসাইসিন মুখের তাপ ও ব্যথা অনুভবের সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুকে সক্রিয় করে। তাই ঝাল খাওয়ার পর শরীর নানাভাবে সেই অস্বস্তি কমানোর চেষ্টা করে।
নাক দিয়ে পানি আসে কীভাবে?
মুখে ঝালের তীব্রতা অনুভূত হলে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর প্রভাব শুধু জিহ্বা বা মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নাকের ভেতরের ঝিল্লিতেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
ঝাল খাবারের ঝাঁজ নাক ও মুখের আশপাশের স্নায়ুকে উদ্দীপিত করলে নাকের ভেতরের গ্রন্থি থেকে বেশি তরল নিঃসরণ হতে পারে। সেই তরলই পরে নাক দিয়ে পানি হিসেবে বেরিয়ে আসে।
অর্থাৎ, ঝাল খাবারের কারণে সরাসরি নাকে পানি ঢুকে যায় না। শরীরের প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়ার ফলেই নাক দিয়ে পানি পড়ে।
চোখেও পানি আসে কেন?
ঝাল খাবারের পর শুধু নাক নয়, অনেকের চোখেও পানি আসে। এর কারণও একই ধরনের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া। মুখ ও নাকের আশপাশের স্নায়ু উত্তেজিত হলে চোখের পানির গ্রন্থিও সক্রিয় হতে পারে।
ফলে মরিচ বা ঝাল খাবার খাওয়ার পর চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাক দিয়ে পানি আসা কিংবা হাঁচি হওয়া এসব শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
সঙ্গে ঘাম হয় কেন?
ঝাল খাওয়ার পর অনেকের কপাল, নাকের চারপাশ বা শরীরের অন্য অংশে ঘাম দেখা যায়। এর পেছনেও রয়েছে ক্যাপসাইসিনের প্রভাব।
মরিচের ঝাল শরীরে গরমের মতো অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তখন শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সক্রিয় করে। এর অংশ হিসাবে ঘাম হতে পারে। তাই ঝাল খাবার খাওয়ার সময় নাক দিয়ে পানি পড়ার পাশাপাশি ঘাম হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
সবার ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া এক রকম নয়
ঝাল খাবার খেলে কারও চোখ দিয়ে বেশি পানি পড়ে, কারও নাক দিয়ে পানি আসে, আবার কারও ক্ষেত্রে শুধু ঘাম বা মুখে জ্বালাভাব দেখা যায়। শরীরের সংবেদনশীলতা এবং ঝাল সহ্য করার অভ্যাসের ওপর প্রতিক্রিয়ার মাত্রা নির্ভর করতে পারে।
যারা নিয়মিত ঝাল খাবার খান, তাদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার ঝালে প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম মনে হতে পারে। আবার ঝালে অভ্যস্ত নন এমন কারও ক্ষেত্রে সামান্য ঝালেও নাক দিয়ে পানি পড়া বা চোখ জ্বালার মতো সমস্যা হতে পারে।
ঝাল খাওয়ার পর পানি খেলেই কি আরাম মেলে?
অনেকেই ঝাল লাগলে সঙ্গে সঙ্গে পানি পান করেন। কিন্তু মরিচের ক্যাপসাইসিন পানিতে খুব ভালোভাবে দ্রবীভূত হয় না। তাই শুধু পানি পান করলে ঝালের জ্বালাভাব দ্রুত কম নাও হতে পারে।
দুধ বা দুধজাতীয় কিছু খাবার অনেকের ক্ষেত্রে ঝালের অস্বস্তি কমাতে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ দুধে থাকা কিছু উপাদান মুখের ক্যাপসাইসিনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।
তবে অতিরিক্ত ঝাল খেয়ে যদি তীব্র পেটের অস্বস্তি, বমি, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনও গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়, তখন বিষয়টিকে শুধু সাধারণ ঝালের প্রতিক্রিয়া ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তাই পরের বার ঝাল খাবার খেতে গিয়ে নাক দিয়ে পানি পড়তে শুরু করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মরিচের ঝাঁজের বিরুদ্ধে শরীর তখন নিজের মতো করেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখে পানি আসা কিংবা ঘাম হওয়া সবই সেই স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ।