প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ ও একঘেয়েমির মধ্যে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস মন ভালো রাখতে পারে। কখনও প্রকৃতির শব্দ শোনা, কখনও রান্নার সময় একটু ধীর হওয়া, আবার কখনও নতুন কোনও খেলা বা বইয়ের সঙ্গে সময় কাটানো- এমন সহজ কিছু কাজই দিনের মধ্যে আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করতে পারে। জীবনকে একটু বেশি উপভোগ করতে এমন ছয়টি ভাবনা থাকছে এবারের তালিকায়।
প্রকৃতির সুর শুনুন
প্রকৃতিতে সুরের অভাব নেই। পাখির ডাক, পোকামাকড়ের শব্দ কিংবা বাতাসের গর্জন সবই হতে পারে মনের প্রশান্তির উৎস। সংগীতশিল্পী ম্যাডাম গান্ধী প্রকৃতির নানা শব্দকে নিজের সংগীতে ব্যবহার করে সেই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তুলেছেন। ২০২২ সালে অ্যান্টার্কটিকা সফরে গিয়ে তিনি গলতে থাকা হিমবাহের শব্দ রেকর্ড করেন। পরে সেই শব্দ নিজের সংগীতে ব্যবহার করেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘লেট মি বি ওয়াটার’ গানটিও।
প্রকৃতিকে নিজের সংগীতের সহযোগী হিসাবে বিবেচনা করেন তিনি। এমনকি সংগীত থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যয় করেন। তাঁর কাজ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি শুধু দেখার বিষয় নয়, মন দিয়ে শুনলেও সেখান থেকে পাওয়া যেতে পারে আনন্দ ও অনুপ্রেরণা।
জীবনের প্রতি ইতিবাচক থাকুন
অভিনেতা সিলভেস্টার স্ট্যালোনের সাম্প্রতিক কথোপকথনে উঠে এসেছে বয়স, মৃত্যু, ভালোবাসা, স্মৃতি ও একাকিত্বের প্রসঙ্গ। জীবনের নানা আক্ষেপকে তিনি এমন পাথরের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা দিয়ে যেন অনুশোচনার একটি দুর্গ তৈরি হয়েছে। তবে সেই আক্ষেপের মধ্যেই আটকে না থেকে জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
স্ট্যালোনের মতে, ভালোবাসার জন্য কখনোই বয়স বেশি হয়ে যায় না। পুরোনো সুন্দর স্মৃতি মনে করেও আনন্দ পাওয়া যায়। অন্যদিকে একাকিত্বকে তিনি জীবনের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা হিসাবে দেখেছেন। তাঁর কথার মূল বার্তা হলো- জীবনে যত কঠিন সময়ই আসুক, হাল না ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
ছোট শখকে গুরুত্ব দিন
ফরাসি নকশাবিদ ফ্রাঁসোয়া এলাঁ হাঁটতে বের হলে প্রায়ই সুন্দর পাথর খুঁজে পান। পাথরগুলো সঙ্গে নিয়ে আসার বদলে তিনি সেগুলোর ছবি তুলতে শুরু করেন। ডোরাকাটা, মার্বেলের মতো নকশা কিংবা নানা রঙের পাথর হাতে ধরে তোলা এসব ছবি পরে তিনি একত্র করে তৈরি করেন একটি অনলাইন সংগ্রহ।
‘নাইস রকস’ নামের সেই সংগ্রহে পাথরের ছবি ছাড়াও সেগুলো কোথায় পাওয়া গেছে, সেই তথ্য রয়েছে। একটি সাধারণ শখকে যত্ন নিয়ে ধরে রাখলে তা যে আনন্দের পাশাপাশি সৃজনশীল একটি উদ্যোগেও পরিণত হতে পারে, এই অভ্যাস তারই উদাহরণ।
রান্নাকে চাপ নয়, আনন্দ হিসেবে নিন
রান্না করতে ভালোবাসলেও অনেকের কাছে রান্নাঘরের সময়টা সবসময় আনন্দের হয় না। রেসিপিতে কম সময়ের কথা বলা থাকলেও বাস্তবে রান্না শেষ করতে অনেক বেশি সময় লেগে যেতে পারে। তখন রান্নার প্রতি আগ্রহের বদলে তৈরি হয় তাড়াহুড়া ও অস্থিরতা।
রাঁধুনি এরিক রিপার্ট তাঁর ‘মাইন্ডফুল কুকিং’ বইয়ে রান্নার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা ও সহমর্মিতার মতো মানসিকতার যোগসূত্রের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, রান্নার প্রতিটি ধাপকে শান্তভাবে গ্রহণ করলে অযথা চাপ কমে এবং পুরো প্রক্রিয়াটিই উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ভালো উপকরণ পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং অস্থির না হয়ে খাবার তৈরি করার অভ্যাস তাঁর দাদির মধ্যেও ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাই রান্নাকে দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের জন্য একটি শান্ত ও আনন্দের সময় হিসাবেও দেখুন।
নতুন কিছু জানার খেলায় মেতে উঠুন
নতুন কিছু শেখার জন্য সবসময় বই পড়তেই হবে এমন নয়। মজার কোনও অনুমানের খেলাও হতে পারে জ্ঞান বাড়ানোর উপায়। ‘ক্যাটফিশিং’ এমন একটি খেলা, যেখানে উইকিপিডিয়ার কোনও নিবন্ধের বিষয়ভিত্তিক শ্রেণিগুলো দেখে নিবন্ধটির নাম অনুমান করতে হয়।
যেমন জ্ঞানবিজ্ঞান, ফরাসি শব্দ ও বাক্যাংশ, স্মৃতি, উপলব্ধি ও মনোবিজ্ঞানের ধারণা- এ ধরনের শ্রেণি দেখলে উত্তর হতে পারে ‘দেজা ভু’। সাধারণ জ্ঞান ও নতুন বিষয় সম্পর্কে আগ্রহীদের জন্য এমন খেলা একই সঙ্গে বিনোদন ও শেখার সুযোগ তৈরি করে।
ভালো বই পড়ুন, অন্যকেও পড়ান
প্রিয় বই অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ আলাদা। তবে বইটি যদি দুর্লভ হয় বা বাজারে আর পাওয়া না যায়, তখন ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক বারবারা ট্রাপিডোর ‘ব্রাদার অব দ্য মোর ফেমাস জ্যাক’ উপন্যাসটিও দীর্ঘদিন সহজে পাওয়া যেত না। এবার বইটি নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে।
লন্ডনের এক কলেজছাত্রীকে ঘিরে এগিয়েছে উপন্যাসটির গল্প। দর্শনের এক অধ্যাপকের অগোছালো ও হাস্যরসপূর্ণ পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তার জীবন। দীর্ঘদিন ধরে সীমিত পরিসরে বইটি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। নতুন করে প্রকাশিত হওয়ায় এখন আরও বেশি পাঠকের হাতে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঘুমের আগে কৃতজ্ঞতার কথা মনে করুন
টাকসনের পাঠক অ্যান সেগালের একটি সুন্দর অভ্যাস রয়েছে, যা তাঁকে ঘুমাতেও সাহায্য করে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে তিনি বর্ণানুক্রমে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের নাম মনে করেন। তাঁদের কেউ জীবিত, কেউ প্রয়াত। নাম মনে করার পাশাপাশি তিনি তাঁদের মুখও কল্পনা করেন। এতে প্রিয় মানুষদের স্মৃতি নিজের মধ্যে ধরে রাখা যায় বলে মনে করেন তিনি।
অ্যানের তালিকায় ‘বি’ দিয়ে শুরু হওয়া নাম ছয়টি এবং ‘এম’ দিয়ে আটটি। ‘এফ’, ‘এন’ ও ‘আর’ দিয়ে শুরু হওয়া নাম রয়েছে একটি করে। ‘এক্স’, ‘ওয়াই’ ও ‘জেড’ বাদ দেন তিনি। অনেক সময় ‘জে’ বা ‘কে’ পর্যন্ত যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন।
দিনের শেষে প্রিয় মানুষ, ভালো স্মৃতি ও জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতার বিষয়গুলো মনে করা মনকে শান্ত করতে পারে। তাই ঘুমের আগে নিজের মতো করে এমন একটি ইতিবাচক অভ্যাস তৈরি করাও হতে পারে দিনের আনন্দময় সমাপ্তির একটি উপায়।